লুকোচুরি গল্প-২

পর্দার প্রেম, বাস্তবের ভালোবাসা এবং সংসার

তায়েব মিল্লাত হোসেন
 | প্রকাশিত : ২১ এপ্রিল ২০১৭, ০৯:০০

বিয়ের নয়টি বছর পর, মা হওয়ার সাত মাস পর পারিবারিক গণ্ডির বাইরে এসে স্ত্রী হিসেবে, মা হিসেবে প্রকাশ্যে মর্যাদা পেয়েছেন চিত্রনায়িকা অপু বিশ্বাস। বিয়ে যখন হয়েছে, তা গোপন রেখে তাকে বাস্তবের স্বামী শাকিব খানের সঙ্গে সিনেমার প্রেমিকা হিসেবে, স্ত্রী হিসেবে দীর্ঘদিন বড়পর্দায় আসতে হয়েছে। তাদের দর্শক দারুণভাবে গ্রহণও করেছে। তারা দেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম সেরা জুটি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। বাস্তবে জুড়ি হিসেবে তারা যখন দেশজোড়া গ্রহণযোগ্যতা পেলেন, তখন তাদের পর্দায় নতুন করে পাওয়ার সম্ভাবনা ফিকে হয়ে গেল।

কারণ শাকিব খান একদিকে স্ত্রী অপুকে আর সিনেমায় দেখতে চাইছেন না। অন্যদিকে তিনি মনে করছেন, জুটি হিসেবে এখন দর্শক তাদের গ্রহণ করবে না। ‘স্বামী-স্ত্রীর সিনেমা জুটি হিসেবে দর্শকেরা গ্রহণ করতে চান না।’ একটি গণমাধ্যমে এই ভাষ্য শাকিবের।

পৃথিবীজোড়াই নায়ক-নায়িকার প্রেম হয়। বিয়ে হয়। ঘর হয়। সংসার হয়। তারা কী পর্দার রসায়ন আর জমাতে পারেন না? দর্শকও কী তাদের আর গ্রহণ করেন না? আমাদের দেশের অবস্থা এক্ষেত্রে আসলে কী?

এর জন্যে কিছু জুটির কথা জানতে হবে আমাদের। ঢাকাই চলচ্চিত্রে নতুন ধারা নিয়ে হাজির হয়েছিলেন শাবনাজ-নাঈম। তারা জুটি হিসেবে বেশকিছু সুপারহিট ছবি উপহার দেন। পরে বাস্তব জীবনেও সম্পর্কে জড়ান। বিয়ে করে সংসার পাতেন। সংসারের সুখ ধরে রাখতে দুজনেই আগেভাগে চলচ্চিত্র থেকে বিদায় নেন।

ঢালিউডের আরেক সফল জুটি ওমর সানী ও মৌসুমী। তারাও অনেক সুপারহিট ছবি উপহার দিয়েছেন। বাস্তব জীবনে তারাও জুটি গড়েন। দুই দশকের বেশি সময় সংসার করছেন। সন্তানদের নিয়ে সুখে আছেন। দুজনে চলচ্চিত্রেও ব্যস্ত আছেন।

তবে পর্দার জুটিরা বাস্তব সম্পর্ক সহজে প্রকাশ্যে আনেন না। বিয়ে করে কিছুদিন হয়তো গোপন রাখেন। কিন্তু সন্তান নিয়ে খুব একটা লুকোছাপা করেন না। শাকিব-অপুর বেলার বিষয়টি কিছুটা মাত্রা ছাড়িয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সবাই জেনেছে এটাই ইতিবাচক দিক।

গোপনীয়তার কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারী তারকাদের ঠকতে হয়। ছাড় দিতে হয়। অপু লাইভে আসার পর তাই ছোটপর্দা ও বড়পর্দার একসময়ের জনপ্রিয় নায়িকা ইপ্সিতা শবনম শ্রাবন্তী ফেসবুকে এক বার্তায় লিখেছেন, ‘অপু বিশ্বাসের মতো আরও কিছু অ্যাকট্রেস (অভিনেত্রী) আছে, সবাই যদি এভাবে অপুর মতো মুখটা খুলতে পারত। শয়তানগুলোর একটা হিসাব হতো। আহা...প্রেম! কিসের যে বাধা, এটা কেউ জানি না আমরা। কিন্তু যেটা ন্যায়, সেটাই যেন হয়। কারো সঙ্গে অন্যায় যেন না হয়।’

নারী, পুরুষ যে-ই হোক তারকাদের সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। কারণ বেখেয়ালি সম্পর্কের কারণে কারো কারো ক্যারিয়ারই শেষ হয়ে যায়।

ক্রিকেটের গতি-তারকা রুবেল আর উঠতি নায়িকা হ্যাপির সম্পর্ক যেভাবে শেষ হয়েছিল, এটা যাতে না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তাদের সম্পর্ক, ভাঙন- এসব শেষ পর্যন্ত মোকদ্দমা পর্যন্ত গড়িয়েছিল। এর জের ধরে শেষ পর্যন্ত দেখা গেল হ্যাপি রূপালি পর্দার জগৎ ছেড়ে ধর্মকর্মে মন দিয়েছেন। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা অবশ্যই তার আছে।

নায়িকার সঙ্গে সম্পর্ক জটিলতার কারণে কোনো কোনো নায়কের ক্যারিয়ারও অকালেই শেষ হয়ে গেছে। ঢাকাই সিনেমার একসময়ের আলোচিত জুটি ছিল শাকিল-পপি। এই জুটি একে একে অনেক ব্যবসাসফল ছবি উপহার দিয়েছে। সেই সময় থেকেই তাদের সম্পর্ক নিয়ে অনেক গুজব তৈরি হয়। এই সফল জুটি এক সময় প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে বলে কথা উঠে। তাদের নিয়ে সিনেপাড়ায় তখন অনেক কানাঘুষা ছিল। একপর্যায়ে গুজব ওঠে শাকিল-পপি গোপনে বিয়েও করেছেন। এই সব গুজব গুঞ্জনের কারণে একসময় সিনেমার জগৎ থেকে ছিটকে পড়েন শাকিল খান।

একটা বিষয় কিন্তু দেখা যায়। প্রেম-বিয়ে-সংসার-সন্তান নিয়ে নারী তারকাদের বেশি গোপনীয়তার আশ্রয় নিতে হয়। দেড় দশক আগের এক ঘটনার কথা বলি। হত্যার শিকার হন তারকা মডেল ও অভিনেত্রী সৈয়দা তানিয়া মাহবুব তিন্নি। তিনি সন্তান-সংসারের কথা অনেকটা গোপন রেখেই বিনোদন জগতে কাজ করছিলেন।

কারণ নির্মাতা-প্রযোজকরা বিবাহিতদের অনেক ক্ষেত্রেই গ্রহণ করতে চান না। আবার বিয়ে করে ফেললে দর্শকগ্রহণযোগ্যতা কমে যেতে পারে এই শঙ্কাও নাকি থাকে নায়ক-নায়িকার মধ্যে। দেশের অনেক নির্মাতা ও প্রযোজকের মধ্যে এই মানসিকতা আছে। ঢালিউডের অন্যতম শীর্ষ নায়িকা শাবনূরও তাই বিয়ের বিষয়টি সহজে প্রকাশ করেননি।

শাকিব-অপুর বিয়ে-সন্তানের গোপনীয়তার জন্য এটাই নাকি অন্যতম এক কারণ। বিয়ে করলে, বাবা-মা হলে জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ার শঙ্কা থাকে? এমন প্রশ্নে চলচ্চিত্র গবেষক ও লেখক অনুপম হায়াৎ আমাকে বলেন, ‘এটা একেবারেই ভুল ধারণা। রাজ্জাক স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সংসার করছেন অনেক বছর ধরে। তিনি বিবাহিত অবস্থায় নায়ক হিসেবে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ছিলেন। আজিম-সুজাতা জুটি প্রেম করেছেন, বিয়ে করেছেন, তারপরও তাদের ছবি হিট হয়েছে। শাবানা নায়িকা হিসেবে সেরা অবস্থানে যখন ছিলেন, তখন তিনি বিবাহিত। ওয়াহিদ সাদিকের সঙ্গে তার সংসার করতে কোনো সমস্যা তখন হয়নি। তারা এখনো একটি সুখী পরিবার। তাই বিয়ে-সন্তান চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারের জন্য কোনো বাধা নয়।’

পর্দার প্রেম বাস্তবে গড়ালে পরিণয় হওয়ার বিষয়টি ইতিবাচক। পরে তারা আবার রূপালি পর্দায় প্রেম করলে দর্শক নাখোশ হতে পারে, এই অনুসিদ্ধান্ত আসলে চূড়ান্ত কিছু নয়। শাকিব-অপু জুটির ভক্তদের জন্য এটাই আশার কথা। সুপারস্টার শাকিব খান শেষ পর্যন্ত কী করেন, সেটাই দেখার বিষয়।

ঢাকাটাইমস/২১এপ্রিল/টিএমএইচ

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিনোদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত