বাংলা একাডেমিতে বাহারি পণ্যের বৈশাখী মেলা

লেখা ও ছবি: শেখা সাইফ
| আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০১৭, ১৬:৩৩ | প্রকাশিত : ২০ এপ্রিল ২০১৭, ১৫:৩১

বাংলা একাডেমির প্রধান ফটক পেরুতেই কানে ভেসে এলো  'তোমরা কুঞ্জ সাজাও গো/আজ আমার প্রাণনাথ আসিতে পারে/বসন্ত সময়ে কোকিল ডাকে কুহু সুরে/যৌবন বসন্তে মন থাকতে চায়না ঘরে/তোমরা কুঞ্জ সাজাও গো আজ আমার প্রাণনাথ আসিতে পারে...'

বাঙালির প্রাণের বৈশাখী মেলা বসেছে রাজধানী ঢাকার বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) এবং বাংলা একাডেমির যৌথ আয়োজনে বসেছে এ মেলা। বাঁশি আর ঢোলে মুখরিত মেলার চারিদিক। রঙ-বেরঙের জিনিসপত্র নিয়ে বসেছে মেলার দোকান পাট। ঢুকতেই চোখে পড়লো একতারা, দোতারা, ঢোল, বাঁশি, কুলা, পাখাসহ বাঁশ বেতের নানা শৈল্পিক কারুকার্য খচিত শিল্পকর্মের পসরা। কেউ বাঁশি বাজিয়ে দেখছেন। কেউ ঢোল আর একতারা বাজিয়ে দেখছেন। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের বায়নাটা যেন এখানে বেশি।

পাশের দোকানে মাটির তৈরি বাহারি সব জিনিসপত্র। ছোট ছোট রঙিন হাড়ি-পাতিল, থালা-বাসন, ফুলের টব, পুতুল, কলস, হাতি-ঘোড়া, ইত্যাদি। এক একটি এক এক রঙ্গের-ঢঙ্গের, আকার আকৃতির। ছোট ছোট বাচ্চারা সেসব খেলনা সামগ্রীর বায়না ধরছে। আর বাবা মায়েরাও কিনে দিচ্ছেন আনন্দচিত্তে।

সামনে এগোতে এগোতে দেখা মিললো পাটের তৈরি পুতুল, ঘর সাজানো জিনিসপত্র, মাদুর, কার্পেট, ব্যাগ, সোপিচ, সিকা, ফুলদানি ও বিভিন্ন হস্তকর্ম। লোক সমাগমে কাছে ভেড়ায় দায়। সবাই দেখছেন, কিনছেন।

পাশেই মিষ্টির বিশাল সমাহার। বড় বড় থালা-ঝুড়িতে হরেক রকমের মিষ্টি। দেখে মনে হলো সেই ছোটবেলায় গ্রাম্য মেলার মিষ্টি মিঠায়। কয়েকটির নাম ময়রা মুদির কাছ থেকে। তারমধ্যে আছে, মনাকা, কটকটি, মুরুলি, নিমকি, আমিত্তি, দানাদার, লাড্ডু, গুড় বাতাসা, নকুল, চিনি বাতাসা, কদমা, তিলা, বিন্নি খই, খামার ধানের খই, উপড়া বিন্নি, মুড়ি-মুড়কি, হাতি-ঘোড়া মিষ্টি, চিনি সাচের মিষ্টি। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের লাঙ্গল বন্দর থেকে মেলাতে তারা অংশগ্রহণ করেছেন।

মেলা ঘুরতে ঘুরতে চোখে পড়ল বটতলায় বসেছে বাঁশ-বেতের জিনিসপত্র তৈরির কারখানা। এখানে বসে কেউ পাখা তৈরি করছেন। কেউবা আবার কুলা, চালুনি, চাঙ্গারি, ধামা, ঝুড়ি, ফেতে, চোঙ্গা। কিছু রঙ লাগানো নকশি করা। আর কিছু রঙ ছাড়া। আছে ঝাড়ু, লাঠি, সিকা, হাতপাখা, নকশী পাখা, ময়ূরী পাখা, ঢাকনা, ঝাপি, সরপোষ প্রভৃতি। অনেকেই নিজেদের প্রয়োজনে কিনে নিচ্ছেন।

কুষ্টিয়া থেকে এসেছেন অনেক শিল্পী। কেউ সোলার কাজ করেন, কেউ বেতের, বাঁশের বা কাঠের। নান্দনিক সব কারুকার্য খচিত সে সব জিনিসপত্র। সোলার ভেতর রয়েছে তাজমহল, গরুগাড়ি, পাখি, পাখা, হাতি, নৌকা-মাঝি ইত্যাদি। কাঠের তৈরি বিভিন্ন আকৃতির শো-পিচ ফ্রেম, কর্নার শো, বিভিন্ন জীবন-চারণ ইত্যাদি। পাশেই এক নারী তৈরি করছেন বাঁশের চিকন শলা দিয়ে কিছু একটা। জিজ্ঞেস করায় জানালেন, এটা একটা ছোট ঝুড়ি তৈরি করছি। বেচাবিক্রি কেমন হচ্ছে জিজ্ঞাসায় জানালেন, 'একবারেই কম। সকাল ৯টায় খুলে দেয়া হলেও ১০টায় লোক আসতে শুরু করে। আবার ৮টা পর্যন্ত মেলা চলার কথা থাকলেও ৭টার পর কাউকে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। আবার চেক করে করে ঢোকাচ্ছে। অনেকেই আসছে না এমন কঠিন হওয়ার কারণে। গত বছরও এসেছিলাম। তখন অনেক লোকসমাগম ছিল। অনেক বিক্রিও হয়েছে। কিন্তু এবার একদম নেই বললেই চলে।'

পাশেই নকশী কাঁথা বুনছিলেন হোসনেআরা বেগম। তিনি বলেন, ঢাকা শহরে মানুষ সবাই কর্মব্যস্ত। তারা স্কুল, কলেজ, অফিস আদালত শেষ করে সন্ধ্যার দিকে আসবে। কিন্তু এখানে তার উপায় নেই। ৭টা বাজলেই সবাইকে বের করে দেয়া হচ্ছে।'

হোসনেআরা নকশি কাঁথা নিয়ে বলেন, 'আমি ৩০ বছর ধরে এই কাম করছি। সোনারগাঁও জাদুর ঘর থেকে ৮২ সালে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম। ৬০ জনের মতো ছিলাম সবাই বাদ দিয়া দিছে। আমি একাই এই কাজ চালাইয়া যায়তাছি। একটা শাড়ি তৈরি করতে আমার ১৫ দিন লাগে। তয় বেশি ডিজাইনের হলে একমাসও লেগে যায়। নিজেই কাঁথায় ছবি আঁকি আর সেলাই করি। এই দিয়েই আমার সংসার চলে। আমার স্বামী পঙ্গু হয়ে বইসা আছে। তয় আমি অনেক পুরস্কার পাইছি। টাকা, সার্টিফিকেট, ক্রেস্ট পাইছি।'

বসেছে শীতল পাটি, কাঁসা-পিতলের তৈজসপত্র, গহনা, মাটির গহনা, তাঁতকর্ম ইত্যাদি। শোলা দিয়ে কারিগর নিপুণ হাতে কেটে কেটে তৈরি করছেন দৃষ্টিনন্দন সব শিল্পকর্ম। এসব জিনিস পত্রের দাম ১০০ টাকা থেকে শুরু করে ছয় হাজার টাকা পর্যন্ত রয়েছে।

এছাড়া মেলাতে বসেছে বগুড়ার বিখ্যাত দই, যশোরের খেজুর গুড়, কুষ্টিয়ার তিলের খাজা, বাদাম পাটালি, রসমুণ্ডী, জিলাপি, বুন্দিয়া, বিভিন্ন প্রজাতের মধু, আচার। আর পোশাকের ভেতর আছে, হাতে কাজ করা থ্রি পিচ, টু পিচ, শাড়ি, ছেলেমেয়েদের পোশাক, গেঞ্জি, জুতা স্যান্ডেল, ছাতা ইত্যাদি। আর বিভিন্ন খাবের দোকান তো আছেই।

মেলা মানেই নাগর দোলায় চড়া। হ্যাঁ, সেই নাগর দোলায় চড়ে আনন্দ করছে মেলায় আগত দর্শনার্থী। ছোট বড় সবাই চড়ছেন, আর বিকট হলেও চিরচেনা প্রিয় একটা শব্দ ছড়িয়ে পড়ছে ঘোরার সময়। অনেকে পাশে এসে সেলফি তুলছেন। পাশেই আছে চরকি। ঘোড়ার চরকি।

পুতুল নাচের কথা কারো অজানা নয়। বাংলা একাডেমির সবুজ চত্বরে বর্ধমান হাউস এবং পুকুরের মাঝখানে টিন আর শামিয়ানা দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিশাল ঘর। সেখান থেকে ভেসে আসছিল গানের সুর। গানের ফাঁকে ফাঁকে সংলাপ। ৩০ টাকায় টিকিট কেটে সেই ঘরের ভেতরে যাচ্ছে অনেকে। ঐতিহ্যবাহী পুতুলনাচ হচ্ছে সেখানে। শিশুদের পাশাপাশি বড়রাও প্রবেশ করছেন। পুতুলনাচের এই অস্থায়ী প্রদর্শনীকক্ষের পাশেই রয়েছে নাগরদোলা, চরকি। আর সেখান থেকেই প্রাণের বাঙালি গান বেজেই চলেছে। কখনো বাজছে 'আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম/আমরা আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম/গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান/মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদি গাইতাম/হিন্দু বাড়িতে যাত্রা গান হইত/নিমন্ত্রণ দিত আমরা যাইতাম/জারি গান, বাউল গান/আনন্দের তুফান/গাইয়া সারি গান নৌকা দৌড়াইতাম।’

হঠ্যাৎ শুনতে পেলাম কেউ একজন ছড়া কেটে সুরে তালে বলে যাচ্ছে 'ওরে আয় আয়, একাত্তরের যুদ্ধ যায়, শেখ মুজিবের ভাষণ হয় দেখতে কত মজা পায়, আরো আছে সুন্দর বনের বাঘ ভাল্লুক, তারপর পাহাড় বর্বত, হাজি সাহেব হজে যায়, মক্কা মদিনা দেখা যায়......' ২০ টাকা টিকিট কেটে অনেকেই সেই ছোটবেলার বায়স্কোপ দেখছে। আমি নিজেও ২৫ পয়সা দিয়ে ছোট বেলায় গ্রামে দেখেছি। সত্যিই এটি এখনো আমাদের চিত্তকে নাড়া দেয়।

আবার শোনা যাচ্ছে মাইকে বাজছে, বন্ধে মায়া লাগাইছে/পিরিতি শিখাইছে/দেওয়ানা বানাইছে/কী যাদু করিয়া বন্ধে/মায়া লাগাইছে/বসে ভাবি নিরালায়/আগেতো জানিনা বন্ধের পিরিতের জালায়/যেমন ইটের ভাটায় কয়লা দিয়া আগুন জালাইছে...

'আমার ঘুম ভাঙাইয়া গেল গো মরার কোকিলে/আমায় উদাসী বানাইয়া গেল বসন্তেরই কালে গো। (মরার কোকিলে) আমার ঘুম ভাঙাইয়া... মন বোঝে না মরার কোকিল আন্দাজই গান তোলে/ ফাগুনেরই আগুন দিয়া মারে তিলে তিলে ... ছাতু ছোলা খায় না কোকিল আদর কইরা দিলে গো/ (মরার কোকিলে)...'। এভাবে প্রতিদিন মানুষ প্রাণের মেলা বৈশাখী মেলাতে আসছেন। আনন্দ উল্লাস করছেন। কিনছেন পছন্দের পণ্য। তবে ক্ষোভ ও প্রকাশ করছেন অনেকে মেলার সময় নিয়ে। সবার কথা রাত ৯টা পর্যন্ত যদি মানুষের আসতে দেয়া হতো তাহলে বেচাবিক্রি অনেক ভালো হতো।

গত ১৪ এপ্রিল শুরু হওয়া এই মেলা চলবে ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত।

(ঢাকাটাইমস/২০এপ্রিল/এসএস/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজধানী বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত