কতটা প্রভাবশালী হবে এরশাদের জোট?

এম গোলাম মোস্তফা, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৯ মে ২০১৭, ১২:৫২ | প্রকাশিত : ০৯ মে ২০১৭, ০৮:০০

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিশাল সংখ্যক দলকে নিয়ে রাজনৈতিক জোট গঠন করেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ এবং বিএনপির নেতৃত্বে ২০ দলের বিপরীতে এরশাদের জোট ঢাউসই বলা যায়। ৫৮ দলীয় জোট সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে কখনও হয়নি।

জাতীয় পার্টি ছাড়াও এরশাদের সম্মিলিত জোটে আছে বাংলাদেশ জাতীয় জোট- বিএনএর ২১ দল, সম্মিলিত ইসলামী মহাজোটের ৩৫ দল এবং বাংলাদেশ ইসলামিক ফ্রণ্ট। কিন্তু বিষয়টা সংখ্যার নয়। এরশাদের জোটে যোগ দেয়া দলগুলোর প্রভাব কী? তাদের জনসমর্থনই বা কত-এ টাই প্রধান বিবেচ্য বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মনে করে, এই জোট দিয়ে এরশাদ রাজনীতিতে বলার মত কোনো প্রভাবই তৈরি করতে পারবেন না।

১৯৮১ সালে বন্দুকের নলের মুখে ক্ষমতায় আসার পর নিজ দল জাতীয় পার্টি গঠন করেন এরশাদ। নয় বছর পর গণ-আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা হারানোর পর জাতীয় পার্টি আবার আলোচনায় আসে ১৯৯৯ সালে বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে। আওয়ামী লীগবিরোধী জোট হিসেবে গঠন করার সময় তখন বলা হয়, একসঙ্গে আন্দোলন, একসঙ্গে নির্বাচন এবং একসঙ্গে সরকার গঠনের কথা।

কিন্তু ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ওই জোট গঠন করা হলেও নির্বাচনের আগেই তা ভেঙে যায়। জোট থেকে বের হয়ে যান এরশাদ। যদিও তার সিদ্ধান্ত না মেনে দল ভেঙে একাংশ থেকে যায় জোটে। আর নাজিউর রহমান মঞ্জুরের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি নামে দলের একটি অংশ গঠন করে আলাদা দল। এখনো বিজেপি নামে দলটি বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ আছে।

আবার ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে চরমোনাইয়ের সেই সময়ের পীর ফজলুল করীমের সঙ্গে জোট করে নির্বাচনে যান তিনি। এই জোট ইসলামপন্থীদের ভোট টানবে বলে আশা করলেও শেষ পর্যন্ত তেমনটি হয়নি। আর ১৯৯০ সালে পতনের পর নির্বাচনে সবচেয়ে বাজে ফলাফল করে জাতীয় পার্টি।

২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াতবিরোধী আন্দোলনের এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটে যোগ দেয় জাতীয় পার্টি। ২০০৭ সালের জানুয়ারির বাতিল হয়ে যাওয়া নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তও তারা নেয় জোটের সিদ্ধান্ত হিসেবে। এরপর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচন তারা করে মহাজোটের শরিক হিসেবেই।

এ দিকে ধর্মভিত্তিক দলসহ ৫৮ দল নিয়ে এরশাদ নতুন যে জোট গঠন করেছেন সেটি আওয়ামী লীগের বি টিম একটি অংশ বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, এই জোট লোক দেখানো।

জানতে চাইলে রাজনীতি বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্বাবিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক গোবিন্দ চক্রবর্তী ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘এরশাদের জোট আগামী জাতীয় নির্বাচনে কতটা প্রভাব ফেলবে তা বলা মুশকিল। এরশাদ যে ৫৭ বা ৫৮ টি ইসলামিক দল নিয়ে জোট গঠন করেছেন, আদৌ এর মধ্যে কতগুলো দল আছে কি না? কোন কোন দলের অফিস নাই, কোন কোন দলের নেতাই নাই।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক বলেন, ‘মহাজোট তো একটা আছেই, আরেকটা আছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট। সরকারের তরফ থেকে কাউন্টার ব্যালেন্স করতে নির্বাচনী কৌশলের একটা অংশ হিসেবে এটা করতে পারে। আরেকটা কারণ হতে পারে বিগত নির্বাচনে সরকার কর্তৃক বা মহাজোট কর্তৃক এরশাদকে যে কব্জা করা বা প্রভাবিত করেছে, সেখান থেকে বেড়িয়ে আসতেও কৌশল হিসেবে এরশাদ এই জোট গঠন করতে পারে।’

গোবিন্দ চক্রবর্তী বলেন, ‘বাংলাদেশ রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিএনপি এবং জাতীয় পার্টির মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। সেই ক্ষেত্রে এরশাদের জাতীয় পার্টি মনে করেছে, ইসলামী দল নিয়ে যদি জাতীয় পার্টি আরও একটু শক্তিশালী হয়, তবে আগামী নির্বাচনে একটা ফায়দা পাওয়া যেতে পারে।’

ইসলামী জোট গঠনের কারণ সম্পর্কে গোবিন্দ চক্রবর্তী বলেন, ‘ইসলামী জোট গঠনের আরেকটা কারণ হতে পারে যে, মানুষকে আরেকটা পছন্দের সুযোগ করে দেয়া। বিএনপি অনেক কনজারভেটিভ দল, আমরাও একই ধরনের মতাদর্শের দল, সুতরাং ইসলামী মাইন্ডের ভোট পাওয়ার জন্যও হতে পারে।’

এই নামসর্বস্ব দল নিয়ে জোট গঠন করে রাজনীতিতে বা নির্বাচনে আদৌ কোনো প্রভাব ফেলা যাবে কি? বিষয়টি নিয়ে কথা হয় জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য দিলারা খন্দকার শিল্পীর সঙ্গে। ঢাকাটাইমসকে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা জাতীয় পার্টি সবাই তো নির্বাচনকে সামনে রেখেই জোট করছে। আমাদের জোটে কিন্তু শুধু ইসলামী জোট নয়, এটা সম্মিলিত জাতীয় জোট দরজা সকলের জন্যই খোলা আছে। আমি মনে করি এই জোট আগামী নির্বাচনে অবশ্যই প্রভাব ফেলবে। আর প্রভাব ফেলবে সেটা চিন্তা করেই জোট গঠন করা।’

তবে এরশাদের জোট আগামী জাতীয় নির্বাচনে ভাল করবে-সে আশায় গুড়েবালি বলে মনে করেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামছুজ্জামান দুদু। ঢাকাটাইমসকে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয় এটা সরকারের একটা কারসাজি। সরকারের সর্ববৃহৎ পার্টনার হচ্ছে এরশাদ, সরকারে তাদের তিন জন মন্ত্রী রয়েছে। আমার ধারণা হচ্ছে সরকার এবং এই জোট যাতে প্রকৃত বিরোধী দলের নির্বাচনকে প্রতিহত করার চেষ্টা করে সে জন্যই এই ঘটনার জন্ম দেয়া হয়েছে। বাস্তবে এরশাদ সাহেবের অবস্থান একেবারে শূন্যের কোটায়।’

বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘এই জোটে ভোটে প্রভাব ফেলার মতো দল নাই। এই জোটে ৫৮টি দল নেই, আছে ৫৮টি ব্যক্তি। এরশাদ সাহেব ৫৮ ব্যক্তির সমন্বয় ঘটিয়েছেন জোটের নামে।’

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান অবশ্য এরশাদের জোটকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এই জোট ভাল করুক।

আর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এরশাদের ঘোষিত জোটকে চমক হিসেবেই দেখছেন। তিনি বলেছেন, ‘এই চমকের রেশ শেষ হতে কত সময় লাগবে, সেটার জন্য আগামী নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’

(ঢাকাটাইমস/০৯মে/জিএম/ডব্লিউবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত