ঢাবির হলে বড় যন্ত্রণা ছোট ছারপোকা

এন এইচ সাজ্জাদ, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ১১ এপ্রিল ২০১৭, ০৮:০৫

ছোট্ট প্রাণী, কাঠের আসবারের কোনায় কোনায় বাস তাদের। এমনিতে তেমন একটা চোখে পড়ে না। বিছানায় গা এলিয়ে দেয়া মাত্র রক্ত শুষে নেয়া শুরু করে। আর এদের কামড়ে গায়ে তৈরি হয় জ্বলুনি। সারা গায়ে কামড়ের জ্বালায় ঘুমানো কঠিন হয়ে পড়ে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ করে ছেলেদের হলে ছারপোকার এই সমস্যা আরও বেশি। পরিস্থিতি এমন যে, ক্লাসে গিয়ে কাপড়ে টান দিলেও গা থেকে ঝরে পড়ে ছারপোকা। আসবাব ছাড়িয়ে ব্যাগেও ঢুকে যায় পোকাটি।

কয়েক বছর ধরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ছাত্ররা এ পোকার যন্ত্রণায় অস্থির। কীভাবে এ থেকে মুক্তি মিলবে সে কথা বলাবলি হচ্ছে ক্যাম্পাসে। নানা সময় নানা ধরনের ওষুধ মিশিয়ে স্প্রে করা বা চৌকিতে পোকা মারতে নিয়ন্ত্রিত আগুন ধরিয়ে চেষ্টা হয়েছে দুর্ভোগ লাঘবের। কিন্তু কদিন যেতে না যেতেই আগের অবস্থায় ফিরে আসে সব।

ঢাবির আবাসিক ছাত্রদের হাজারো সমস্যার মধ্যে এই ছোট ছারপোকা দেখা দিয়েছে যন্ত্রণার বড় কারণ হিসেবে।

ভুক্তভোগী ছাত্ররা বলছেন, রাতে এই পোকার কামড়ে ঘুমানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বারবার জানানো হলেও হল কর্তৃপক্ষ ছারপোকা নিধনে কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

ছারপোকার জন্ম হয় স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশ আর অপরিচ্ছন্নতার কারণে। বহু বছর পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর ভেতরের পরিবেশ এই পোকার জন্য আদর্শ হয়ে উঠেছে। আর ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি ছাত্র থাকে বলে হলে স্বাভাবিক পরিচ্ছন্নতারও অভাব রয়েছে।

এর ওপর আছে ছারপোকা নিধনে ওষুধ না ছিঁটানো ও যত্রতত্র ময়লা স্তূপ করে রাখার সমস্য। শিক্ষার্থীরা জানান, এসব ব্যাপারে প্রশাসনের উদাসীনতায় সমস্যাটি দিন দিন বাড়ছে। যার ফলে শিক্ষার্থীদের জীবনে নেমে এসেছে এক দুর্যোগ যন্ত্রণা।

ছারপোকার কারণে অতিষ্ঠ কোনো কোনো শিক্ষার্থী রাত কাটাচ্ছেন হলের মসজিদে, খাবারের ক্যান্টিনে বা রিডিংরুমে। কেউ বা থাকছেন জেগে। সারা রাত ঘুম না ঘুমিয়ে, ক্লাসে ঘুমাচ্ছেন সকালে। যার ফলে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার  অবনতি হচ্ছে। ছাত্রদের শারীরিক অবনতির হচ্ছে।

ইন্টারনেটে বিভিন্ন পেজ ঘেঁটে দেখা যায়, ছারপোকার কামড়ের সাথে সাথে নানা রোগ জীবাণু দেহে ঢুকে। ফলে শিক্ষার্থীদের বাতজ্বর, শরীরে ঘা সৃষ্টিসহ নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

হাজী মোহাম্মদ মহসীন হলের ছাত্র রুহুল কুদ্দুস ঢাকাটাইমসকে জানান, ‘শনিবার রাত তিনটার আগ পর্যন্ত তিনি ঘুমাতে পারেননি ছারপোকার যন্ত্রণায়। এরপর  এক সময় চোখ বুঁজে আসে।’ তিনি বলেন, ‘সকালে ঘুম থেকে উঠলেই গায়ে লাল দাগের মত দেখা যায়।’

মাহবুবুল আলম নামে একই হলের আরেক শিক্ষার্থী ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘ক্লাসে গিয়েও ছারপোকা থেকে মুক্তি মেলে না। ব্যাগের ভেতর থেকে বের হয়ে আসে পোকা। পোশাকেরর ভাঁজে ভাঁজে তো বটেই গায়েও লেগে থাকে কিছু।’    

এস এম হলের দ্বিতীয় বর্ষের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ইফতেখার হোসেন চৌধুরী ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘সাধারণত  রাতের বেলায় ছারপোকার উপদ্রব বাড়ে। এই উপদ্রবের কারণে আমরা রাতে ঘুমাতে পারি না, ফলে প্রায়ই সকালের ক্লাসে অনুপস্থিত থাকি। যার কারণে আমাদের একাডেমিক ফলাফল প্রত্যাশিত হচ্ছে না।’

ইফতেখার বলেন, ‘ছারপোকার কামড়ে শরীরে নানা ধরনের জীবাণু প্রবেশ করে, যার ফলে চুলকানির সমস্যা দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে আবাসিক শিক্ষার্থীর মধ্যে।’

এস এম হলের এই শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা এই ছারপোকা নিধনের জন্য নানা চেষ্টা করেও নিস্তার পাইনি। কিন্ত হলে ছারপোকা নিধনের জন্য প্রশাসন কোনো কার্যকার ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না।’

আবাসিক শিক্ষার্থী রায়হান বলেন, ‘গরমের দিনে গাদাগাদি করে বারান্দায় ও গণরুমে থাকা এমনিতেই কষ্টকর। তারওপর আবার ছারপোকার উপদ্রব। দুইয়ে মিলে নাকাল হচ্ছে ছাত্রদের জীবন।’

রায়হান জানান, বিছানায় মশারি দিলে মশা থেকে রেহায় পাওয়া যায়। কিন্তু ছারপোকার প্রকোপ আরও বাড়ে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলেদের ১৪টি এবং মেয়েদের পাঁচটি হলের প্রায় প্রতিটিতেই একই ধরনের সমস্যা হয়েছে। প্রতিটি হলেই ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি শিক্ষার্থী থাকে। প্রায় প্রতিটি কক্ষেই এক জনের শয্যায় দুইজনের বসবাস এক সাধারণ চিত্র। এতেও আবাসিক সংকট না মেটায় গণরুমে আরও বেশি গাঁদাগাঁদি করে থাকতে বাধ্য হচ্ছে চাত্ররা। ইদানীং তাদের অবস্থান হয়েছে বারান্দাতেও।

শিক্ষার্থীদের বিছানা, ব্যাগ, শীতবস্ত্র এবং বইপত্রে থাকে গাদাগাদি অবস্থা। আর এসবের ফাঁকে আবাস গড়েছে।

শিক্ষার্থীরা জানান, যে কক্ষে আট থেকে ১০ জন ছেলের থাকার কথা, সেই কক্ষে ৫০ থেকে ৬০ জনকে একসঙ্গে রাখা হচ্ছে। যার কারণে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা কঠিন।

সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মাহাবুবুল আলম জোয়ার্দার ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আমরা সবসময় চাই ছাত্ররা যাতে ভালো থাকুক। এজন্য ছাত্ররা যখনই সমস্যার কথা বলেছে তৎক্ষণাৎ সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করেছি।’  ছারপোকার নিধনে এখন থেকে নিয়মিত ওষুধ ছিটানো হবে এবং হলের অন্যান্য সমস্যা সমাধানেও দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন বলে ঢাকাটাইমসকে জানান হল প্রাধ্যক্ষ।

কবি জসীম উদ্দিন হলের আরেক শিক্ষার্থী সালমান সামি ঢাকাটাইমসকে জানান, সাধারণত দিনের বেলায় এদের তেমন দেখা যায় না, কিন্তু ঘুমানোর আগে রাতে লাইট নেভানোর সাথে সাথে ছারপোকার উপদ্রব বাড়ে। যার ফলে রাতে আমরা ঘুমাতে পারি না।  সারারাত জেগে জেগে ছারপোকর সাথে যুদ্ধ করি। আর সকালে ঘুমাই।

সামি  জানান, ছারপোকার কামড়ে শরীরের বিভিন্ন অংশ ফুলে লাল হয়ে যায় এবং এর থেকে চুলকানির সৃষ্টি হয়।

কবি জসীম উদ্দিন হলের আবাসিক শিক্ষক মামুন আল মোস্তাফা ঢাকাটাইমসকে জানান, ছারপোকার সমস্যাটি কিছুদিন পর পর বেড়ে যায়, সাধারণত গরমের দিনে সমস্যাটি ব্যাপক আকার ধারণ করে। তবে এই সমস্যাটি সমাধানের জন্য হল কর্তৃপক্ষ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে জানান তিনি।

সম্প্রতি ছারপোকা নিধনের জন্য জসীম উদ্দিন হলে আবাসিক শিক্ষকের সম্বনয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে হয়েছে বলেও জানান তিনি।

কুয়েত মৈত্রী হলের ছাত্রী নাসরিন  জানান, তাদের হলে ছারপোকার প্রকোপ নেই। কারণ তারা সবসময় হলকে পরিষ্কার রাখেন, যার ফলে ছারপোকা বংশ বিস্তার করতে পারে না। নাসরিন জানান, তিনি এখন পর্যন্ত তার রুমে কোনো ছারপোকা দেখতে পাননি।

(ঢাকাটাইমস/১১এপ্রিল/প্রতিনিধি/ডব্লিউবি/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত