বগুড়ায় রাতে মহাসড়ক জুড়ে জমজমাট চোরাই কেন্দ্র

প্রতীক ওমর, বগুড়া
 | প্রকাশিত : ১০ জুন ২০১৭, ০৯:১৪

বগুড়া-রংপুর মহাসড়কের শিবগঞ্জ থানা এলাকার ১৫ কিলোমিটারে রাতের বেলা দেখা মিলবে সড়কপাশে বেশ কিছু জায়গা একটি করে বাতি জ্বলছে। তার নিচে কয়েকটি ড্রাম। সাধারণের চোখে এটি ব্যতিক্রম কিছু নয়। তবে ট্রাকচালকদের জানা আছে এর বিশেষত্ব। এগুলো চোরাই কেন্দ্র। এখানে থেমে ট্রাক থেকে কিছু মাল বিক্রি করে টু পাইস কামানো যাবে।

ওইটুকু সড়কে গড়ে উঠেছে এ রকম আটটি চোরাই কেন্দ্র। দিনের বেলা এসব কেন্দ্র ফাঁকা পড়ে থাকলেও সন্ধ্যার পর জমতে থাকে। তা চলে ভোররাত পর্যন্ত।
এই মহাসড়ক দিয়ে ট্রাক-লরিতে করে মালামাল পরিবহনের সময় বিভিন্নœ চালক ও হেলপারদের কাছ থেকে জ্বালানি তেল, সয়াবিন, পামওয়েল, কয়লা, পাথর, ভুট্টা, গম কেনা হয় এসব কেন্দ্রে।

অভিযোগ আছে, পুলিশকে মাসোহারা দিয়ে এই চোরাই ব্যবসা চলে আসছে বছরের পর বছর। গত এক সপ্তাহ দিনে ও রাতে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে এসব চোরাই কেন্দ্রের অনেক তথ্য বেরিয়ে আসে। সাংবাদিকের অনুসন্ধানের বিষয়টি জানতে পেরে পুলিশ মঙ্গলবার গভীর রাতে অভিযান চালিয়ে চোরাই কেন্দ্র থেকে একজনকে গ্রেপ্তার করে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৫-১৬ বছর আগে মোকামতলা বন্দরের দক্ষিণে মুরাদপুর এলাকায় একটি পেট্রলপাম্পের সঙ্গে প্রথম চোরাই মালামাল ক্রয়কেন্দ্র গড়ে ওঠে। সেখানে প্রথম দিকে রাতের আঁধারে কয়লা ও জ্বালানি তেল কেনা হতো। লাভজনক হওয়ায় মোকামতলা বন্দরের আশপাশে আরো কয়েকটি চোরাই মালামাল ক্রয়কেন্দ্র গড়ে ওঠে কয়েক বছরের মধ্যে। 

চোরাই মাল কেনার সঙ্গে জড়িতদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাতের বেলা মহাসড়কে চলাচলকারী ট্রাকের চালক ও হেলপাররা এসব ক্রয়কেন্দ্রে ট্রাক থামায়। এরপর বাজারমূল্য থেকে অর্ধেক দামে স্বল্প পরিমাণে কয়লা, পাথর, ডিজেল, পেট্রল, সয়াবিন তেল ও পামওয়েল বিক্রি করে নগদ টাকা নিয়ে চলে যায়। রাতের আধারে কেনা এসব চোরাই মাল দিনের বেলা চলে যায় স্থানীয়  খোলা বাজারে।  

সরেজমিনে দেখা গেছে, বগুড়া-রংপুর মহাসড়কে শিবগঞ্জ থানার মহাস্থান কলেজ গেট থেকে রহবল পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটারের ভেতর আটটি ক্রয়কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে মহাস্থান কলেজ গেটে ১টি, চন্ডিহারা স্কুলসংলগ্ন ১টি, চকপাড়া মাদ্রাসাসংলগ্ন ১টি, মালাহার গ্রামের কাছে ১টি, মুরাদপুরে ১টি, ব্হিারপুরে ১টি, কাশিপুর ভায়া গুজিয়া রাস্তায় ১টি এবং রহবল বাজারের কাছে ১টি।

মহাসড়কের পাশে ঘর ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলা এসব চোরাই মাল ক্রয়কেন্দ্র ফাঁকা পড়ে থাকে দিনের বেলা। সন্ধ্যার পর ক্রেতা ও শ্রমিকরা জড়ো হতে থাকে। প্রতিটি ক্রয়কেন্দ্রে কাজ করেন ১০-১৫ জন শ্রমিক। পাথর ও কয়লাবোঝাই ট্রাক থামানোর সঙ্গে সঙ্গে তা নিয়ে যাওয়া হয় ক্রয়কেন্দ্রের পেছনে ফাঁকা জায়গায়। এরপর দ্রুত সময়ের মধ্যে চালক-হেলপারের চাহিদামতো মাল নামিয়ে নেয়া হয়। জ্বালানি তেল নামানোর জন্য বড় ড্রাম, জারিকেন ও অন্যান্য সরঞ্জাম রয়েছে। 

ট্রাকের চালকরা যাতে এসব ক্রয়কেন্দ্র সহজে চিনতে পারে সে জন্য রাতের বেলা মহাসড়কের কাছাকাছি ক্রয়কেন্দ্রের সামনে একটি বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালিয়ে রাখা হয়। বাতির নিচে থাকে কয়েকটি খালি ড্রাম। যেসব ট্রাকচালক মহাজনকে ফাঁকি দিয়ে মাল বিক্রি করে তারা ওই বৈদ্যুতিক বাতি দেখে সেখানে ট্রাক থামায়। 

চোরাই মালামালের ক্রেতা সেজে এসব অনৈতিক কাজে জড়িতদের সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিবেদক। তারা জানায়,  পুলিশি ঝামেলা এড়াতে মোকামতলা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র, শিবগঞ্জ থানা ও গোয়েন্দা পুলিশের সঙ্গে তাদের মাসোহারা বন্দোবস্ত রয়েছে। প্রতিটি ক্রয়কেন্দ্র থেকে মাসে মাসে টাকা দেয়া হয় পুলিশকে। ফলে চোরাই মাল কেনাবেচায় কোনো পুলিশি ঝামেলা হয় না।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শিবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদ মাহমুদ খান জানান, এসব বিষয় দেখার দায়িত্ব মূলত মোকামতলা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের। দোতলা ওই তদন্ত কেন্দ্রে একজন পুলিশ পরিদর্শকের নেতৃত্বে লোকবল রয়েছে। রয়েছে যানবাহন। 

তবে চোরাই মালামাল কেনাবেচার বিষয়টি জানতে পেরে মঙ্গলবার রাতে শিবগঞ্জ থানার পুলিশ অভিযান চালায় বলে জানান ওসি। তিনি বলেন, এ সময় বকুল নামের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসব অবৈধ কর্মকা- বন্ধ করতে শিবগঞ্জ থানার পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালাবে বলে জানান তিনি। 

চোরাকারবারিদের কাছ থেকে কোনো মাসোহারা গোয়েন্দা পুলিশ নেয় না বলে দাবি করে ওসি (গোয়েন্দা) আমিরুল ইসলাম বলেন, যদি কেউ নিয়ে থাকে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
(ঢাকাটাইমস/১০জুন/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত