মনের আলোয় বাঁচতে চায় ওরা

এম, মনিরুজ্জামান, রাজবাড়ী
 | প্রকাশিত : ১৬ মার্চ ২০১৭, ১০:০২

চেহারা, হাটাচলা এবং কর্মকাণ্ড দেখলে সাদা চোখে মনে হবে- ওরা চার ভাই সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ। তবে কাছে গেলে বোঝা যাবে আসলে তারা সবাই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। যদিও তারা মানসিকভাবে শক্তিশালী। অন্তরের চোখ দিয়ে উপলব্ধি করেন সবকিছু। ভেঙ্গেপড়া নয়, মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার প্রত্যয় রয়েছে তাদের। আর ওই প্রত্যয়ের অংশ হিসেবে পরিবারের বোঝা নয়, সম্পদ হবার মনবাসনায় মৎস্য চাষের মাধ্যমে এগিয়ে যাচ্ছেন তারা।

বলছিলাম, আবুল বাশার মিয়া, আবুল কালাম মিয়া, আব্দুস সালাম মিয়া এবং আব্দুল মোতালেব মিয়ার কথা।

রাজবাড়ী সদরের বানিবহ পূর্বপাড়া গ্রামে একই পরিবারের চার অন্ধ ভাইয়ের বাড়িতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেল চার ভাইয়ের কিশোর বয়সে পৃথিবীর অপরূপ দৃশ্য দেখতে না পারার করুণ গল্প।

শিশুকালে তারা অন্য শিশুদের মত পড়ালেখাসহ খেলাধুলা করতে পারলেও ১০-১২ বছর বয়সে এসে দিন দিন চেখের আলো নিভে যাওয়ার নির্মম গল্পগাঁথার কথা। তারা রাজবাড়ী জেলা সদরের বাণিবহ ইউনিয়নের পূর্বপাড়ার আবুল খায়ের মিয়ার ছেলে।

জেলা শহর থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে থাকা আবুল খায়ের মিয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ওই চার ভাই এক সাথে বাড়ির পুকুরে অবস্থান করছে।

তারা এক সাথে দিচ্ছেন মাছের খাবার। কারণ জানতে চাইলে, তারা বলেন, আমরা আর বাবা-মার বোঝা নই। আমরা এখন স্বাবলম্বী হতে যাচ্ছি। এতো দিন বাড়ির এ পুকুরটি তার বাবা অন্যের কাছে লিজ দিয়ে রেখেছিলেন। এখন তারা চার ভাই পুকুরটিতে মাছ চাষ শুরু করেছেন। গত দুই বছর ধরে তারা পুকুরে মাছ ছেড়েছেন। ৫০ শতাংশ জমির উপরে থাকা এ পুকুরটির চাষাবাদে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার টাকা। ইতোমধ্যেই পরিবারিক দৈন্যতার কারণে তারা মাছ বিক্রি করেছেন ২০ হাজার টাকার। এখনো পুকুরে যে পরিমাণ মাছ রয়েছে তা ৩০-৩৫ হাজার টাকারও বেশি দামে বিক্রি করা সম্ভব হবে।

বড় ছেলে আবুল বাশার মিয়া বলেন, তিনি অন্যদের মত সুস্থ ও স্বাভাবিক ছিলেন। এসএসসি পরীক্ষা দেবার সময় হঠাৎ করেই তার দৃষ্টিশক্তি কমতে শুরু করে। হাজারো চেষ্টা, হাসপাতাল, চিকিৎসকের কাছে গিয়েও দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে তিনি আর চোখে কিছুই দেখতে পান না। পরবর্তীতে তিনি তথ্য গোপন করে বিয়ে করলেও ছয় বছরের বেশি টেকেনি তার সংসার, অন্যের হাত ধরে চলে যায় তার স্ত্রী। রেখে যায় চার বছরের একটি ফুটফুটে মেয়ে সন্তান। এখন তিনি পরিবারের বোঝা। বাবা-মাসহ অন্যান্য ভাইদের সাথে মিলে পার করছেন দিন।

মেঝো ভাই আবুল কালাম মিয়া বলেন, তিনিও ২২ বছর বয়স পর্যন্ত স্বাভাবিক ছিলেন। এরপর ধীরে ধীরে তার দৃষ্টিশক্তি কমে যায়। তবে তার আপন খালাতো বোনকে বিয়ে করেছেন। তার স্ত্রী স্বামীর অন্ধত্ব মেনে নিয়েই বিয়ে করেন। বর্তমানে স্ত্রী ও একটি শিশু মেয়ে রয়েছে তাদের। বাবার রোজগারের উপরই তার ভরসা। বাবাই চালান সংসার।

তিনি আরো বলেন, ২২ থেকে ২৫ বছর বয়সের মধ্যেই তারা চার ভাই দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। জেনেটিক সমস্যার কারণে এমনটি হয়েছে। এই রোগের কোন চিকিৎসা নেই। অন্ধত্ব নিয়েই বাকি জীবন বাঁচতে হবে তাদের।

অপর ভাই আব্দুস সালাম মিয়া বলেন, তার ছোট ভাইও বিয়ে করেছে প্রতিবেশী এক মেয়েকে। ওই ভাইয়েরও একটি ছেলে রয়েছে। তবে বড় ভাইয়ের স্ত্রী চলে যাওয়া দেখে তিনি আর বিয়ের পিঁড়িতে বসতে সাহস করেননি। তবে তিনিই মূলত ছুটোছুটি করেন। শিশুকাল থেকে ১৪-১৫ বছর পর্যন্ত ভাল থাকায় পূর্বচেনা-জানা নিজ বাড়ি বা গ্রামের পথ ঘাটে চলতে কোন সমস্যা না হলেও জেলা শহর অথবা হাট বাজারে গেলে তিনি সাদাছড়ি ব্যবহার করেন।

এক পর্যায়ে তিনি জেলা মৎস্য অফিসের মাধ্যমে গ্রহণ করেন ‘মৎস্য চাষ প্রশিক্ষণ’। আর ওই প্রশিক্ষণ গ্রহণের পরই পাল্টাতে শুরু করেন তিনি। অপর তিন ভাইকে মৎস্য চাষে করেন উদ্ভুদ্ধ। বাড়ির পুকুরটিতে নিজেরাই শুরু করেছেন মৎস্য চাষ।

সদর উপজেলা মৎস্য অফিস ‘ইউনিয়ন পর্যায়ে মৎস্য চাষ প্রযুক্তি সেবা সম্প্রসারণ প্রকল্প (২য় পর্যায়)’ থেকে গত মার্চ মাসে ‘কার্প মিশ্র চাষ ফলাফল প্রদর্শনী খামার’ তৈরির জন্য ৩৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেবার কথা ছিল। তবে তিনি ওই প্রকল্পের মাত্র ২২ হাজার টাকা পেয়েছেন। বাকি টাকা সে আজও  হাতে পাননি।

ছোট ভাই আব্দুল মোতালেব মিয়া বলেন, আমরা এখন মাছ চাষ শুরু করেছি। আর পর নির্ভর হব না। চার ভাই এ মাছ চাষ করেই জীবিকা নির্বাহ করব।

তবে তাদের বাবা আবুল খায়ের মিয়া বলেন, তিনি তার আপন চাচাতো বোন মরিয়ম বেগমকে বিয়ে করেছেন। তার চার ছেলে ও তিন মেয়ে রয়েছে। মেয়েরা সুস্থ স্বাভাবিকভাবে জীবন-যাপন করলেও চার ছেলেকে নিয়ে পরেছেন বিপাকে। এ চার ছেলেই ১০-১২ বছর বয়স থেকে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছে। একের পর এক মাঠের জমা-জমি বিক্রি করে চিকিৎসা সেবা করার পরও কোন ছেলেরই দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।

চিকিৎসকরা বলেছেন, জেনেটিক সমস্যার কারণে তাদের দৃষ্টিশক্তি আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। বর্তমানে অনেক কষ্টে তিনি তার সংসার পরিচালনা করছেন। যদিও প্রতিবন্ধী ভাতা, দশ টাকা কেজির চালের কার্ডসহ সরকারি অন্যান্য কোন সহযোগিতা তারা পাচ্ছেন না।

চোখের জল ছেড়ে দিয়ে আবুল খায়েরের স্ত্রী মরিয়ম বেগম বলেন, বৃদ্ধ বয়সে মানুষ সন্তানদের উপর ভরসা করে। আর আমাকে এখনো ওদের রান্না-বান্নসহ সকল কাজ করে দিতে হচ্ছে। যদিও তারা এখন পুকুরে মাছ চাষ শুরু করেছে। সফলভাবে তারা এগিয়ে যাক সে কামনাই করেন তিনি।

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. আমজাদ হোসেন জানান, এই রোগের নাম রেটিনাইটস পিগমেনটোসা (আর,পি)। এটি বংশগত রোগ। সাধারনত যারা আপন আত্মীয়র মধ্যে বিয়ে করে তাদের ছেলে বাচ্চারা এই রোগে আক্রান্ত হয়। রোগটি দুই চোখ একইভাবে আক্রান্ত হয়। প্রথমে রাতকানার রোগের মধ্যদিয়ে এই রোগটি শুরু হয়। ২০-২৫ বছর বয়সের মধ্য এর প্রখরতা বৃদ্ধি পায়। চোখের পেছনের পর্দা বা রেটিনা আক্রান্ত হয়।

তিনি জানান, এই রোগের আজ  অবদি ভাল চিকিৎসা নেই। তবে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন-এ ও ভিটামিন-ই এবং হলুদ ফলমূল শাকসবজি খেলে কিছুটা উন্নতি হতে পারে। এই রোগ থেকে মুক্তি পেতে চিকিৎসা থেকে সচেতনতাই বেশি কার্যকর বলে তিনি মনে করেন।

সদর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী বলেন, ওই খামারটির প্রতি তাদের পৃথক দৃষ্টি রয়েছে। তারা মাঝেমধ্যেই সেটির খোঁজ নেন।

(ঢাকাটাইমস/১৬মার্চ/প্রতিনিধি/এলএ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত