চালের দামে ‘চালবাজি’

মোসাদ্দেক বশির, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ২৪ এপ্রিল ২০১৭, ০৮:০৭

বোরো উঠার আগে আগে সব ধরনের চালের দামে হঠাৎ উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। দুই সপ্তাহের ব্যবধানেই কেজিতে দাম বেড়েছে তিন থেকে পাঁচ টাকা। আর এক মাসে দামে পার্থক্য হয়েছে পাঁচ থেকে সাত টাকা।

বছর জুড়ে ধানের বাম্পার ফলনে দাম পড়ে যাওয়ায় কৃষকের দুর্গতির খবর এসেছে গণমাধ্যমে। অথচ চালের দামে উল্টো চিত্র। ধানের নামের সঙ্গে সামঞ্জস্য নেই চালের দামের।

গত বছর ২৩ টাকা দরে ধান এবং ৩২ টাকা দরে চাল ক্রয় করে সরকার। তবে বছর জুড়ে আলোচনা ছিল ধানের কম দাম। সরকার ৯২০ টাকা দর বেধে দিলেও কৃষক মৌসুমের শুরুতে বেচতে বাধ্য হয়েছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মণ দরে। পরে কিছুটা বাড়লেও তা ৯০০ টাকায় যায়নি।

এক মণ ধানে চাল হয় ২৬ কেজির বেশি। আর অটোমেটিক মেশিনে তা হয় ৩০ কেজির কাছাকাছি। এই হিসাবে চালের দাম ৫৫ থেকে ৬০ টাকা যাওয়ার কোনো কারণ নেই বলে বলছেন ব্যবসায়ীরাই। তারপরও দাম কেন বাড়ছে, সে নিয়ে কোনো জবাব নেই কারও কাছেই।

আবার চালের দাম বাড়লেও সরবরাহের কোনো ঘাটতি দেখা যায়নি বাজারে। 

তাহলে দাম কেন বাড়ছে?- পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, তারা যে টাকায় চাল কিনে আনেন কেজিপ্রতি তার চেয়ে সর্বোচ্চ এক টাকা লাভ করেন। মিলমালিকরাই বলতে পারবে কেন দাম বেড়েছে।

দেশের সবচেয়ে বড় চাল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের একটি রশিদ এগ্রো ফুড লিমিটেডের জ্যেষ্ঠ বিপণন কর্মকর্তা নাজিম হায়দার ঢাকাটাইমসকে বলেন, মূলত মৌসুমের শেষ হওয়ায় চালের দাম এখন বেড়েছে। তিনি বলেন বোরো ধান উঠার পর পরই দাম অনেকটাই কমে আসবে। তিনি জানান, গত এক মাসে বস্তা প্রতি (৫০ কেজি) ১৫০ টাকার মতো বেড়েছে। এখন বাজারে কেন ৫ থেকে ৭ টাকা বেড়েছে, সে প্রশ্নের জবাব তার কাছে জানা যাবে না।

 

বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কয়েকদিনের মেঘলা আকাশ আর বৃষ্টির কথা বলে দাম বাড়ানো হয়েছে। অকাল বন্যায় হাওরে ফসলহানির খবরে চালের বাজার তেঁতে উঠেছে আরও। দামেআরও বাড়বে আরও-এমন কথাও বলছেন ব্যবসায়ীরা।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা গত ২০ এপ্রিলের বাজারদরে সরু চালের দাম কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ৫৬ টাকা, মাঝারি চালের দাম ৪২ থেকে ৪৬ টাকা, আর মোটা চালের দাম দেয়া আছে ৪০ থেকে ৪২ টাকা এবং সুগন্ধি চালের দাম ৮০ থেকে ৮৫ টাকা।   

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৫ সালে মোটা চালের গড় মূল্য ছিল ২৮.৬৭ টাকা, মাঝারি চালের ৩৫.৫৪ টাকা এবং সরু চালের গড় মূল্য ছিল ৪৩.৬৬ টাকা।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শনিবারের বাজারদরে দেখা যায়, সরু চালের দাম ৪৮ থেকে ৫৬ টাকা, মাঝারি চালের দাম ৪৪ টাকা থেকে ৪৮ টাকা, মোট চাল বিক্রি হচ্ছিল ৪০ টাকা থেকে ৪২ টাকা।

এদিকে ২০১৬ সালের একই দিনে সরু চালের দাম ছিল ৪৪ টাকা থেকে ৫৫ টাকা, মাঝারি চালের ৪০ টাকা থেকে ৪৪ টাকা এবং মোটা চালের দাম ছিল ৩২ টাকা থেকে ৩৪ টাকা।

বাৎসরিক মূল্যমানে দেখা যায়, গত বছরের তুলনায় এবার সরু চালের দাম বেড়েছে ৫.০৫ শতাংশ, মাঝারি চালের দাম বেড়েছে ৯.৫২ শতাংশ এবং মোটা চালের দাম বেড়েছে ২৪.২৪ শতাংশ। 

তবে টিসিবির বাজারদরের সঙ্গে প্রকৃত বাজারদরের পার্থক্য রয়ে গেছে। টিসিবির দরে সরু চালের দাম সর্বোচ্চ ৫৬ টাকা বলা থাকলেও বাজারে ৬০ থেকে ৬৫ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে এই চাল। 

কারওয়ান বাজারের পাইকারি চাল ব্যবসায়ী আবু বকর সিদ্দিক জানান, এক মাস আগে ৫০ কেজির যে বস্তা দুই হাজার ২০০ টাকা বস্তা বিক্রি হয়েছে, সেই চাল এখন দুই হাজার ৪০০ টাকা থেকে আড়াই হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তিনি বলেন, মিনিকেট চাল এখন কেজিপ্রতি ৫৩ থেকে ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দুই সপ্তাহ আগেও এর দাম ছিল ৪৭ থেকে ৪৮ টাকায়।       

  

আরেক ব্যবসায়ী জসিম জানান, সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে। স্বর্ণা পাইজাম বস্তাপ্রতি বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার ১০০ টাকায়। দুই সপ্তাহ আগেও দাম দুই থেকে তিনশ টাকা কম ছিল।

একই ভাবে মানভেদে নাজিরশাইলের দাম বস্তাপ্রতি বেড়েছে এক থেকে তিনশ টাকা।

বাংলাদেশে অর্থনীতি আগের চেয়ে শক্তিশালী হওয়ায় চালের দাম বৃদ্ধি এখন আর সেভাবে খবর হয়ে আসে না গণমাধ্যমে। তবে স্বল্প আয়ের মানুষ বিশেষ করে দিনমজুররা বিপাকে পড়ে দাম বৃদ্ধিতে।

গবেষণায় দেখা গেছে, নিম্ন আয়ের মানুষদের এখনও তাদের আয়ের বেশিরভাগ ব্যয় হয় চালের পেছনে। ফলে চালের দাম বাড়লে তাদের সঞ্চয় কমে অথবা শিক্ষা, চিকিৎসাসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় কমিয়ে দিতে হয়। বাড়ে অপুষ্টির সমস্যাও।

রিকশাচালক মতি মিয়া ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘চাইলের দাম বেশি, কিন্তু ইনকাম ত বেশি না। বৃষ্টি আইলে ইনকাম আরও কমে। এই সময় চাউলের দাম আবার বাড়তির দিকে। আমাগো মত মানুষের জন্য এইটা বিপদ।’

কারওয়ানবাজারে চাল কিনতে আসা সিদ্দিক বলেন, ‘যখনই চাল কিনতে আসি, দেখি গত বারের চেয়ে দাম বেশি। বাজারে এখনে চালেই বেশি টাকা যাচ্ছে।’

(ঢাকাটাইমস/২২ এপ্রিল/এমএবি/ডব্লিউবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত