কাদেরের হুঁশিয়ারি কতটা শুনছে তৃণমূল?

তানিম আহমেদ, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ০৮:৩৪ | প্রকাশিত : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ০৮:০৮

মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে হবে, তাদের মন জয় করতে হবে ভালো আচরণ দিয়ে-বলে যাচ্ছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। কয়েকজন সংসদ সদস্যকে ডেকে ‘ভালো হয়ে যেতে বলেছে’ আওয়ামী লীগ। তৃণমূলের বেশ কিছু নেতা-কর্মীকে ডেকে এনেও কথা বলেছে কেন্দ্র। আরও অনেককে ডাকা হয়েছে।

কেন্দ্রের এই কঠোর বার্তা কতটা শুনছে তৃণমূল? প্রায়ই নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-মারামারি, সন্ত্রাস, খুনোখুনিতে জড়াচ্ছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা। সবশেষ আওয়ামী লীগের টিকিটে নির্বাচিত একজন পৌর মেয়রের বিরুদ্ধে এক সাংবাদিককে গুলি করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে।  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক গোবিন্দ চক্রবর্তী মনে করেন, গত আট বছর ধরে টানা ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগকে এখন এখন রাজনীতিতে চ্যালেঞ্জ জানানোর মত অবস্থানে নেই অন্য কোনো দল। এমন একটি কথা রাজনৈতিক অঙ্গনে চাওর হয়ে গেছে যে আগামীতেও ক্ষমতায় আসছে আওয়ামী লীগই। এই অবস্থায় তৃণমূলে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই আরও জোরাল হয়েছে। অনেকেই হয়ত ভাবছেন, নিজের অবস্থান পোক্ত করতে পারলে আর্থিক বা অন্য কোনো সুবিধা পাওয়া যাবে। এ জন্যই বেপরোয়া আচরণ করছেন কেউ কেউ। 

প্রায়ই নেতা-কর্মীদের আচরণ বা কর্মকাণ্ডে বিব্রত হতে হচ্ছে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের। আগামী সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের নেতা-কর্মীদেরকে নেতিবাচক কর্মকা- থেকে বিরত রাখতে আপ্রাণ চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।

এর মধ্যেই বৃহস্পতিবার দুপুরে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের মারামারি গিয়ে গড়ায় হত্যা পর্যন্ত। পৌর মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হালিমুল হক মিরুর বাড়ি ঘেরাও করলে এই সংঘর্ষ বাধে। এ সময় বাড়ির ভেতর থেকে গুলি করা হলে তা গিয়ে লাগে দৈনিক সমকালের শাহজাদপুর প্রতিনিধি আব্দুল হাকিম শিমুলের গায়ে। পরদিন মারা যান শিমুল।

সিরাজগঞ্জের ঘটনা সম্পর্কে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, সাংবাদিক হত্যার ঘটনায় আওয়ামী লীগের যাদের নাম এসেছে তাদের বিরুদ্ধে তড়িৎ দলীয় এবং প্রশাসনিক কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। সিরাজগঞ্জে দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদককে ঘটনা তদন্ত করে রিপোর্ট দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলেও জানান কাদের।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বিষয়টি আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

শিমুল গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর দিন কুষ্টিয়া সদরের জিয়ারখারী ইউনিয়নে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত হন একজন। তার নাম ইদ্রিস আলী।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদের ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি আফজাল হোসেনের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলে আসছিলো। এই সংঘর্ষের একটি কারণ ছিল এই দ্বন্দ্ব।

এ ঘটনায় দুই পক্ষই আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফের দ্বারস্থ হন। বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি জানান।

গত ১ ফেব্রুয়ারিতে নড়াইলে খুন হয়েছেন ভদ্রবিলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রভাষ রায়। আওয়ামী লীগের দুই পক্ষে দ্বন্দ্বের জেরে এই হত্যা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এই ঘটনায় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা শহিদুর রহমান ও তার ছেলে আশিকসহ পাঁচজনকে আটকও করেছে পুলিশ।

ঢাকাটাইমসের নড়াইল প্রতিনিধি ফরহাদ খান জানান, নিহত প্রভাষ ও আটক শহিদুর রহমান ক্ষমতাসীন দলে দুটি উপদলের নেতৃত্ব দিতেন। এলাকায় আধিপত্য নিয়ে দুই পক্ষে নানা বিরোধ ছিল। আর তাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের জেরে খুন হয়েছেন প্রভাষ।

৩ ফেব্রুয়ারি নাটোরের লালপুরে খুন হয়েছেন এ বি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আব্বাস আলী খানকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ সময় আহত হন জমিরউদ্দিন নামে আরও একজন।

লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবু ওবায়েদের বরাত দিয়ে আমাদের নাটোর প্রতিনিধি সাইফুল ইসলাম জানান, নিহত আব্বাস আলী ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মিজান গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব চলে আসছিল দীর্ঘদিন ধরে। এ নিয়ে একাধিকবার ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটেছিল।

সমাধান কঠিন, বলছে আওয়ামী লীগ

আওয়ামী লীগের তৃণমূলে দ্বন্দ্ব, উপদলীয় কোন্দল আর বিশৃঙ্খলা দূর করতে নানা সময় চেষ্টা চালিয়েছে ক্ষমতাসীন দল। কোনো ঘটনা ঘটলে পুলিশও হাত গুটিয়ে থাকে এমন নয়। তারপরও কেন থামছে না এসব?- জানতে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর একজন নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করলে ঢাকাটাইমসকে তিনি বলেন, ‘দল ক্ষমতায় থাকলে ক্ষমতার ভাগাভাগির জন্য বিভিন্ন জায়গায় নেতাদের মাঝে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। আর এ দ্বন্দ্ব থেকেই সহিংসতাও হচ্ছে। এ বিষয়টি সমাধানের কথাও আমরা বলছি কিন্তু বাস্তবিক অর্থে তার সমাধান করা অনেক কঠিন।’

আওয়ামী লীগের এই নেতা এও জানান, দ্বন্দ্ব নিরসনের জন্য সাংগঠনিক সম্পাদকদেরকে বিশেষভাবে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তারা নানা সময় বিভিন্ন জেলা সফর করে নেতাদেরকে কেন্দ্রের কঠোর মনোভাব তুলে ধরছেন, ঢাকায় ডেকে এনেও কথা বলা হচ্ছে অনেকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘যেহেতু সামনে নির্বাচন তাই দলকে গোছানোর একটা বিষয় আছে। দল গোছালেই নির্বাচনী কাজও হয়ে যাবে। আর যেসব ঘটনা ঘটছে এগুলো সচরাচর হয়েই থাকে। তবে আমরা চেষ্টা করছি নেতাদের বোঝাতে। তারা যেন কোন খবরের শিরোনাম না হয়।’

আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের অন্য এক নেতা বলেছেন, ‘ঘটনা যেমনি হোক আওয়ামী লীগ নেতা কিংবা জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততা থাকলে আমাদের বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। যে কারণে আমরা নিয়মিত তৃণমূল সফর করছি। কারণ আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জনগণের ভোটেই আওয়ামী লীগ আবারও ক্ষমতায় আসবে। এ কারণে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা যাতে সহিংসতায় জড়িয়ে দলের ইমেজ নষ্ট না করতে পারে আমরা সেই ব্যবস্থাই নিচ্ছি। আমাদের অবস্থান পরিষ্কার দল করলে দলীয় নির্দেশনা মানতে হবে যারা মানবে না তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমাদের তৃণমূলে আমরা সেই নির্দেশনা পৌঁছে দেব।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব নিরসনে আমরা কাজ করছি। আশা করি দ্রুতই এর সমাধান করতে পারবো।’

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘দল করলে দলের শৃঙ্খলা মানতে হবে। যারা দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করবে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ তিনি বলেন, ‘কারো অপকর্মের দায়ভার দল বহন করবে না অপকর্মকারীেেদর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে আমরা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সবসময়ই বলে থাকি। কারণ আওয়ামী লীগে অপকর্মকারীদের ঠাঁই নেই।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক গোবিন্দ্র চক্রবর্তী ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষমতায় থাকায় দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা দলীয় কমান্ড মানতে চাচ্ছে না। এ কারণে বিভিন্ন জায়গায় তারা সহিংস আচারণ করছে। এটা যদি এখনই হ্রাস করা সম্ভব না হয় তাহলে নির্বাচনের আগে দলীয় কোন্দলের কারণে সহিংসতা আরও বৃদ্ধি পাবে।’

ওবায়দুল কাদের যেভাবে সতর্ক করেছেন তৃণমূলকে

অক্টোবরের শেষ দিকে দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে প্রায় প্রতিটি দলীয় কর্মসূচিতেই দলের নেতাকর্মীদেরকে সতর্ক করে আসছেন ওবায়দুল কাদের। তিনি বলছেন, সরকার অনেক ভালো কাজ করেছে। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের নেতিবাচক আচরণে তা ম্লান হয়ে যেতে পারে।

গত ২২ জানুয়ারি রাজধানীতে এক আলোচনায় ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘পার্টির নামে কেউ কোনো অপকর্ম করলে তা সহ্য করা হবে না। অলরেডি ব্যবস্থা নেয়া শুরু করেছি। চার-পাঁচ জন সংসদ সদস্যকে ডেকে ভালো হয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। আরও অনেককে ডাকা হবে।’

ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘খারাপ কাজ করলে খারাপ সময়ে আমরা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবো। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সরকারের শাসনামল ভেবে দেখুন। কয়জন তখন বাড়িঘরে থাকতে পেরেছেন? আর একবার ক্ষমতা হারালে তারা ২০০১ এর থেকেও ভয়ঙ্কর ভয়াল মূর্তি নিয়ে অবতীর্ণ হবে।...কিবরিয়া সাহেবের মতো লোক, আহসান উল্লাহ মাস্টার, নাটোরের মমতাজ উদ্দীনের মত ২১ হাজার নেতা-কর্মীকে রক্ত দিতে হয়েছে। তাই এখন সারাদেশে অপকর্ম যারা করছেন, তাদেরকে বলছি, সতর্ক হয়ে যান।’

(ঢাকাটাইমস/০৫ফেব্রুয়ারি/টিএ/ডব্লিউবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত