বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ সেল কাগজে কলমে

সিরাজুম সালেকীন, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৪ মে ২০১৭, ১১:৪৪ | প্রকাশিত : ১৪ মে ২০১৭, ০৮:২০

মেয়েটার নাম জান্নাতুল ইসলাম (ছদ্মনাম)। এসএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এ প্লাস এবং এইচএসসিতে এ পান। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পেরে ভর্তি হন ধানমন্ডির একটি নামকরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএতে। ওঠেনও ক্যাম্পাসের পাশেই একটি ছাত্রীনিবাসে।

ভর্তির পর প্রথম সেমিস্টার থেকেই ক্লাসে ভাল ফলাফল করতে থাকেন জান্নাতুল, নজরে আসেন শিক্ষকদের। তাই ক্লাসের সকল নোট, পরীক্ষার সময়সূচি ফেসবুকে দেয়া, বিভিন্ন কাজের জন্য তাকে ক্লাসের প্রতিনিধি (সিআর বা ক্লাস রিপ্রেজেন্টেটিভ) বানানো হয়। প্রথম সেমিস্টারে জিপিএ ৩.৬০ পান তিনি। উৎসাহ আরো বেড়ে যায় ভালো ফলাফল করার প্রতি। দ্বিতীয় সেমিস্টার শুরু হলে আগের ইংরেজি শিক্ষকই তার একটি সাবজেক্ট এর ক্লাশ টিচার হন।

প্রথম সেমিস্টারের মতো এই সেমিস্টারেও জান্নাতুলকে সিআর-এর গুরু দায়িত্ব দেন ওই শিক্ষক। ক্লাশের স্লাইড ফটোকপি করা, গ্রুপের সবাইকে ক্লাশ পরীক্ষার সময়সূচি জানিয়ে দেয়ার জন্য জান্নাতুলকে ক্যাম্পাসে নিজের রুমে ডাকতেন ওই শিক্ষক। মাঝে মাঝেই ফোন দিয়ে পড়াশোনার খোঁজ নিতেন। কোন কিছু বুঝতে অসুবিধা হলে ফোনে বা রুমে ডেকে বুঝিয়ে দিতেন।

প্রথম দিকে পড়াশোনার খোজ নিলেও পরে ব্যক্তিগত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ফোনালাপ করতে শুরু করেন সেই শিক্ষক। আস্তে আস্তে কথা বলার মাত্রাও বাড়াতে থাকেন তিনি। কারণে অকারণে জান্নাতুলের সাথে রুমে ডেকে গল্প করতেন তিনি। এরপর বিভিন্ন সময় জান্নাতুলের সাথে বেড়াতে যাওয়া বা রেস্টুরেন্ট এ খেতে যাবার  প্রস্তাব দিতেন। এমনকি ওই শিক্ষকের বাড়িতে পড়া বুঝতে যাবার কথা বলতে থাকেন। বিষয়টা অন্যদিকে গড়াচ্ছে টের পেয়ে জান্নাতুল সাবধান হয়ে যান। আস্তে আস্তে যোগাযোগ কমাতে শুরু করেন সেই শিক্ষকের সাথে।

এরপর বেরিয়ে আসে ওই শিক্ষকের আসল চেহারা। তার প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় জান্নাতুলকে পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেবার হুমকিও দেন। কোনও ভাবে সেমিস্টারটা পার করে জান্নাতুল চলে যান তার গ্রামের বাড়িতে। সেখানেও প্রায়ই জান্নাতুলকে ফোন করে বিয়ের প্রলোভন দেখাতেন ওই শিক্ষক। না হলে পরীক্ষায় পাস করাবেন না বলে হুমকি দিতেন। পরে ঢাকায় এসে বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় সেমিস্টারের রেজিস্ট্রেশন করলেও জান্নাতুল আর বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়নি শিক্ষকের ভয়ে। এমনকি মান সম্মান নষ্ট হবে ভেবে বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বা পরিবারের সদস্যদেরও জানাননি বিষয়টি। পরে পরিবারকে না জানিয়ে ডিগি ভর্তি হন তিনি।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন নাম পরিচয় লুকোনো জান্নাতুলের কমতি নেই। মেয়েরা প্রতিনিয়িত যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে দেশের বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সাহস করে কেউ কেউ অভিযোগ করতে চাইলেও ঝামেলা এড়াতে এরকম সমস্যা নিয়ে সামনে আসতে চান না বেশিরভাগ মেয়ে শিক্ষার্থী।

ইউএন উইমেন এর এক জরিপ বলছে, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা ৭৬ ভাগ নারী শিক্ষার্থী কোন না কোন ভাবে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এর মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬৬ শতাংশ এবং মেডিকেল কলেজে যৌন হয়রানির শিকার হন ৫৪ শতাংশ ছাত্রী।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি বন্ধে ‘জিরো টরালেন্স’ নীতি নিয়েছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন(ইউজিসি)। ইউজিসি বলছে, যৌন হয়রানি বলতে সরাসরি কিংবা ইঙ্গিতে অশালীন আচরণ, হয়রানি বা নিপীড়নমূলক উক্তি ও মন্তব্য বা ভঙ্গি, প্রাতিষ্ঠানিক এবং পেশাগত ক্ষমতার অপব্যবহার করে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়া চিঠি, মোবাইল, ক্ষুদেবার্তাসহ বিভিন্ন মাধ্যমে যৌন ইঙ্গিতমূলক অপমানজনক কথা লেখা, চরিত্র হননের জন্য স্থির বা ভিডিওচিত্র ধারণ করা, প্রেমের প্রস্তাব করে প্রত্যাখ্যাত হয়ে হুমকি দেওয়াকে বোঝায়। এ ধরনের হয়রানি বন্ধে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কয়েক দফা চিঠিও দিয়েছে ইউজিসি। কিন্তু অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই ইউজিসির এসব চিঠির তোয়াক্কা করেছে না।

ইউজিসি বলছে, গত দুই বছর ধরে ৭২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ সেল পাওয়া গেছে। বাকি ৬২টি বিশ্ববিদ্যালয়কে জরুরি ভিত্তিতে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ সেল গঠনের নির্দেশনা দেয় ইউজিসি। কিন্তু ইউজিসির এমন তৎপরতার পরও বেশি কিছু এখনও সেল গঠন করেনি।

ইউজিসি জানিয়েছে সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী ৯৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৪টি বিশ্ববিদ্যালয় যৌন হয়রানি প্রতিরোধ সেল গঠন করেছে।

যৌন হয়রানি বন্ধে ইউজিসিতে প্রতিনিয়ত সরকারি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদের ডেকে সভা সেমিনার করা হচ্ছে। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ এ যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কোন সেল গঠনের কথা বলা হয়নি বলে অনেকেই এ সুযোগটিকে কাজে লাগাচ্ছে।

যৌন হয়রানি বন্ধে ২০০৮ সালে সুপ্রিম কোর্টে একটি রিট করে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি । ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যমসহ সকল প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি’ নামে একটি কমিটি গঠনের আদেশ দেয়া হয়।

সেবছরই একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তা বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) নির্দেশ দেন আদালত। হাইকোর্টের ওই রায়ে বলা হয়, ‘কমিটিতে সদস্য সংখ্যা থাকবে কমপক্ষে পাঁচ জন। পাঁচ সদস্যের ওই কমিটির বেশিরভাগ সদস্য হতে হবে নারী এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বাইরে দুইজন সদস্য নিতে হবে। সম্ভব হলে নারীরাই কমিটির প্রধান হবেন।’

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস-ইউল্যাব এর যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটির চেয়ারম্যান আরজু ইসমাইল। তিনি ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আমরা দুই বছরের বেশি সময় ধরে এই সেল গঠন করেছি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই যৌন হয়রানি প্রতিরোধে জিরো টরালেন্স ভূমিকা দেখিয়ে আসছি আমরা। আমিসহ আরো চারজন সদস্য কাজ করছে এই কমিটিতে। অভিযোগ পাওয়ার পর পরই আমরা যাচাই বাছাই শেষে আইনগত ব্যবস্থা নিই। কমিটি বছরে দুই তিনটি অভিযোগ পেয়ে থাকে সাধারণত।’

আরজু ইসমাইল বলন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা সেল করেই সীমাবদ্ধ থাকিনি। যৌন হয়রানি কী, কেন হয়ে থাকে এ বিষয়ে সেমিনার করা হয়েছে আমাদের ক্যাম্পাসে। সেখানে সব সময় বলা হয় কোন ভাবে হয়রানি হয়ে থাকলে কেউ যেন অবশ্যই চুপ করে না থাকে। কিন্তু এটা কখনও সুফল বয়ে আনতে পারে না।’

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ারম্যান অধ্যাপক হান্নান ফিরোজ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর নিজ দায়িত্ব বোধ থেকে সেলটি গঠন করি। এরই মধ্যে গতবছর দুইজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ পেয়ে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। তবে ছোট খাটো অভিযোগ থাকলেও সেটা গুরুত্বসহকারে দেখা হয়।’

তবে বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নামে মাত্র সেল গঠন করে রেখেছে। তাদের কার্যক্রম নেই বললেই চলে। আর সকল ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ দিতে অনীহা দেখা যায়।

এ বিষয়ে ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের উপ-পরিচালক জেসমিন পারভীন ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আমরা প্রতিনিয়ত চেষ্টা করছি যেন সব বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি বন্ধে সেল হয়। যারা এখনও সেল গঠন করেনি, তাদের চিঠি দেওয়া হবে। দ্রুত সময়ে তারা সেল না করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

অনেকে সেল গঠন করলেও ঠিক করে কাজ করছে না বলে অভিযোগ রয়েছে, এমন মন্তব্যের প্রেক্ষিতে ইউজিসি কর্মকর্তা বলেন, ‘কেউ হয়রানির শিকার হলে অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নির্যাতন সেল কে জানাতে হবে। না হলে সরাসরি ইউজিসিতেও তিনি তার অভিযোগ জানাতে পারেন।’

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটি থাকলেই যৌন হয়রানি বন্ধ হবে কি না এ বিষয়ে জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা ইউএন উইম্যান এর সমন্বয়কারী মাহতাবুল হাকিম ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘কমিটি থাকলেই যে কমিটি কাজ করবে ব্যাপারটা এমন না। তাই আগে সচেতনতা তৈরি করতে হবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে।’ তিনি জানান, সাম্প্রতিক চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটির বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশি বেশি কথা বলার চেষ্টা করেছে তার সংস্থা। তবে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে বিব্রত বোধ করে। তাই নাটকের মাধ্যমে, খেলাধুলা, ডিবেট বা সিনেমার মাধ্যমে ইউএন উইম্যান শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করছে। এতে বেশ ভালো ফলাফল পাওয়া গেছে যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে। এ প্রচেষ্টায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে সাথে নেয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের।

ঢাকাটাইমস/১৩মে/এসএস/ডব্লিউবি

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত