স্বাভাবিকতায় ফিরে আসুক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

তিলন এন্ড্রুস
 | প্রকাশিত : ০৮ জুন ২০১৭, ২১:৫৮

গত কয়েকদিন ধরে মনে ভীষন চাপা বিষন্নতা কাজ করছে। ভালো নেই আমার প্রাণপ্রিয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা আরিচা মহাসড়কে দুইজন ছাত্রের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে যা ঘটে গেল তা সত্যিই দুঃখজনক। এই কয়েকদিন সমস্ত পরিস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমে এবং সামাজিক মাধ্যমে অনেক প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের কথা, তাদের মতামত এবং অবস্থান দেখেছি আর নিজে পর্যবেক্ষন করতে বারংবার ক্যাম্পাসে গিয়েছি, অনেকের সাথে কথা বলেছি। রানা যখন অত্যন্ত মুমুর্ষ অবস্থায় এনাম মেডিকেল হাসপাতালে ভর্তি আর আরাফাতের লাশ ওখানে রাখা তখন আমি সেখানে প্রায় তিনঘন্টা অবস্থান করেছিলাম।

মুল সমস্যার সূত্রপাত ঘটে তখনই যখন তাদের মৃতদেহ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে আসা গেলনা জানাজা পড়ানোর জন্য। বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের বন্ধু-বান্ধব এবং অনেক সাধারণ শিক্ষার্থীর কাছে এটি ছিল গভীর আবেগের একটি বিষয়। এই নিয়ে অনেক শিক্ষার্থীকে দেখেছি সামাজিক মাধ্যমে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে। কেন এটি হল এর উত্তর পরবর্তীতে আমরা মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর ড. ফারজানা ইসলামকে একটি বেসরকারী টিভি চ্যানেলের সাক্ষাৎকারে দিতে শুনেছি । মৃত শিক্ষার্থীদের পরিবারের সাথে কথা বলে নিলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হওয়া যাবে বলে আমি মনে করি।

এরপর আমরা ঘটনার পরেরদিন বেশকিছু সাধারন শিক্ষার্থীদের দেখলাম ঢাকা আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে পর্যাপ্ত গতিরোধক, ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ, সিসি ক্যামেরা বসানোর মত বিভিন্ন যৌক্তিক দাবী করতে যাতে মহাসড়কে চলাচলের নিরাপত্তা বিধান করা যায়। প্রশাসনের দৃষ্টি দ্রুত আকর্ষনের জন্য হয়তো এই মহাসড়ক অবরোধ করা কিন্তু দাবীগুলোর যৌক্তিকতা নিয়ে বিন্দুমাত্র কারো দ্বিমত পোষন করার কথা নয়। এমনটি যে হতে চলেছে তা যারা সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় ছিলেন তা আগেই বোধকরি টের পেয়েছিলেন। কারণ এগুলো নতুন কোন ব্যাপার নয়। বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিয়ে মাননীয় উপাচার্যকে আমরা দুইবার ঘটনাস্থলে ছুটে যেতে দেখি এবং একপর্যায়ে তিনি দাবীপূরনের আশ্বাস দিয়ে লিখিত পর্যন্ত দেন। ঢাকা আরিচা মহাসড়ক অবরোধের জন্য নিশ্চয়ই তার উপর সরকারি চাপও ছিল যেন বিষয়টির দ্রুত মীমাংসা হয় এবং রাস্তা যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা যায়।

কোন একটি মর্মান্তিক ঘটনায় শিক্ষার্থীদের আবেগাক্রান্ত হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক আবার এটাও সত্যি নিজেদের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য অত্যন্ত সুকৌশলে বাস্তবায়নের জন্য অনেকগুলো পক্ষ সেখানে তৈরি হয়ে যায়। অনেক বিপ্লবী-বিদ্রোহী ছাত্র সংগঠনকে এসবে জড়িয়ে পরে সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবী আদায়ের সাফল্যকে নিজেদের দিকে টেনে নেবার প্রয়াসে লিপ্ত থাকতে দেখা যায়। সাধারণের আবেগকে ব্যবহার করে তাদের ভুলপথে পরিচালনা করাটা খুবই সহজ। মাননীয় উপাচার্য আশ্বাস দেবার পর বেশিরভাগ সাধারণ শিক্ষার্থী সেখান থেকে চলে যায় এটি ঘটনাস্থলে উপস্থিত অনেকের কাছ থেকে আমি জেনেছি আবার কিছু সংশয়বাদী শিক্ষার্থী তখনও অবরোধের পক্ষে ছিল যেন তাদের দাবী তখনই বাস্তবায়ন করা হয়। লক্ষ্য করলে দেখা যায় সমস্ত দাবীসমুহ বাস্তবায়নের জন্য একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে যা হুট করে বাস্তবায়ন করে ফেলা কখনই সম্ভব নয়। এসময় অনেককে বলতে শুনেছি ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ বিপুল সংখ্যক সমর্থক নিয়ে সেখানে উপস্থিত ছিল আর তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের আঘাত করেছে, বিভিন্নরকম ভয়ভীতি প্রদান করেছে। এক সাংবাদিক আমাকে ছবিও দেখান ছাত্রলীগ সভাপতি এক শিক্ষার্থীকে ঘাড়ে ধরে শাসাচ্ছে। পরে ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দের সাথে কথা বলে জানা গেল তারাও উপাচার্যের মত আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বোঝাতে গিয়েছিলেন যেন তারা মহাসড়ক ছেড়ে দেয়। ছাত্রলীগের সভাপতি জানালেন ঐ শিক্ষার্থী ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক পদধারী একজন কর্মী আর তিনি তাকে শাসন করছিলেন। সরকারের ভাতৃপ্রতিম ছাত্রসংগঠন হিসাবে ছাত্রলীগকে দোষ না করলেও সবসময় বলির পাঁঠা হতে হয় এটিও নতুন কোন বিষয় নয় আবার ছাত্রলীগকে বিতর্কিত করে মিডিয়ায় সহজেই কোন বিষয় তুলে ধরা যায় এটিও প্রতিষ্ঠিত সত্য।

যাহোক ঘটনাটা এখানেই থেমে যেতে পারতো, গেলে ভালো হত। কিন্তু তার বদলে ঘটে গেল একটি ন্যাক্কারজনক ঘটনা। পুলিশ নির্বিচারে ছাত্রদের উপর লাঠি চার্জ করলো, টিয়ার শেল ছুড়লো এমনকি গুলি পর্যন্ত করলো। একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী হিসাবে আমি এটি কোনভাবেই মেনে নিতে পারিনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীদের প্রতি এহেন আচরন খুবই ঘৃন্য এবং নিন্দনীয়। কেন এটি হল তার জবাবদিহীতার প্রয়োজন এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব প্রশাসনের পক্ষ থেকে যার উপর বর্তায় তার ঘটনাস্থলে অনুপস্থিতি আর কোন বক্তব্য না প্রদান করে থাকাটা রহস্যজনক এবং অনৈতিক। দায়িত্ব ঠিকমত পালন না করলে দায়িত্বশীল পদ ধরে রাখাটা একদমই অনুচিত। ঐ পদ কোন আলঙ্করিক পদ না বরং আস্থা এবং নিশ্চয়তার পদ।

এরপর থেকে ঘটে গেল একের পর এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা। বিক্ষুদ্ধ শিক্ষার্থীদের একটি অংশ উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নিল আর হামলার ব্যাখ্যা দাবী করলো। শিক্ষার্থীরা তা করতেই পারে। কিন্তু বিক্ষোভ প্রদর্শনের নামে কিছু শিক্ষার্থী যে আচরন প্রকাশ করলো তা ছাত্রসুলভ নয়। উপাচার্যের বাসভবন ভাংচুর, শিক্ষকদের প্রতি ইট-পাথর-গাছের কাচা কাঁঠাল ছুঁড়ে মারা কিংবা অকথ্য ভাষায় গালাগালি করা বিশ্ববিদ্যালয় মেধাবী শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে একদমই প্রত্যাশা করা যায়না। আমি বিশ্বাস করি করি সবাই এটি করেনি, গুটি কয়েক শিক্ষার্থী না বুঝে বা কারো দ্বারা প্ররোচিত হয়ে এই হিংস্র- উন্মত্ত আচরন করেছে। তাদের সনাক্ত করে সংশোধনের ব্যবস্থা করাই যেতে পারে। কিন্তু প্রশাসনের প্রতিক্রিয়াটাও খুব একটা শোভন হয়নি। পুলিশী মামলা করে রাতের আধাঁরে অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থীকে গ্রেফতার করানোটা খুবই অবিবেচনা প্রসুত একটা কাজ হয়েছে বলে আমি মনে করি যেখানে বেশ কিছু মেয়ে শিক্ষার্থী ছিল। বাংলাদেশে থানা-পুলিশের কি হয়রানী তা আমরা জানি, তাদের ব্যবহার কতটা জনবান্ধব তাও আমাদের জানা। সেই হিসাবে রাতের আঁধারে এতগুলো শিক্ষার্থীকে পুলিশে দেওয়াটা আমি কোনভাবেই মেনে নিতে পারিনা। এখনও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা প্রদানের ভার যার উপর সেই প্রশাসনের কর্তা ব্যাক্তিকে আমরা কোন কথা বলতে শুনি না। এইসব ঘটনার জেরে সাধারন শিক্ষার্থীদের কপালে জুটলো হল ভ্যাকেন্ট, পরীক্ষা বাতিল। এর সুদূর প্রসারী ফল হচ্ছে সুনিশ্চিৎ সেশন জট।

যাহোক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন কোন বিষয়গুলো কোন পর্যায়ে চলে গিয়েছে। আশার কথা সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট সিদ্ধান্ত নিয়েছে হল খুলে দেবার এবং সাধারন শিক্ষার্থীদের সব দাবী মেনে নেবার। এটা ভাল বিষয় যে জটিলতা উত্তরনে এ পদক্ষেপগুলো খুব জরুরী ছিল। সেই সাথে আশা করব অচিরেই মামলাও প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোন নাজুক পরিস্থিতিতে চিরবিরোধী একটা পক্ষ সবসময় সাধারনের আবেগ পুঁজি করে আন্দোলন আন্দোলন খেলা খেলে। তাদের মুলকাজ প্রশাসনকে চাপে রেখে সুবিধা আদায় করা। এদের ব্যবহার করে ফায়দা নেয় আরো অনেকপক্ষ যারা প্রতিমুহুর্তে ব্যস্ত ‘কি পেলাম’ এই হিসাব মেলাতে। মুলকথা একটা স্বার্থবাদী তৎপরতা অদৃশ্যমান অনুঘটক হয়ে অনেক কিছু নিয়ন্ত্রন করতে চায়। অতীতে দেখা গিয়েছে সামান্য একটা বিষয় শেষ পর্যন্ত উপাচার্য বিরোধী আন্দোলনে রুপ নেয়। এদের তৎপরতা থেকে উপাচার্য মহোদয়কে সতর্ক থাকতে হবে  এবং কাউকে ঘোলাপানিতে মাছ শিকার করতে দেয়া যাবেনা।      

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী সবার স্বার্থ সংরক্ষনের জন্য কাজ করবে এটাই আমরা প্রত্যাশা করি। তবে শিক্ষার্থীদের প্রতি আরো যত্নবান  ও সংবেদনশীল হওয়াটা খুবই জরুরী। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদেরও এমন কিছু করা উচিৎ হবেনা যা শিক্ষকদের সাথে সম্পর্কের মধ্যে অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতা তৈরি করে। সুসম্পর্ক রেখে বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নেবার দায় সব পক্ষের। পাবলিক প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহীতার উর্দ্ধে কেউই নয়, এটি সবাইকে মনে রাখতে হবে। বাংলাদেশের প্রথম নারী উপাচার্য প্রফেসর ড. ফারজানা ইসলাম আমাদের গর্ব। তাঁর সাফল্যের অংশীদার যদি সবাই হয় তবে তাঁর ব্যর্থতার অংশীদারও সবাই হবে। কোনভাবেই আমাদের গর্বকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করা যাবেনা। একটা কথা দিয়ে শেষ করতে চাই। অনেককে সামাজিক মাধ্যমে যেসব লেখনীতে ভাবপ্রকাশ করতে দেখেছি তার সারমর্ম হল এইসমস্ত ঘটনায় তাদের কাছে তিনি মা থেকে সৎমায় রুপান্তরিত হয়েছেন। আমি তাদের বলি শাসন করলেই কি মা সৎমা তে রুপান্তরিত হন? পরিবারের দুরন্ত, দুর্দান্ত-ডানপিটে অবাধ্য সন্তানটিকে কি সংশোধনের জন্য মা শাসন করেন না? শাসন মানেই পরিবার থেকে দূরে ঠেলে দেওয়া নয় বরং সংশোধিত করে তাকে কাছে নিয়ে আসা। ভালো থাকুক সবাই, প্রান প্রাচুর্যতায় পরিপূর্ণ হয়ে ভালো থাকুক আমাদের সবার প্রাণের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।   

লেখক: প্রাক্তন সাংগঠনিক সম্পাদক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

শিক্ষা বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত