ভালোবাসার ধূম্রজালে ভুলে যাওয়া দীপালি-কাঞ্চনদের কথা

শেখ আদনান ফাহাদ
 | প্রকাশিত : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ০৮:৪৯

মানব জগতের সবচেয়ে পুরনো আবার সবচেয়ে  নতুন কথা কোনটি বলতে পারেন? আমার মনে হয়- ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’। কী এই ‘ভালোবাসা’? প্রেমিক-প্রেমিকা মনে করে ভালোবাসায় অধিকার সব তাদের। আবার বাবা-মা মনে করতে পারেন, সন্তানকে যে ভালোবাসা তারা দেন, তার তুলনা হয় না। ভাই-বোনের সম্পর্কে যে ভালোবাসার উপাদান থাকে, তার ব্যাখ্যা দেয়া খুব কঠিন কাজ। অনেকে আছেন নিজের বাবা-মা থেকে দাদা-দাদি কিংবা নানা-নানির ‘ভালোবাসা’কে রাখেন উপরে।

আমাদের সমাজে মামাদের ভালোবাসা নিয়ে তো ছড়া পর্যন্ত সৃষ্টি হয়েছে। তবে বোধকরি মানুষ সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে নিজেকেই। কোনো কোনো প্রেমিক যদিও আবেগের আতিশয্যে ‘তোমার জন্য জান দিতে পারি’ বলে বাগাড়ম্বর করে ফেলেন, দরকারের সময় সেই প্রেমিক আর এতটা সাহস দেখাতে পারেন না। আমরা আসলে নিজেকে ভালোবাসি বলেই অন্যকে ভালোবাসি।

ইদানীং তো ভালোবাসা আর প্রতিষ্ঠা যেন একসাথে চলে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে দেখবেন, যাদের রেজাল্ট ভালো কিংবা মনোযোগী ছাত্র এদের প্রেম সবার আগে হয়। ভালোবাসা দিয়ে আগে যেমন অসম্ভবকে সম্ভব করা যেত, এখন আর তা হয় না। আজকাল আগে অসম্ভবকে সম্ভব করতে হয়, তারপর ভালোবাসতে হয়। এখন সবাই খুব সচেতন; মন দেয়া-নেয়ার আগে একশবার ভেবে তারপরে দেয় অথবা নেয়। অংকে যারা ভালো তাদের জন্য খুব সহজ হয়। কোনদিকে গেলে কত লাভ। এই ছেলে কিংবা মেয়ের ভবিষ্যৎ কী? নানা হিসাব কষতে হয়। ভালোবাসা আগের থেকে অনেক বেশি দামি আর খরুচে। অসম্ভবকে সম্ভব করার ভালোবাসা এখন চলচ্চিত্রেও খুব একটা দেখা যায় না।

আমাদের দেশে তো ‘ভালোবাসা’ও এখন ‘প্রতিষ্ঠিত’দের দখলে চলে গেছে। ফলে ‘প্রেম’ হয় ঠিকই, কিন্তু প্রেম-কাহিনীর আর জন্ম হয় না। প্রেমের নামে যে কাহিনী উপাখ্যান আমরা জানি, তার বেশির ভাগই ব্যর্থ ‘প্রেমের গল্প’। এত হিসাব করে কি আর ভালোবাসা যায়? অংক কষে কি প্রেমিক হওয়া যায়? যে ভালোবাসায়, প্রেমে হিসাব থাকে, তাকে কী নাম দেয়া যায়? তবে বেহিসাবি ভালোবাসায় মজা যেমন আছে, কষ্টও কিন্তু কম নয়। শুধু কষ্ট কেন? নানা চ্যালেঞ্জ, যুদ্ধ সব আছে সে ভালোবাসায়। এ ভালোবাসায় যুদ্ধ যেমন আছে, যুদ্ধ জয়ের গৌরবও আছে, আবার পরাজয়ের ঝুঁকিও কম নয়। কিন্তু যুদ্ধ জয় করার মধ্যেই যে প্রেমিকের আসল  কীর্তি।

কিন্তু কী দরকার এত ঝামেলায় যাওয়ার। থাক; দরকার নেই এত কঠিন ভালোবাসার। তারচেয়ে বরং বিসিএসের প্রস্তুতি নেয়া অনেক ভালো। কী বলেন ভাইসব? ভালো আমলা হতে পারলে, ভালো বউ এমনিতেই পাওয়া যায়! আগে ঘাটের মাঝিই ‘প্রেম’করে ফেলত, এখন খোদ ঘাটের মালিকই ‘প্রেম’ করতে পারবে কি না সন্দেহ।

বাংলাদেশে আমরা যা করি কেমন যেন তেতো বানিয়ে ফেলি। তরকারিতে লবণ বেশি পড়ে গেলে যা হয়, আমাদের বঙ্গদেশে ‘ভালোবাসা’ও অনেক ক্ষেত্রে এমনি। আমরা মানুষ জন্ম বেশি দিই, বেশি ময়লা করি, বেশি ঘুষ খাই, বেশি মিথ্যা বলি, বেশি বড়াই করি,  বদন কিতাবে (ফেইসবুকে) বেশি বেশি অ্যাকাউন্ট ওপেন করি, পোস্ট বেশি দিই, ক্ষমতার কাছে কেউ থাকলে তার পোস্টে লাইক বেশি দিই। সবকিছুর মতো ভালোবাসাও আমাদের বেশি বেশি। আমরা অসহ্য দুর্গন্ধযুক্ত ডাস্টবিনের পাশে জ্যামে পড়ে হুড তোলা রিকশায় প্রেমিকার হাত ধরে বলতে পারি- ‘এ আকাশ আমার’। এমন ভালোবাসাপূর্ণ একটি দেশে যে কত অনাচার হয়েছে, তাও আমাদের মনে থাকে না। সাধারণ কোনো দিবসেই মানুষ এখন নীতি-নৈতিকতা আর আদর্শের কথা শুনলে বিরক্ত হয়। ভালোবাসা দিবসে লেকচার দিতে যাওয়া তো এখন রীতিমতো অপরাধের শামিল!

জানি অনেকে আমাকে গালি দেবেন, ভাববেন জীবনে কিছু করতে পারিনি বলে আপনাদের সামনে লেকচার দিচ্ছি। কিন্তু ভালোবাসার পাশাপাশি জিঘাংসা আর ঘৃণার ইতিহাসও তো মানুষের জানা দরকার। ভালোবাসা দিয়ে অন্যায়-অপরাধ জয় করা যায়, কিন্তু ঢেকে দেয়া যায় না। এমনিতে  বিদেশের প্রতি আমাদের আগ্রহ অসীম। সে বিদেশ যদি হয় পশ্চিম তখন তো বিষকে দুধ মনে করে খেয়ে ফেলতেও আমাদের ভালো লাগে। বাংলাদেশের সবুজ মাঠ আমাদের ভালো লাগে না, যত ভালো লাগে বিদেশের মাইনাস তাপমাত্রা। দেশের কৃষি ভালো লাগে না, মন ছুটে যায় বিদেশের টয়লেটে, রাস্তায়। যা-ই হোক, বিদেশের প্রতি আমাদের আগ্রহ ও আনুগত্য অনেক ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার মতো হয়ে গেছে। ভালোবাসার ক্ষেত্রেও এতটুকু ব্যতিক্রম হয়নি আমাদের। বিদেশের প্রতি আমাদের এই মোহ আর প্রশ্নাতীত আনুগত্য সম্পর্কে জানতেন এদেশের কিছু জ্ঞানপাপী। তাই তারা স্বৈরাচার এরশাদের আমলে এদেশে আমদানি করেছিলেন পশ্চিম থেকে ভালোবাসা দিবস উদযাপনের ‘সংস্কৃতি’। অন্য সবকিছুর মতো বিদেশি ‘ভালোবাসা’ পেয়ে আমরা তাতে মশগুল হলাম। ভুলে গেলাম এরশাদের আমলে বাংলাদেশকে ভালোবেসে জীবন দেয়া তরুণ-তরুণীদের কথা। বিদেশের ‘ভালোবাসা’য় আমরা ভুলে গেছি সেই ১৯৮৩ সালে ১৪ ফেব্রুয়ারি এরশাদের পুলিশের হাতে খুন হওয়া জাফর, জয়নাল, কাঞ্চন, দিপালী সাহা, মোজাম্মেলদের কথা।

একাত্তরে সশস্ত্র বিপ্লব করে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশে একজন স্বৈরাচার কেন রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকবে? ‘এ রকমই এক প্রেক্ষাপটে ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি রচিত হয়েছিল স্বাধীনতা উত্তরকালে উত্তাল তারুণ্যের এক অগ্নিঝরা দিন। কুখ্যাত মজিদ খানের শিক্ষানীতি বাতিলের দাবিতে সেদিন প্রাণ দিয়েছিল জাফর, জয়নাল, কাঞ্চন, দিপালী সাহা, মোজাম্মেলসহ আরও অনেক তাজা প্রাণ। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই গৌরবময় দিনটি যেখানে হতে পারত গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে সমুন্নত করা, বৈষম্যের শিক্ষানীতি রুখে দেবার প্রেরণা, কিন্তু তা না হয়ে ভোগবাদী সংস্কৃতির কদর্যতায় এই দিনটিকে ঢেকে দেয়া হচ্ছে। তথাকথিত ‘ভালোবাসা দিবসের’ জোয়ারে মধ্যে ফেব্রুয়ারির ভালোবাসার মানুষগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। সামরিক শাসক এরশাদ প্রণয়ন করেছিল গণস্বার্থবিরোধী মজিদ খান শিক্ষানীতি। ড. মজিদ খানের শিক্ষানীতিতে সাধারণ ও উচ্চশিক্ষা সংকোচনের ও ব্যয়বহুল করার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছিল। এই শিক্ষানীতিতে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ ত্বরান্বিত করতে সুপারিশ করা হয়েছিল “….. অর্থাৎ শিক্ষার বেতনের ৫০ ভাগ শিক্ষার্থীদের থেকে আদায় করা হবে।” রেজাল্ট খারাপ হলেও ৫০ শতাংশ বেতন দিলে উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেয়ার কথা বলা হয়েছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের অধিকারকে কতল করার উদ্দেশ্যে সুপারিশ করা হয়েছিল “বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে রাষ্ট্রের মতই স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা হয়েছে। ফলে গবেষণা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনার কেন্দ্র হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৃত ভূমিকা থেকে সরে গেছে।” জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বায়ত্তশাসনের নামে আসলে স্বাধীনতা দিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি জানতেন মুক্তবুদ্ধিচর্চা করতে গেলে স্বাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বঙ্গবন্ধুর দিয়ে যাওয়া স্বায়ত্তশাসন বিলুপ্ত করতে চেয়েছিল এরশাদ সরকার।

গণবিরোধী এ শিক্ষানীতি এদেশের সংগ্রামী ছাত্রসমাজ মেনে নেয়নি। বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। শিক্ষানীতি বিরোধী আন্দোলন এক পর্যায়ে রাজনৈতিক আন্দোলন তথা স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করে।

সরকার গঠনের দুদিন পরই ছাত্ররা সাভারে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করতে গিয়ে সামরিক স্বৈরতন্ত্রবিরোধী স্লোগান দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সেনানিবাস থেকে সৈন্যবাহিনী ছুটে এসে ছাত্রদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালায়। ৮ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্রদের মিছিলে পুলিশ নির্বিচার লাঠিপেটা করে। এর প্রতিবাদে ১৪টি ছাত্রসংগঠন মিলে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তুলে আন্দোলনের দৃঢ় শপথ নেয়। এই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারেই ১৪ ফেব্রুয়ারি কুখ্যাত মজিদ খানের শিক্ষানীতি বাতিলের দাবিতে কলাভবনে বিশাল ছাত্রসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ শেষে স্মারকলিপি প্রদানের উদ্দেশ্যে সচিবালয় অভিমুখে মিছিল শুরু হয়। মিছিলটি কার্জন হল ও শিক্ষা ভবনের সামনে পৌঁছানো মাত্রই পুলিশ গুলি ছোড়ে। গুলিতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে জাফর-জয়নাল-দিপালী সাহা। সর্বমোট ১১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। যদিও সরকারি হিসেবে বলা হয় মৃতের সংখ্যা মাত্র একজন। গ্রেপ্তার-নির্যাতন সীমা ছাড়িয়ে যায়। সরকারি হিসেবেই গ্রেপ্তারের সংখ্যা ছিল ১৩৩১ জন। যদিও বাস্তব পরিস্থিতি ছিল আরও ভয়াবহ। 

১৪ ফেব্রুয়ারি শহীদ ছাত্রদের মরদেহ জানাজার জন্য অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে রাখা হলে সেখানেও হামলা চালায় পুলিশ। ছত্রভঙ্গ হয়ে ছুটে যায় ছাত্ররা। প্রাণহীন শহীদদের লাশ সূর্যসেন হল পর্যন্ত বয়ে নিয়ে গেলে হলের গেট ভেঙে যৌথ বাহিনী ছিনিয়ে নেয় লাশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্র-কর্মচারীদের রুমে ঢুকে তাদের ওপর নিপীড়ন চালায় যৌথ বাহিনী। এ খবর সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লে পরদিন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এ আন্দোলনে যোগ দেয়। তীব্র আন্দোলনের মুখে ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি বাতিল করতে বাধ্য হয় স্বৈরাচারী সামরিক সরকার’ (বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের ওয়েবসাইট থেকে সংগৃহীত)।

‘বিদেশী’ ভালোবাসা দিবস উদযাপন করতে গিয়ে আমরা ভুলে গেলাম আমাদেরই দীপালিদের! যারা ভালোবেসেই জীবন দিয়েছিল পুলিশের গুলিতে। তাদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আমরা আজ পালন করি ‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবস’। ভালোবাসতে কোনো বাধা নেই। তাই বলে এমন আত্মঘাতী ‘ভালোবাসা’! যে জাতি নিজের ইতিহাসকে ভালোবাসে না, সে ব্যক্তিগত জীবনেও প্রেম-ভালোবাসার কদর করতে শিখবে না। আমাদের মুরব্বিরা পাপ করে গেছেন। সে পাপের সাগরে ভেসে আমরা ভাবছি, আমরা ভালোবাসছি। আমরা আসলে ভালোবাসছি না, ভেসে চলেছি। ভেসে চলেছি এক অজানা ধ্বংসের পথে।

লেখক. সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত