বইঃ আমার কথা

‘সৃজনশীলতা’

অনলাইন ডেস্ক
 | প্রকাশিত : ১২ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৫:১১

সৈয়দ আবুল হোসেন বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে আমার কথা। এই বইয়ে তিনি নিজের চিন্তা, কর্মকান্ড, মূল্যবোধ, নানা অভিজ্ঞতা ও পরিকল্পনা সম্পর্কে লিখেছেন।

এটি পড়লে তাকে যারা পুরোপুরি চিনেন না তাদের সুবিধা হবে। বইটি ঢাকাটাইমস২৪ডটকম ধারাবাহিকভাবে ছাপছে। বইটির আজকের পর্বে থাকছে- ‘সৃজনশীলতা’

নতুন চিন্তা বা ধারণা সরকারি কাজের অগ্রগতিতে প্রেরণা ও শক্তি জোগায়। এ চিন্তা, ধারণা বা পরিকল্পনা সব স্থান থেকে আসে, আসতে পারে। এমন না যে, শুধু উপরের বড় বড় নেতৃবৃন্দের কাছ থেকেই আসে, একেবারে নিচ থেকেও নতুন চিন্তা-ধারণা ও পরিকল্পনা আসতে পারে এবং যথাযোগ্য হলে আমরা তা গ্রহণ করে থাকি। উদ্ভাবনশক্তি এবং সৃজনশীলতার ওপর বিচার-বিশ্লেষণ করে কর্মচারীদের অবশ্যই ক্ষমতায়ন করতে হবে। নেতৃবৃন্দের এবং দলের বোঝাপড়ার ফল হচ্ছে সৃজনশীল চিন্তা। পরামর্শ এবং সহযোগিতা আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
 
এ ব্যাপারে হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর চেয়ে ভালো উদাহরণ আর কিছু হতে পারে না। তিনি সর্বদা তাঁর সাথিদের মতামত মনোযোগ দিয়ে শুনতেন এবং উপযুক্ত হলে তা গ্রহণ করতেন। মহানবি (সা.) মানুষের বিবেক ও বিশ্বাসের পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করে গিয়েছেন। ফলে স্বাধীনভাবে সকলে যার যার ধর্ম-কর্ম পালন করার সুযোগ পায়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক কোরানে ঘোষণা করেছেন : দ্বীনের ব্যাপারে জোর নেই, সত্য ভ্রান্ত-পথ হতে সুস্পষ্ট হয়েছে।৬৪ আল্লাহ্ আরও বলেছেন : মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই, সুতরাং তোমরা ভাইদের মধ্যে শান্তি স্থাপন করো, যেন তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও (হুজুরাত : ১০)। মহানবি (সা.) বলেন, “তোমরা আদমের সন্তান, আর আদম (আ.) মাটির তৈরি।

শিক্ষা জ্ঞান দেয় বটে; তবে জ্ঞান আমার লক্ষ্য নয়, আমার লক্ষ্য প্রয়োগ। গ্রন্থগত বিদ্যার মতো প্রয়োগহীন জ্ঞানও অর্থহীন। জ্ঞান মানুষের চিন্তাকে শাণিত করে, ধারণাকে করে তীক্ষè ও বুদ্ধিকে কার্যকর এবং মূল্যবোধকে করে সর্বজনীন।

আত্মপরিবর্তন-ভাবনা সৃজনশীলতায় ব্যাপক ভূমিকা রাখে। পৃথিবীর সবাই পরিবর্তন চায়। কিন্তু অবাক হই যখন দেখি- কেউ নিজেকে পরিবর্তন করছে না। তাহলে পৃথিবীতে কীভাবে পরিবর্তন আসবে! নিজেকে পরিবর্তন করলে পৃথিবীর পরিবর্তন স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়ে যাবে। আসলে নিজেকে পরিবর্তন করা খুবই কঠিন। শিক্ষিত হলে মনের পরিবর্তন আসে। আমি মনে করি, শিক্ষা ছাড়া অন্য কোনোভাবে আমাদের মনমানসিকতার পরিবর্তন সম্ভব নয়। শিক্ষা এমন একটি শক্তিশালী অস্ত্র যা আমরা অতি সহজে আমাদের মনমানসিকতা ও সমাজকে পরিবর্তন করার জন্য ব্যবহার করতে পারি। শুধু শিক্ষা যথেষ্ট নয়, প্রায়োগিক শিক্ষা প্রয়োজন। শিক্ষা জ্ঞান দেয় বটে; তবে জ্ঞান আমার লক্ষ্য নয়, আমার লক্ষ্য প্রয়োগ। গ্রন্থগত বিদ্যার মতো প্রয়োগহীন জ্ঞানও অর্থহীন। জ্ঞান মানুষের চিন্তাকে শাণিত করে, ধারণাকে করে তীক্ষ্ণ ও বুদ্ধিকে কার্যকর এবং মূল্যবোধকে করে সর্বজনীন।

সংস্কার মানে পরিবর্তনশীলতা। তবে এটিও মনে রাখতে হবে, সকল আন্দোলন যেমন উন্নয়ন নয়, তেমনি সকল পরিবর্তনও কল্যাণকর নয়। আমার যা পছন্দ হয় না- তা আমি পরিবর্তন করার চেষ্টা করি। যা আমি পরিবর্তন করতে পারি না- তা আমি গ্রহণ করার জন্য নিজের মনকে পরিবর্তন করে ফেলি। তবে যেটি পরিবর্তন করলে আমার ভালো লাগলেও অধিকাংশ লোকের ক্ষতি হয়- সেটি আমি পরিবর্তন না করে মেনে নেওয়ার চেষ্টা করি। আমি জানি, যা আসার তা আসবেই। একটি শক্তিশালী সেনা-আক্রমণকে রোধ করা যায়, কিন্তু একটি ধারণা যার আসার সময় হয়ে গেছে তা কোনোকিছু দিয়ে রোধ করা যায় না। সুতরাং অনড়তা নয়, বরং বিচক্ষণ পরিবর্তনশীলতাই প্রগতির লক্ষণ। প্রগতিশীল সরকার সৃজনশীলতাকে কাছে টেনে নেয়।
 
সৃজনশীলতা হচ্ছে অভীষ্ট লক্ষ্যের জীবনীশক্তি। এটা আমাদের কাজের উন্নতিতে অবদান রাখে, লোকজনকে সামনে এগিয়ে নেয় এবং আমাদের দেশকে উন্নত করে। একটি সৃজনশীল সরকার হয় একটি জীবন্ত পদ্ধতি, যা দেশের উন্নয়ন করে এবং মর্যাদা বাড়ায়।

চিন্তা, ধারণা এবং পরিকল্পনা সব লোকের কাছ থেকেই আসতে পারে। নাগরিক এবং অধিবাসী, শিশু এবং বয়স্ক, কর্মকর্তা এবং কর্মচারী- এদের প্রত্যেকের কাছ থেকেই চিন্তা, ধারণা এবং পরিকল্পনা গ্রহণ করা যায়, সে যতই সাধারণ হোক না কেন। আমার অভ্যাস প্রত্যেককে প্রশ্ন করা, নতুন চিন্তা ও ধারণা পাওয়ার জন্য। নতুন ধারণা বা চিন্তা আহরণের জন্য আমি বহু লোকজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। সেই ধারণা ও চিন্তা আমি আমাদের উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করি। সৃজনশীলতার গুরুত্ব বোঝাতে আমাকে অল্পবিস্তর অপ্রাসঙ্গিক হতে হবে। সৃজনশীলতা প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। সৃজনশীলতা ছাড়া অতীতের অর্জনসমূহকে আপনি কখনও চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন না। অন্যদের পেছনে ঠেলে না দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিকে পরিবর্তন করুন। দেখবেন, অনেক কাজ সহজ হয়ে যাবে; অসম্ভব বলে আর কিছু থাকবে না।

অনেকে মনে করেন, কাজের শেষ আছে। আমি বলি, জীবনের শেষ আছে, তবে কাজের শেষ নেই। প্রত্যেক মানুষ নিজস্ব বলয়ে একজন শিল্পী। শিল্পীর কাজ কখনও শেষ হয় না। একজন শিল্পী যখন তাঁর একটি শিল্পকর্ম শেষ করেছেন বলেন, তখন মূলত তিনি এটি সাময়িক বন্ধ রাখেন কিংবা পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন মাত্র। যতদিন জীবন ততদিন কাজ। কাজহীন মানুষ লাশের নামান্তর। কাজ করতে গেলে ভুল হয়। ভুল কাজের অংশ। তার ভুল হয় না- যে কোনোদিন কোনোকিছু করেনি। তাই আমি ভুলকে সৃষ্টির অনিবার্য অংশ মনে করি। তবে দেখতে হবে ভুল যেন মাত্রাতিরিক্ত না হয়।
 
মানুষের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হাত হচ্ছে ‘অজুহাত’, কোনো প্রয়াস ছাড়া মুহূর্তের মধ্যে লাখ লাখ অজুহাত তৈরি করা যায়। এটা একটা বাজে অভ্যাস। ব্যর্থতাকে ঢাকার জন্য অনেকে অজুহাত তৈরি করে- এটি আরও মারাত্মক। ব্যর্থতা মেনে নিতে হয়। কারণ, ব্যর্থতা অভিজ্ঞতার সোপান এবং সবচেয়ে বড় শিক্ষক। যার মধ্যে ব্যর্থতা মেনে নেওয়ার মানসিকতা নেই- সে কখনও সফলতা আশা করতে পারে না, কারণ সে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ হারিয়ে ফেলে। যৌক্তিক অপরাগতা স্বীকার সফল ও প্রতিশ্রুতিশীল মানুষের লক্ষণ।

এজন্যই প্রয়োজন জ্ঞান, অধ্যয়ন, বিচক্ষণতা এবং সততা। তাড়াহুড়ো চিন্তার সময়কে সীমিত করে, বাড়িয়ে দেয় ভুলের মাত্রা। ফলে অনেকে মাঝপথে তল্পিতল্পা গুটিয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। আমি ধীরে হাঁটি, তবে পিছু হাঁটি না। যদি কখনও পিছোই তাহলে ধরে নিতে হবে আগুয়ান হবার জন্য পরিকল্পনামাফিক পিছু হাঁটি। প্রতিষ্ঠানের পরিবেশের মধ্য থেকে সৃজনশীলতা কখনও লাভ করা যায় না। সৃজনশীলতা শেখার কোনো বিষয় নয় এবং জ্ঞানের বিস্তারও ঘটায় না। এটা কেউ একটি প্রতিষ্ঠান থেকে অর্জন করতে পারে না, বরং প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের পথ রুদ্ধ করে দেয় অথবা চিন্তা ও লক্ষ্যের পরিষ্কার ও স্বচ্ছ বিনিময়ের জন্য সাহস দিতে ব্যর্থ হয়। তবে, আমি এমন অনেক প্রতিষ্ঠানের কথা জানি, যে সকল প্রতিষ্ঠান সৃজনশীলতা বৃদ্ধি করার ক্ষমতা রাখে।
 
কীভাবে সৃজনশীল হওয়া যায়, এই প্রশ্নটা আসতেই পারে। এখানে আমি বলব- সেটা করতে হলে আমাদের নিজেদেরকে অভ্যাস করা  উচিত, অভ্যস্ত হওয়া নয়। পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে অভ্যস্ত করলে, তা আপনাকে স্বস্তি দেবে। অন্যদিকে, পরিবর্তন চাইলে কঠোর পরিশ্রম করতে হয় এবং আপনাকে স্বস্তির স্থান থেকে বের হয়ে আসতে হবে। মানুষ সাধারণত বদলাতে পছন্দ করে না এবং চাইলেই কেউ নিজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারে না। কেননা, এর জন্য প্রয়োজন অভ্যাসের পরিবর্তন। সকল সৃজনশীল মানুষের উদ্দেশে বলতে চাই, সবসময় আপনাকে এমন কাউকে খুঁজে বের করতে হবে, যিনি আপনার চিন্তাধারাকে বাস্তবায়নের জন্য প্রতিনিয়ত কাজ করে যাবেন। যিনি তাঁর মূল্যবান সময়টুকু ব্যয় করবেন আপনাদের কল্যাণে নিয়োজিত থেকে। যিনি নিজের স্বার্থকে পরের কারণে ত্যাগ করতে পারেন, বিলিয়ে দিতে পারেন- তিনিই প্রকৃত সৃজনশীল মানুষ। কারণ এর মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞানসমষ্টির সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিকেও সমৃদ্ধ করে। ঠিক পথে থাকার এটাই হচ্ছে প্রথম নিদর্শন। সকল কর্মকর্তার উদ্দেশে বলতে চাই- পরিবর্তনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন না, বরং একে আলিঙ্গন করে নিন। মনে রাখবেন, যে কোন কাজের শুরু আছে, কিন্তু কাজ অব্যাহত রেখে শেষ না হওয়া পর্যন্ত, কাজের ফল না পাওয়া পর্যন্ত- তাকে সৃজনশীল বা মহৎ কাজ বলা যাবেনা। সৃজনশীল বা মহৎ কাজের শুরু থেকে শেষ করা পর্যন্ত কাজটি করার উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে হবে।

সৃজনশীলতা কী? এটি এমন একটি বহুমুখী ও জটিল বিষয় যাকে কোনো সংজ্ঞায় বা বর্ণনায় পরিষ্কারভাবে আবদ্ধ করা যায় না। সৃজনশীলতা পুরোই অনুধাবনের এবং সঙ্গে সঙ্গে চেষ্টা ও প্রয়োগের সঙ্গে অবিচ্ছিন্নভাবে জড়িত একটি সতত পরিবর্তনশীল প্রত্যয়। আসলে It’s impossible to explain creativity. It’s like asking a bird, ‘How do you fly? You just do’. সুতরাং সৃজনশীলতার কোনো সংজ্ঞা বা গভীর বিবরণে না গিয়ে আমরা বলতে পারি : সৃজনের মন যখন সৃষ্টির জন্য উপযুক্ত হয়ে ওঠে এবং সৃষ্টি তার কর্মপ্রক্রিয়ায় নিজেকে মেলে ধরতে সক্ষম হয়, তখনই বিকশিত হয় সৃজনশীলতা।

আগামীকাল কাল থাকছে - “ভিশন-২০২১”

আরও পড়ুন - ‘বিনিয়োগ’, ‘বাংলার বসন্ত’, ‘সময়, শ্রম ও অধ্যবসায়’ ‘আমার আদর্শ আমার নায়ক’ , ‘ধৈর্য পরীক্ষা’, ‘খেলাধুলা ও বাংলাদেশ’ ‘অধ্যয়ন, লেখালেখি ও নেতৃত্ব’ ‘নারীর ক্ষমতায়ন ও বাংলাদেশ’, ‘সাফল্যের স্বর্ণদ্বার’ , ‘ঐক্যবদ্ধ শক্তি সাফল্যের মেরুদণ্ড’ ‘পদ্মা সেতু’, `বিজয়চিহ্ন 'V' প্রকাশে ভিন্নতা', ‘উন্নয়ন ও অগ্রাধিকার’ , ​‘ইতিবাচক ভাবনা সাফল্যের চাবিকাঠি’ , ‘ভবিষ্যতের সরকার কেমন হবে’   ‘মাতৃভাষার প্রতি মমতা’‘সুখ ও শান্তি : আমাদের করণীয়’ , ‘নেতৃত্বের শক্তি’ ‘আদর্শ জীবন গঠনে মূল্যবোধ’, ‘আমার প্রাত্যহিক জীবন’​, 'আমার অনুভব'

 

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত