বোদায় অযত্নে সাড়ে তিন হাজার শহীদের বধ্যভূমি

মোফাজ্জল হোসেন বিপুল, বোদা (পঞ্চগড়)
 | প্রকাশিত : ২৫ মার্চ ২০১৭, ১৮:৩৫

পঞ্চগড় জেলার বোদায় উপজেলা সদর থেকে ১১ কি.মি. দক্ষিণে পাঁচপীর ইউনিয়নে ইসলামপুর এলাকায় ধাপঢুপ বিল তথা ধাপঢুপ বধ্যভূমিটি। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বহনকারী জেলার একমাত্র বধ্যভূমিতে স্বাধীনতার ৪৬ বছর পার হলেও আজো স্মৃতি সংক্ষরণের কোন ব্যবস্থা করা হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের সময়ের এই ভয়াল স্মৃতিকে ধরে রাখতে ধাপঢুপ বিলের পাড়ে ২০১১ সালে পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক বনমালী ভৌমিকের পরিকল্পানায় জেলা পরিষদের অর্থায়নে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জন্য ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। তবে আজো তা বাস্তবায়িত হয়নি।

ওই এলাকার প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি কোনো এক শুক্রবারে পঞ্চগড় জেলার সবচেয়ে বড় গণহত্যার ঘটনাটি ঘটেছিল পাঁচপীর ইউনিয়নের এই ধাপঢুপ বিলের পাড়ে। পাকিস্তানি সেনাদের অত্যাচার সইতে না পেরে ইসলামপুর গ্রামের ধাপঢুপ বিল সংলগ্ন আম বাগানে এসে সমবেত হয়েছিল শুকানপুকুরী, জাঠিভাঙ্গা, পাঁচপীর, জগন্নাথপুর, সালন্দর ও শিবকাঠি এলাকার কয়েক হাজার সংখ্যালঘু পরিবার ও অন্যান্য এলাকা থেকে পালিয়ে আসা তাদের আত্মীয়-স্বজন। চারিদিকে গোলাগুলি আর হত্যাযজ্ঞের কারণে ওরা প্রাণ ভয়ে ঘরবাড়ি ফেলে পরিবার-পরিজন নিয়ে ওই জায়গায় সমবেত হয়েছিলেন নিরাপদ আশ্রয়ের আশায়। পরিকল্পনা ছিল ওই পথে ভারতে পাড়ি জমাবার। বিশ্রামের এক পর্যায়ে রাজাকারদের দেয়া খবরে হঠাৎ চলে আসে পাকিস্তানি সেনাদের কয়েকটি ট্রাক। চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে সকল নারী-পুরুষকে।

শুরুতেই নারীদের আলাদা করে নেয় তারা। কিছু কিছু নারীর ওপর চালানো হয় পাশবিক নির্যাতন। পরে পুরুষদের নিয়ে আসা হয় ধাপঢুপ বিলের পাড়ে। শুরু হয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আর গুলি করে হত্যা। একে একে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার পুরুষকে হত্যা করে ফেলে দেয়া হয় ধাপঢুপ বিলে। হাজারো মানুষের তাজা রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল উপজেলার ধাপঢুপ বিলের পানি।

তারা আরো জানান, সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে উঠেন মরদেহের স্তূপে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকা শুকানপুকুরী এলাকার সপেন্দ্র নাথ রায়। ডান বাহুতে গুলি আর কাঁধে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে অজ্ঞান হয়ে লাশের স্তূপে পড়ে থাকায় ঘাতকরা মনে করেছিল তিনিও মারা গেছেন। হত্যার প্রায় ঘণ্টাখানেক পর সপেন্দ্র নাথের জ্ঞান ফিরে এলে স্থানীয় কয়েকজনের সহায়তায় পালিয়ে যান ভারতে। সেখানে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি।

শরীরে সেই ক্ষত নিয়ে আজো বেঁচে থাকা সপেন্দ্র নাথ রায় জানান, তার সঙ্গে সেদিন ক্ষেত্র মোহন, থেপু বর্মন, শীতেন চন্দ্র, মলিন চন্দ্র নামের আরও  চার জন বেঁচে গেলেও তারা আর বেশিদিন বাঁচেননি। দুঃসহ সেই স্মৃতি বয়ে বেড়ানোর কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন সপেন্দ্র নাথ।

তিনি বলেন, এই গ্রামে কোন পুরুষই ছিল না। সবাইকে মেরে ফেলা হয়েছিল সেদিন। শুধু নারীরা আর তাদের কোলে থাকা শিশুরা বেঁচে ছিল। শ’শ’ নারী সেদিন বিধবা হওয়ায় শুকানপুকুরী গ্রামটিকে মানুষ ‘বিধবা পল্লী’ হিসেবে জানত বলেও তিনি জানান।

তিনি বলেন, গন্ডোগোলের সময়কার (মুক্তিযুদ্ধের) এই স্মৃতিকে ধরে রাখতে এখানে নাকি স্মৃতিসৌধ হবে, কই আজো তো এই কথার বাস্তবায়ন দেখলাম না। শুধু স্বাধীনতা দিবস আর বিজয় দিবস ছাড়া তাদের খোঁজ কেউ রাখে না বলে অভিমানের সুরে বলেন তিনি।

পাকিস্তানি সেনাদের হাতে স্বামী খুন হবার প্রত্যক্ষদর্শী ‘বিধবা পল্লী’র অন্তবালা জানান, আমিও সেদিন ছোট ছোট তিন মেয়ে, আর দুই ছেলে নিয়ে স্বামীর সঙ্গে ধাপঢুপ বিলের পাড়ে আম বাগানে আশ্রয় নিয়েছিলাম। চোখের সামনে আমার স্বামীকে ডেকে নিয়ে অন্যদের সঙ্গে হত্যা করে মিলিটারিরা। সারাজীবন অনেক কষ্ট করে তাদের মানুষ করেছি। তেমন কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পাইনি।

এমনিভাবে স্বামী হারানোর বেদনা আজো বয়ে বেড়াচ্ছেন ওই এলাকার সৌদামুনি, অনকছড়িসহ আরো শত শত বিধবা।

স্বাধীনতার ৪৬ বছর পেরিয়ে গেলেও এই নির্মম হত্যাযজ্ঞের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে নেয়া হয়নি কোনো পদক্ষেপ।

এ ব্যাপারে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ বোদা উপজেলা ইউনিট কমান্ডের কমান্ডার আবদুর রহমান জানান, ধাপঢুপ বধ্যভূমিতে স্থানীয় পর্যায়ে বিশেষ দিনগুলোতে পুস্পস্তবক অর্পণ করলে সেই সঙ্গে আলোচনার ব্যবস্থা করলে সঠিক ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা সম্ভব হবে। তবে সংস্কার করে ওই বধ্যভূমির ইতিহাস সবার কাছে তুলে ধরার দাবি জানান তিনি।

এলাকাবাসী ও শহীদ পরিবারদের স্বজনেরা অবিলম্বে সরকারিভাবে শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে সেখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ ও এইসব অসহায় সুবিধাবঞ্চিত শহীদ পরিবারগুলোকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়া হোক বলে জোর দাবি জানান।

(ঢাকাটাইমস/২৫মার্চ/প্রতিনিধি/এলএ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত