অভিযানে নিহতের চেয়ে বেশি ‘জঙ্গি’ ধরা পড়ছে জীবিত

আশিক আহমেদ, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ৩১ মার্চ ২০১৭, ১৪:১৫ | প্রকাশিত : ৩১ মার্চ ২০১৭, ০৮:২৭

সাম্প্রতিক জঙ্গিবিরোধী অভিযানে বিভিন্ন আস্তানায় সন্দেহভাজন জঙ্গিদের প্রায় সবাই নিহত হয়েছে। তাদেরকে কেন জীবিন ধরা হচ্ছে না-এই বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন রাজনৈতিক দলের নেতারা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারবিরোধীরা এই প্রশ্ন তুলে জঙ্গিবিরোধী অভিযানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছেন। তবে পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, যত সন্দেহভাজন জঙ্গি অভিযানে নিহত হয়েছে, ধরা পড়েছে তার চেয়ে বেশি। এমনকি যেসব আস্তানায় অভিযানে প্রাণহানি হয়, সেসব আস্তানা থেকেও জীবিত অবস্থায় আটক হওয়ার ঘটনা বিরল নয়।
পুলিশের হিসাবে গত জুলাই থেকে এখন পর্যন্ত জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নিহত হয়েছে মোট ৪৫ জন। আর দেড় বছরে র‌্যাবের হাতেই আটক হয়েছেন প্রায় ১০০ জন।

পুলিশ বলছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যারা জঙ্গিবিরোধী অভিযান নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, তারা কার্যত জঙ্গিদেরকে সমর্থন করছে। তারা নানা কথা বলে আসলে উগ্রপন্থীদের সুবিধা করে দিচ্ছে। এদের ওপরও নজরদারি চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশের জঙ্গিবিরোধী বিশেষ শাখা কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত উপকমিশনার সাইফুল ইসলাম ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য জঙ্গিদেরকে ধরা। আমরা চেষ্টা করি জীবিত ধরা পড়ার জন্য। কিন্তু পরিস্থিতি কখনও কখনও বাধ্য করে।’

সাম্প্রতিক অভিযানে নিহত বেশি, তবে ধরা পড়েছে জীবিতও

সবশেষ জঙ্গিবিরোধী অভিযানে গত বুধবার মৌলভীবাজারের দুটি এবং কুমিল্লায় একটি আস্তানায় অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।  এর একটি আস্তানায় আত্মঘাতী বিস্ফোরণে সাত থেকে আট জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে পুলিশ। এর আগে গত ২৪ মার্চ অভিযান চালানো হয় সিলেটের দক্ষিণ সুরমার শিববাড়ী এলাকার আতিয়া মহলে। এর মধ্যে আতিয়া মহলে সন্দেহভাজন চার জন এবং মৌলভীবাজারের একটি আস্তানায় সাত থেকে আট জন সন্দেহভাজন জঙ্গির মৃত্যুর খবর দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।  

১৬ মার্চ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে সন্দেহভাজন জঙ্গি আস্তানায় অভিযানে এক শিশুসহ সন্দেহভাজন চার জঙ্গি নিহত হয়। ১৭ মার্চ ঢাকার আশকোনায় র‌্যাবের নির্মাণাধীন সদরদপ্তরে আত্মঘাতী হামলায় একজন নিহত হয়। পরদিন খিলগাঁওয়ে র‌্যাবের তল্লাশি চৌকিতে আত্মঘাতী হামলা চেষ্টার সময় গুলিতে আরেক যুবকের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে বাহিনীটি। ২৪ মার্চ বিমানবন্দর মোড়ে বিস্ফোরণে এক তরুণের মৃত্যু হয়। তিনিও বোমা বহন করছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

এসব ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা প্রশ্ন ছড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে যে, কেন কাউকে জীবিত অবস্থায় ধরা যাচ্ছে না। বিএনপির পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছে একই ধরনের কথা।

তবে পুলিশ জানিয়েছে, যে প্রশ্ন ছড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে তা সত্য নয়। কারণ, যত না সন্দেহভাজন জঙ্গি নিহত হয়েছে, ধরা পড়েছে তার কয়েক গুণ বেশি।

পুলিশ জানায়, গত ১৫ মার্চ সীতাকুণ্ডেরই সন্দেজভাজন একটি জঙ্গি আস্তানা থেকে এক দম্পতি ধরা পড়েছেন জীবিত অবস্থাতেই। তার আগে ৬ মার্চ হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আবদুল হান্নানকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টায় তাকে বহনকারী প্রিজন ভ্যানে বোমা হামলার পর হাতেনাটে আটক হন মোস্তফা কামাল। এরপর তার কাছ থেকে তথ্য পেয়ে তার আরেক সহযোগী মিনহাজুল ইসলামকে আটক করা হয় নরসিংদীর একটি কওমি মাদ্রাসা থেকে।  পাবনাতেও একজনকে এবং রাজশাহীতে আরও তিন জনকে আটক করেছে পুলিশ।  গত বুধবার ঢাকার ধামরাই থেকেও আটক হয়েছে চার জন, যারা বিস্ফোরক তৈরির প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

২০১৬ সালের ২৮ জুলাই মিরপুরের কল্যাণপুরের যে আস্তানায় পুলিশের অভিযানে নয় জন নিহত হয়েছে, সেখান থেকেও একজনকে ধরা হয় জীবিত অবস্থায়। একই বছরের সেপ্টেম্বরে ঢাকার আজিমপুর আস্তানায় অভিযানে আহত অবস্থায় আটক হন সন্দেহভাজন তিন জঙ্গি। আবার গত ডিসেম্বরের শেষে রাজধানীর আশকোনায় যে আস্তানায় আত্মঘাতী বিস্ফোরণে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে, সেখানেও পুলিশের কাছে ধরা দেন দুই জন।

গত আগস্টে আশকোনার বসুন্ধরারটেক এলাকা থেকে নব্য জেএমবির শীর্ষস্থানীয় নেতা সারোয়ার জাহানকেও র‌্যাব আহত অবস্থায় আটক করেছিল। কিন্তু তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

আর্টিজান হামলার ‘মূল হোতা’দের তিনজন আটক

২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার ঘটনায় যাদের নাম এসেছে তাদের মধ্যে তামিম চৌধুরী, নুরুল ইসলাম মারজান ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলামকে জীবিত অবস্থায় ধরতে পারেনি পুলিশ। তবে তদন্তে নাম আসা তিন শীর্ষস্থানীয় জঙ্গি ধরা পড়েছেন। এদের মধ্যে পুলিশ যাকে হামলাকারীদের আধ্যাত্মিক গুরু বলছে, সেই আবুল কাসেমকে পুলিশ আটক করে গত ৪ মার্চ।

এই হামলায় সন্দেহভাজন মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজানকে পুলিশ আটক করে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। গত সোমবার তিনি ঢাকার একটি আদালতে আর্টিজান হামলায় নিজের দায় স্বীকার করে জবানবন্দিও দেন।

আর্টিজান হামলায় আরেক নাটের গুরু হিসেবে চিহ্নিত জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধীও আটক হয়েছেন পুলিশের হাতে। তাকে ধরা হয় গত ১৫ জানুয়ারি। তিনি আর্টিজান বেকারিতে হামলা এবং এক সপ্তাহ পর কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতের পাশে পুলিশের ওপর হামলায় নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন।

চার বছরে গ্রেপ্তার আড়াই শতাধিক

পুলিশের হিসাবে গত চার বছরে প্রায় আড়াইশ সন্দেহভাজন জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করেছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এদের বিরুদ্ধে করা ৬১ টি মামলায় কমপক্ষে তিনটি মামলার বিচার শেষ হয়েছে। এদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গোলাবারুদ, বোমা ও বোমা তৈরির সরঞ্জামও উদ্ধার করা হয়েছে।

এর মধ্যে গত দেড় বছরে র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছে ৯৯ জন সন্দেহভাজন জঙ্গি। বাকিরা গ্রেপ্তার হয়েছে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার হাতে।   
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, ২০১৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে আজ পর্যন্ত ৬১ টি মামলায় ২৪৩ জন সন্দেহভাজন জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করেছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। ৬১ টি মামলার মধ্যে ইতোমধ্যে তিনটি মামলার বিচার শেষ হয়েছে। ১৪ টি মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারায় একটি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। আর এখন পর্যন্ত জঙ্গি সম্পৃক্ত ৩৮ টি মামলা তদন্ত শেষ করতে পারেনি পুলিশ।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য মতে, ৮৭ জন সন্দেহভাজন জঙ্গি আদালতে নিজেদের সম্পৃক্ততা থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দী দিয়েছেন।

র‌্যাব জানায়, ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত জীবিত অবস্থায় ৬৩ জন জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এবং ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আজ ৩০ মার্চ পর্যন্ত ৩৬ জন জঙ্গিদেরকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।

যেসব জঙ্গিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা এখন দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দী রয়েছে বলে জানায় র‌্যাব।

২০১৬ সালের ৩ নভেম্বর সেলিম মিয়া, আবু তাহের, মিজানুর রহমান ও তৌফিকুল ইসলাম ওরফে ডা. তৌফিক নামের চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের জঙ্গি বিরোধী বিশেষ শাখা কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট। এরা হলি আর্টিজান বেকারির হামলায় ঘটনায় অস্ত্র সরবরাহ করেছিল বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে।

গত বছরের ৪ জুলাই টাঙ্গাইলের কালিহাতী এলাকা থেকে চার সন্দেহভাজন নারী জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের কাছে তারা স্বীকার করেছিল, এরা নিষিদ্ধ জঙ্গি সংঘঠন জেএমবির সক্রিয় সদস্য।

গত বছরের ২৪ জুলাই সিরাজগঞ্জের মাছুমপুর মহল্লার উত্তর পাড়ার হুকুম আলীর বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয় চার সন্দেহভাজন নারী জঙ্গিকে, ২৪ এপ্রিল বরিশাল থেকে ২১ সন্দেহভাজন নারী জঙ্গিদেরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ, ভারতের বর্ধমান বিস্ফোরণের ঘটনার মূল সন্দেহভাজন জেএমবির রাজনৈতিক শাখার প্রধান কমান্ডার শেখ রহমাতুল্লাহ ওরফে সাজিদের স্ত্রী ফাতেমা আক্তারসহ চার মহিলা জঙ্গি সদস্যকেও গ্রেপ্তার করা হয়।

গত বছরের ১৭ আগস্ট রাজধানী ঢাকা ও গাজীপুরে অভিযান চালিয়ে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) চার নারী জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। জেএমবির নারী শাখার এই চার সদস্যদের  মধ্যে একজন ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) শিক্ষানবিশ চিকিৎসক ও বাকি তিনজন মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী।

জানতে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) সহেলী ফেরদৌস বলেন, ‘বিভিন্ন ধরনের ইসলামী আইডোলজি থেকে মানুষ জঙ্গিবাদের জড়িয়ে পড়ছে, এরমধ্যে তথ্য প্রযুক্তির সহজলভ্যতা, পরিচয় গোপন করে যোগাযোগ স্থাপন সহ নানা বিষয় রয়েছে। আর নারীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের পরিবার থেকেই রেডিকালাইজড হয়ে থাকে। এদের মধ্যে কেউ বাবা-মার কাছ থেকে আবার কেউ স্বামীর কাছ থেকে।’

ঢাকাটাইমস/৩১মার্চ/এএ/ডব্লিউবি

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত