হাতকড়া পরিয়ে, টেনে হিঁচড়ে নেয়া হলো শ্যামল কান্তিকে

আমির হুসাইন স্মিথ, নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি
| আপডেট : ২৪ মে ২০১৭, ২০:১৯ | প্রকাশিত : ২৪ মে ২০১৭, ২০:০১

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগ এনে লাঞ্ছনার শিকার শিক্ষক শ্যামল কান্তি কারাগারে গেছেন ঘুষের মামলায়। আদালতে শুনানিতে বাদীপক্ষ এবং শ্যামল কান্তির আইনজীবীর মধ্যে বহু তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। তবে বিচারকের মন গলাতে পারেননি শ্যামলের আইনজীবী সাখাওয়াত হোসেন।

আদালত থেকে শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে প্রিজন ভ্যানে তোলা হয় হতকড়া পরিয়ে, নেয়া হয় টেনে হিঁচড়ে। নারায়ণণগঞ্জ কোর্ট পুলিশের পরিদর্শক সোহেল আলম জানান, শ্যামল কান্তিকে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

দুপুরের আগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর বুধবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম অশোক কুমার দত্তের আদালতে আত্মসমর্পণ করেন শ্যামল কান্তি। জামিন আবেদন নাকচ হলে তাকে কারাগারে নিয়ে যায় পুলিশ।

দুপুরে একই আদালতে এক শিক্ষিকাকে এমপিওভুক্ত করে দেয়ার আশ্বাস দিয়ে ঘুষ নেয়ার অভিযোগের মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় পুলিশ। আর এই প্রতিবেদন আমলে নিয়ে শ্যামল কান্তির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আদালত। ওই সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন শ্যামল কান্তি। আদালত পাড়ায় এ সময় এস সময় পুলিশের উপস্থিতি ছিল লক্ষ্য করার মতো।

গত বছরের ১৩ মে ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ এনে শ্যামল কান্তিকে কান ধরিয়ে ওঠবস করান সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান। এ নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে ঘটনা তদন্তে কমিটি করে সরকার। কিন্তু কোনো তদন্তেই অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং সেলিম ওসমানকে দায়ী করে প্রতিবেদন দেয়া হয়।

আর শ্যামল কান্তিকে লাঞ্ছিত করার মামলায় ২৩ মে ঢাকার মুখ্য মহানগর বিচারিক হাকিম আদালতে আত্মসর্মপণ করে জামিন নেন সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান। আদালত আগামী ৪ জুলাই লাঞ্ছিতের মামলায় অভিযোগ গঠনের জন্য তারিখ ঠিক করে।

শ্যামল কান্তিকে লাঞ্ছনার পর সমালোচনার মধ্যে ওই বছরের জুলাইয়ে তার বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আনা হয় নারায়ণগঞ্জের একটি আদালতে। এর মধ্যে দুটি অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দেয়া হয়। আর বন্দর পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক মোর্শেদা বেগমের আনা অভিযোগ তদন্ত করে দেখার নির্দেশ দেন বিচারক। তিনি অভিযোগ করেন, তার চাকরি এমপিওভুক্ত করে দেয়ার জন্য তার কাছ থেকে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে দুই দফায় এক লাখ ৩৫ হাজার টাকা ঘুষ নেন শ্যামল কান্তি।

গত ১৭ এপ্রিল তদন্ত কর্মকর্তা বন্দর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হারুন অর রশিদ শ্যামল কান্তিকে অভিযুক্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন।

তবে বরাববরই শ্যামল কান্তি ভক্ত তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তিনি বলছেন, তাকে চাপে রাখতেই প্রভাবশালী এক ব্যক্তির নির্দেশে ষড়যন্তমূলকভাবে এই মামলা দায়ের করা হয়েছে।

শ্যামল কান্তির আইনজীবী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত ব্যথিত ও ক্ষুদ্ধ। এটা জাতির জন্য, শিক্ষক সমাজ, দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য এটি একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়। একজন জনপ্রতিনিধি চাইলে অনেক কিছু করতে পারেন, একজন মানুষকে অনেকভাবে নিষ্পেষিত করতে পারে। আজকে শ্যামল কান্তি ভক্তের মাধ্যমে সেটি প্রমাণিত হলো।’ তিনি বলেন, ‘শ্যামল কান্তি ভক্ত শুধু শ্যামল কান্তি ভক্ত নয়, সে এদেশের মানুষের প্রতিচ্ছবি। আজকে যে ধারার মামলায় তাকে জেলে যেতে হয়েছে তা অবিশ্বাস্য। আমার আইন পেশার ২৫ বছরে একজন অসুস্থ লোক, যার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোন অভিযোগ নেই, যে লোকটি দীর্ঘ দিন সরকারি খরচে চিকিৎসাধীন ছিলেন।’

সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘ইতিপূর্বে তাকে (শ্যামল কান্তি) যেভাবে নির্যাতন করা হয়েছে সে নির্যাতনের কারণে উচ্চ আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে স্বপ্রণোদিত রুল দিয়েছিল। তিনি তো মামলা করেননি। উচ্চ আদালতের নির্দেশে মামলা হয়েছে। সেই অপরাধের কারণেই আজকে তাকে জেলে যেতে হয়েছে। জাতি হিসেবে এই ঘটনা আমাদেরকে পীড়া দেয় এবং আমাদের নিজেদেরকে অসহায় মনে হয়।’

অন্যদিকে বাদীপক্ষের অপর আইনজীবী আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ‘শিক্ষক মোর্শেদা বেগমের কাছ থেকে এক লাখ ৩৫ হাজার টাকা ঘুষ নেয়ার অভিযোগের দায়ের করা মামলায় পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। আদালত পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন আমলে নিয়ে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে।’
 
বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখা কমিটির সভাপতি মাহবুবুর রহমান মাসুম বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি যে বলেছেন সরকার নিম্ন আদালতগুলো নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে-আজকে শ্যামল কান্তি ভক্তের কারগারে পাঠানোর বিষয়ে প্রমাণিত হলো। এই মামলায় সাধারণত সকলেই জামিন পায়।’

ঢাকাটাইমস/২৪মে/প্রতিনিধি/ডব্লিউবি

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত