‘পুরুষ নির্যাতন প্রতিরোধ আইন’ দাবির নেপথ্যে

বোরহান উদ্দিন, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৬ মার্চ ২০১৭, ০৯:৪২ | প্রকাশিত : ১৬ মার্চ ২০১৭, ০৮:১৪

নারায়ণগঞ্জের ভুঁইঘরের যুবক শেখ খায়রুল আলম। পারিবারিকভাবে ২০১৩ সালে একই এলাকার শায়লা তাবাসসুম রিমিকে (ছদ্মনাম) বিয়ে করেন। কথা ছিল দুই মাস পর আনুষ্ঠানিকভাবে মেয়েকে স্বামীর ঘরে তুলে দেবেন মেয়ের বাবা। কিন্তু পরে তার কিছুই হয়নি। উল্টো শ্বশুর ও স্ত্রী কর্তৃক যৌতুক এবং নারী নির্যাতন মামলার আসামি হয়েছেন খায়রুল। জেল খেটেছেন ৭৭ দিন। জামিনে মুক্তি পেলেও মামলার ঘানি টানতে টানতে খায়রুল এখন দিশেহারা।

নিজের জীবনে এমন বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে খায়রুল পুরুষ নির্যাতন আইন প্রবর্তনের দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছেন। তাতে বেশ সাড়াও পেয়েছেন। ইতিমধ্যে অনেকে তার দাবির সঙ্গে শামিল হয়েছেন, যারা তার মতো নানাভাবে বিনা দোষে হয়রানি পোহাচ্ছেন; অনেকে আবার প্রবাসে থেকে কষ্টার্জিত টাকা স্ত্রীর হাতে তুলে দিয়ে নিঃস্ব।

স্ত্রীর নির‌্যাতনের শিকার পুরুষদের নিয়ে খায়রুল এক বছর আগে গড়ে তোলেন একটি সংগঠন। নাম ‘পুরুষ নির্যাতন প্রতিরোধ আন্দোলন বাংলাদেশ (পুনিপ্রআবিডি)’। ইতিমধ্যে দেশের ১৫ জেলায় কমিটি দেয়া হয়েছে এই সংগঠনের। কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে আছেন শেখ খায়রুল আলম।

পুরুষ নির্যাতন প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলার পেছনের গল্প শোনাতে গিয়ে বুধবার খায়রুল আলম  ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘বিয়ের পর স্ত্রীকে ঘরেও আনতে পারিনি, অথচ যৌতুক ও নারী নির্যাতন মামলার আসামি হলাম আমি। বিনা দোষে দুই মাস জেল খাটার পর উপলব্ধি হয় যে সমষ্টিগতভাবে এর প্রতিবাদ করতে হবে। সেখান থেকেই সংগঠন করা।’

খায়রুল বলেন, ‘দেশে হাজার হাজার যুবক স্ত্রী ও শ্বশুরবাড়ির মিথ্যা মামলায় হয়রানির শিকার হচ্ছে। তাই নির‌্যাতনের প্রতিবাদে সবাইকে সোচ্চার করতে এই উদ্যোগ।’ 

যেসব জেলায় প্রবাসী বেশি, সেসব জেলার বেশির ভাগে এই সংগঠনের কমিটি আছে বলে জানান খায়রুল।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এই সংগঠনের পক্ষ থেকে ২১ দফা দাবি আদায়ে মানববন্ধন, জেলা প্রশাসককে স্মারকলিপি প্রদান, গণস্বাক্ষর কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। এ ছাড়া সম্প্রতি ‘যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৭' এর খসড়া মন্ত্রিসভায় নীতিগত অনুমোদন হওয়ার পর এর কিছু বিষয় সংশোধনের জন্য রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে পুনিপ্রআবিডি।

সবশেষ বুধবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ২১ দফা দাবি নিয়ে মানববন্ধন করে পুরুষ নির্যাতন প্রতিরোধ আন্দোলন।

কি আছে ২১ দফায়

নারী নির্যাতন আইনের মতো ‘পুরুষ নির‌্যাতন দমন আইন’ প্রণয়ন; নারী ও শিশু নির্যাতন দমন এবং যৌতুক নিরোধ আইনের সংশোধন; নারী নির্যাতন ও যৌতুক মামলা বিশেষ ট্রাইবুনালে দ্রুত শেষ করার ব্যবস্থা করার দাবি জানায় পুনিপ্রআবিডি।

তাদের অন্যান্য দাবির মধ্যে রয়েছে:

১. নারী নির্যাতন ও যৌতুক মামলা মিথ্যা প্রমাণিত হলে বাদীকে কঠিন শাস্তির আদেশসহ পর‌্যাপ্ত জরিমানার ব্যবস্থা করা; ২. বিনা অপরাধে জেল খাটালে বাদীকে ক্ষতিপূরণসহ শাস্তি দেয়া; ৩. স্ত্রীর মামলায় সুষ্ঠু তদন্ত ছাড়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা যাবে না; ৪. তদন্ত ছাড়া শ্বশুর-শাশুড়ি, ননদ-দেবরকে আসামি করা যাবে না; ৫. স্বামীর অধিকার থেকে বঞ্চিত করলে তদন্ত সাপেক্ষে স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করার ব্যবস্থা।

স্ত্রীর কর্মকাণ্ডের দায় স্বামীর ওপর যাতে না বর্তায় সে বিষয়ে তাদের দাবি হলো: ৬. সন্তান হওয়ার পর স্ত্রী স্বেচ্ছায় অন্যের কাছে চলে গেলে সন্তানকে স্বামীর হেফাজতে দেয়া; ৭. স্ত্রী স্বেচ্ছায় স্বামীকে তালাক দিলে সে ক্ষেত্রে স্বামীর কোনো দোষ না থাকলে স্ত্রী জরিমানাস্বরূপ স্বামীকে দেনমোহরের সমপরিমাণ টাকা পরিশোধ করবে; ৮. বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে ত্যাগ করতে বাধ্য করলে স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাক দেয় তাহলে স্বামীকে যাতে দেনমোহরের টাকা পরিশোধ করতে না হয় তার ব্যবস্থা করতে হবে। অবশ্যই সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে; ৯. স্বেচ্ছায় স্ত্রী শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে গেলে কোনো খোরপোষ পাবে না; ১০. স্ত্রী নিজ পিত্রালয়ে অবস্থানকালীন কোনো দুর্ঘটনা ঘটালে বা আত্মহত্যা করলে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া মিথ্যা মামলা দিয়ে স্বামীকে যাতে হয়রানি করতে না পারে সেই ব্যবস্থা করা;

এ ছাড়া ১১. মহিলা কর্তৃক পুরুষ যৌন নির্যাতনের শিকার হলে ওই মহিলার বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলার ব্যবস্থা কর; ১২. তালাকের পর দেনমোহর ও খোরপোষের মামলা ছাড়া অন্য কোনো মামলা দিয়ে স্বামীকে যাতে হয়রানি করতে না পারে; ১৩. পুরুষ বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা এবং সর্বোপরি আইনের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ বিবেচনা না করার দাবি জানায় পুরুষ নির্যাতন প্রতিরোধ আন্দোলন।

তারা চায় নারী-পুরুষ সমান অধিকার নিয়ে নির্যাতনমুক্ত একটি সুখী ও সমৃদ্ধ দেশ।

খায়রুলের নিজের কথা

নিজের জীবনের হয়রানির কাহিনী তুলে ধরে খায়রুল আলম বলেন, ‘২০১৩ সালের ১৮ অক্টোবর একই এলাকায় পারিবারিকভাবে আমাদের কাবিন বিয়ে হয়। কিন্তু নারায়ণগঞ্জে না করে মেয়ের বাবার আগ্রহে ঢাকার মানিকনগরে এক লাখ টাকা মোহরানায় কাবিন হয়। ওই সময় মেয়ের বাবা দুই মাস পর মেয়েকে উঠিয়ে দেয়ার কথা বললেও পরে টালবাহানা শুরু করেন।’

খায়রুল বলেন, ‘এর মধ্যে আমার স্ত্রীর সঙ্গে অন্য পুরুষের সম্পর্কের বিষয়টি জেনে গিয়ে এর প্রতিবাদ করলে উল্টো ২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জ কোর্টে আমার বিরুদ্ধে যৌতুকের মামলা দেয় তারা। কিন্তু সিনিয়র সহকারী জজ হুমায়রা তাসনিম তদন্ত করে এর কোনো সত্যতা পাননি। পরে তারা আমার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন মামলা করে।’

এই মামলায় খায়রুলের বিরুদ্ধে আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। ২০১৬ সালে মার্চ মাসে গ্রেপ্তার হন তিনি। ৭৭ দিন কারাবাসের পর নারায়ণগঞ্জ জেলা জজ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পান।

‘কিন্তু ততক্ষণে আমার ডিলারশিপ ও পোল্ট্রি ব্যবসা তছনছ হয়ে গেছে। পরে এ নিয়ে আমি হাইকোর্টে যাই। এখন এই মামলা শুনানির অপেক্ষায় আছে।’ বলেন খায়রুল। নারী নির‌্যাতন মামলায় জামিন পেলেও রেহাই মেলেনি তার। বলেন, ‘আমার নামে ভুয়া স্ট্যাম্প তৈরি করে আমার কাছে দুই লাখ টাকা দাবি করা হয়।’

তাদের দাবি আদায়ের ব্যাপারে কতটা আশাবাদী জানতে চাইলে খায়রুল বলেন, ‘সব পুরুষ যদি সোচ্চার হই তাহলে অবশ্যই সরকার আমাদের দাবি নিয়ে চিন্তা করবে। তাই যত দিন দাবি পূরণ না হবে তত দিন আন্দোলন করে যাব।’

(ঢাকাটাইমস/১৬মার্চ/বিইউ/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত