অতি সাধারণ এক সাংবাদিকের কথা-২৮

আলম রায়হান
 | প্রকাশিত : ১১ জুন ২০১৭, ১৬:২০

মাসুদ কামালের পর অল্প সময়ের মধ্যে সংগ্রহ এবং প্রাপ্তির তালিকায় যুক্ত হয় শহিদুল আজম, জহিরুল আলম, শওকত আলী সাগর ও মোস্তফা কামাল। সে সময় সুগন্ধার মতো একটি সাধারণ সাপ্তাহিক পত্রিকাকে কেন্দ্র করে যে মাত্রার মেধাবী সম্মিলন ঘটানো সম্ভব হয়েছিল তা আজ কোনো একটি টেলিভিশনের পক্ষে করা কতটা সম্ভব সে বিষয়ে আমার যথেষ্ট সংশয় আছে।

শহিদুল আজমকে পেয়েছি অনেটা ঘটনাচক্রে। বহুমুখী গুণের অধিকারী শহিদুল আজম তখন ছিল সাপ্তাহিক সন্দ্বীপের রিপোর্টার। দৈনিক নবঅভিযান ও সুগন্ধায় চাকরি করা সত্ত্বেও সাপ্তাহিক সন্দ্বীপে লিখতাম পুরনো সম্পর্কের কারণে। যাকে খ্যাপ মারা বলে, যে অভ্যাস এখনো আমার আছে। সে সময় পত্রিকাটির সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন সালেম সুলেরী; মেধাবী এ সাংবাদিক এখন আমেরিকা প্রবাসী। একদিন দুপুরের দিকে লেখা দিতে গিয়ে দেখি, সম্পাদক নেই; পিয়নও কাউকে দেখলাম না। পুরো অফিসে আছে কেবল একটি ছেলে; খুবই মিষ্টি চেহারা। সম্পাদকের কথা জিজ্ঞেস করতেই মিষ্টি চেহারার স্মার্ট  ছেলেটি হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো, ‘আমি শহিদুল আজম।’আমার লেখাটা সম্পাদকের  টেবিলে রেখে বললাম, সুলেরী ভাই এলে একটু দেখাবেন। শহিদুল আজম বললেন, ‘এক কাজ করি; কম্পোজে পাঠিয়ে দিই, সুলেরী ভাই এসে দেখবেন।’

দোতলা দিয়ে নিচে নামতে নামতে ভাবলাম, ছেলেটা তো খুবই পজেটিভ! চেনা নেই, জানা নেই; এতোটা সাপোর্ট দিলো! আবার উপরে উঠলাম, নিচে ডেকে নিয়ে এলাম তাকে। সরাসরি জিজ্ঞেস করলাম, এখানে কত পান? সে একটা ফিগার বললো। আমি বললাম, ‘ডাবল দেবো, সুগন্ধায় যাবেন?’ পজেটিভ শহিদুল আজম তাৎক্ষণিকভাবে পজেটিভ উত্তর দিলো। আমি বললাম রিকসায় ওঠেন। শহিদুল আজম হলো সুগন্ধার দ্বিতীয় সংগ্রহ এবং দ্বিতীয় চিফ রিপোর্টার; মোজাম্মেল ভাইর টিমে চিফ রিপোর্টার ছিলাম আমি। শহিদুল আজম যে কত গুণের অধিকারী তা ভাবলে এখনো আমি অবাক হই। তার যোগ্যতাই তাকে নিয়ে গেছে পেশার বর্তমান অবস্থানে। সুগন্ধার পর বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকা হয়ে এখন সে এটিএন নিউজ- এর আউটপুট এডিটর হিসেবে কর্মরত।

সুগন্ধায় থাকাকালেই দেখেছি যেকোনো বিষয় সে অসাধারণ লেখা তৈরি করতে পারে। একটু ব্রিফ করলেই যেকোনো বিষয় লেখা তৈরি করা যেন তার বাম হাতের খেলা। আবার কার্টুনও আঁকতে পারে। তার এ গুণের ওপর ভরসা করে তাকে দিয়ে সুগন্ধার প্রচ্ছদ আঁকিয়েছি কয়েক মাস; পেশাদার শিল্পী কামাল পাশা চৌধুরী যুক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত। তার আঁকা প্রচ্ছদ চলনসই বলে চারুকলার ছাত্র কামাল পাশা চৌধুরীও সার্টিফাই করেছেন। তবে কনফিডেন্ট-এর ঘাটতির কারণে রং একটু অতিরিক্ত ব্যবহার করেছে। এটি কামাল পাশা চৌধুরীর মূল্যায়ন। তবে এটি আমার বা পাঠকদের চোখে তেমন ধরা পড়েনি। শহিদুল আজম এতোটাই মেধাবী। তবে মেধাবী শহিদুল আজম এবং আর এক মেধাবী মাসুদ কামালের মধ্যের সম্পর্কে এক পর্যায় শীতলতা সৃষ্টি হয়েছিল। যা আমাকে খানিটা শংকিত করে।

শহিদুল আজমের ধারণা ছিল, মাসুদ কামালকে আমি ফেবার করি। অথচ আমি তো জানি, ফেবার তো দূরের কথা, বরং শুরুতে প্রিন্টার্স লাইনে সহকারী সম্পাদক হিসেবে মাসুদ কামালের নামের আগে আবদুস সালামের নাম দিয়ে আমি ভুল করে এক রকম ডিসফেবারই করেছি। এক পর্যায়ে এ ত্রুটি থেকে উঠে আসা গেলেও মাসুদ কামাল ও শহিদুল আজমের সম্পর্কের  শীতলতা থেকেই গেল। আর ফেবার-ডিজফেবার করার অভিযোগের তীর ধরা থাকলো আমার দিকে। আমার স্ত্রীরও ধারণা ছিল, শহিদুল আজমের তুলনায় আমি মাসুদ কামালকে বেশি ফেবার করছি। কিন্তু কে কাকে বুঝাবে, আমার বিবেচনায় ভুল হতে পারে; ভুল হলে নিজেই কারেকশন করি। কিন্তু আনডিউ  ফেবার আমার একমাত্র সন্তানকেও করি না; যদিও তাকে আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি।

শহিদুল আজম এবং মাসুদ কামালের সম্পর্কের শীতলতা থেকে কোনো রকম তিক্ততা সৃষ্টি হয়েছে বলে কেউ শোনেনি; তখনো না, কখনো না। অবশ্য সেই সময় সুগন্ধায় কোনো রকম তিক্ততা সৃষ্টির সুযোগও ছিল না। এ বিষয়টি হ্যান্ডেল করার ক্ষেত্রে নিজেকে স্বৈরাচার ভাবতে ভালোবাসি! আমি নিশ্চিতভাবে মনে করি, কোনো টিমের মধ্যে তিক্ততা জমাট বাঁধলে তা ক্যানসার টিউমারের মতো দ্রুত সংক্রমিত হয় এবং সে প্রতিষ্ঠান এক পর্যায় ফোকলা হওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকে না। এটি বিশ্বাস করেই টিম লিডার হিসেবে এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র আপস করতাম না। অবশ্য কোনো বিষয়ে আপস না করার ক্ষেত্রে আমার একটি ক্ষতিকর প্রবণতা আছে। তবে কয়েক বছর ধরে কিছুটা আপস করার প্রবণতায় ঝুঁকেছি বলে মনে হচ্ছে। সরকারের মেধাবী কর্মকর্তা মামুনুর রহমান খলিলীর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে। তার বিবেচনায়, কখনো পিয়নের সঙ্গেও আপস করতে হয়! তার উপদেশ যর্থাথ বলে প্রমাণও পেয়েছি আমার জটিলতম চাকরিস্থল মাই টিভিতে। কিছুটা আপসপ্রবণ না হলে পরিবার প্রভাবিত এ প্রতিষ্ঠানে প্রধান বার্তা সম্পাদক হিসেবে দুই বছর কাটাতে পারতাম কি না তাতে যথেষ্ট সন্দেহ আছে আমার নিজেরই। যদিও আমার উকিল ছেলের মূল্যায়ন হচ্ছে, কোনোই আপস করিনি আমি; এ কারণে সে আমার ওপর কিছুটা বিরক্ত।

অকাল খড়ায় চাতক পাখির জন্য বৃষ্টির রহমতের মতোই পেয়েছিলাম সওগত আলী সাগর ও মোস্তফা কামালকে। খুঁজতে হয়নি, এক সন্ধ্যায় তারাই এসেছিল সুগন্ধা অফিসে এক সঙ্গে; মানিক জোরের মতো। নিয়ে এসেছিল কমদামি সিগারেট প্যাকেটের ছোট একটি কাগজে লেখা চিরকুট। বাংলাদেশ প্রতিদিনের আজকের সম্পাদক নঈম নিজামের এক বাক্যের লেখা, ‘দুই সাংবাদিক পাঠালাম, তাদের চাকরি দরকার।’ কোনো সম্বোধন ছিল না, ইতিও ছিল না।  আজকের সফল মিডিয়া ব্যক্তিত্ব নঈম নিজামকে ২৭ বছর আগে যতটা চিনেছি তাতেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, ফালতু কাউকে পাঠাবার লোক সে না। এ বিশ্বাসের ওপর ভরসা করে সওগাত আলী সাগর ও মোস্তফা কামালকে সুগন্ধায় নিয়ে নিলাম। বললাম পরদিনই কাজ শুরু করতে। নিজের বিবেচনা মতো একটি করে আইটেমও নিয়ে আসতে বললাম। পর দিন দুজন একত্রে এলো। তবে মোস্তফা কামাল আইটেম নিয়ে এলেও সাগর এলো খালি হাতে। পরে শুনেছি, আমার গ্রহণ করার ধরনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের মেধাবী ছাত্র সওগত আলী সাগরের ধারণা হয়েছিল, চাকরি হয়নি; কারণ এতো সহজে চাকরি হয় না! এ কারণে সে খালি হাতে এসেছিল। কিন্তু নানান জটিলতায় অল্প বয়সে অতি পোড় খাওয়া মোস্তফা কামাল এসেছিল লেখা নিয়েই। কারণ চাকরি হবার ব্যাপারে সে নিশ্চিত ছিল।

তারা দুইজন মানিকজোর হয়ে দীর্ঘ সময় সুগন্ধায় কাজ করেছে। শওকত আলী সাগর সুগন্ধা থেকে প্রথমে দৈনিক রূপালী হয়ে দৈনিক প্রথম আলোতে যুক্ত হয়; দীর্ঘ সময় প্রথম আলোর বাণিজ্য সম্পাদকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করার পর এখন সে কানাডা প্রবাসী। মোস্তফা কামাল এখন বাংলাভিশনের বার্তা সম্পাদক।  সহজাত মেধার ঘাটতি পূরণ করতে অসম্ভব পরিশ্রম করার রোল মডেল মোস্তফা কামাল। তাকে বাংলাভিশনে নিয়েছে মাসুদ কামাল, মাসুদ কামালকে নিয়েছিলাম আমি।

জহিরুল আলমকে আমার কাছে নিয়ে এসেছিল সিনেমা-নাটকের আজকের জনপ্রিয় নায়ক মাহফুজ। তখন সে কাজ করতো ইনকিলাব প্রুপের সাপ্তাহিক পূর্ণিমায়। এর আগে ছিল সাপ্তাহিক স্বদেশ খবর-এ। তখন তার সঙ্গে আমার পরিচয়। সাংবাদিক হিসেবে সে ছিল বেশ ডেসপারেট। স্বদেশ খবরের মতো একটি ৩২ পৃষ্ঠার সাধারণ সাপ্তাহিক পত্রিকার জন্য সে বিনা অ্যাপনমেন্টে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিল শহীদ মিনারে দাঁড় করিয়ে। অবশ্য এ ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু কন্যার স্বভাবজাত উদারতাও কাজ করেছে অনেকখানি।

এক সন্ধ্যায় জহিরুল আলমকে সঙ্গে করে এনে তার চাকরির প্রয়োজনের কথা জানালো মাহফুজ। যতটুকু মনে পড়ে, জহিরুল আলম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক অ্যাড অথবা ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনের ছাত্র ছিল তখন। জনবলের অভাব তখন কেটে গেলেও মেধাবী একজন ছাত্রকে নিতে আমার আপত্তি ছিল না। কিন্তু গোল বাঁধলো অন্যখানে। মাহফুজ নিজের পত্রিকায় না দিয়ে কেন সুগন্ধায় দিতে চাইলেন- এ প্রশ্ন উঠেছিলো সহকর্মীদের কারো কারো মৃদু আপত্তিতে। কিন্তু তিল না তাল গোছের কেন কি করা হয়নি- সেই বিতর্কে গিয়ে জহিরের মতো মেধাবী সাংবাদিককে হাতছাড়া করতে মন টানছিল না! আবার টিমের ওপর চাপিয়ে দিলেও তার ফল ভালো হয় না। এ অবস্থায় একটু নির্দোশ কৌশলে গেলাম। তাকে আসতে বললাম পরদিন। সে এলো। মাসুদ কামালকে বললাম এক কাজ করেন, এনবিআর-এর চেয়ারম্যানের ইন্টারভিউ আনতে বলেন; সে সময়ের বাস্তবতায় কুকুরের লেজ সোজা করার মতো কাজ! ধারণা ছিল, এ ছেলে এটা করতে পারবে না, আর মাহফুজের অনুরোধের ঢেকিও গিলতে হবে না। যেই কথা সেই কাছ। আমি বল ঠেলে দিলাম জহির ও টিম সদস্যদের কোটে। তখন দুপুর ছুই ছুই। ধারণা ছিল, জহির আর ফিরবে না। কিন্তু সে বিকেল নাগাদ ঠিকই ফিরলো, এনবিআর চেয়ারম্যানে সাক্ষাৎকারসহ। আমার কিছুটা সন্দেহ হলো। মাসুদ কামালকে জিজ্ঞেস করতে বললাম, ছবি এনেছে কি না? এ প্রশ্নে সঙ্গে সঙ্গে জহির পকেট থেকে ছবি বের করলো। এটা দেখে সকলেই টাস্কি খাবার অবস্থা। এবং দাপটের সঙ্গে সে যুক্ত হলো সুগন্ধা টিমে।

সুগন্ধায় থাকাকালে জহির অনেকগুলো মৌলিক রিপোর্ট করেছে; এর মধ্যে টুথপেস্টের প্রকৃত কার্যকারিতা প্রসঙ্গে তার রিপোর্ট ছিল খুবই আলোচিত। এ রিপোর্টের প্রতিক্রিয়ায় সুগন্ধা অফিসে অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করেছে মাফিয়া চক্র। এ জহিরুল আলম যখন এনটিভির দাপটের প্রধান বার্তা সম্পাদক, তখন আমি ছিলাম মাই টিভির নিয়ম রক্ষার প্রধান বার্তা সম্পাদক, বেরাকেটে  ভারপ্রাপ্ত। পরে অবশ্য ভারমুক্ত হয়েছি। তবে তা কেবল পদে, কাজের ক্ষেত্রে মাথার উপর জগদ্দল পাথরের মতো অদ্ভুত এক ভার চেপেছিল মাই টিভিতে আমার শেষ দিন, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭-এর খটখটে দুপুর ১টা পর্যন্ত।

লেখক: জেষ্ঠ্য সাংবাদিক; ইমেইল: alamraihan71@gmail.com

 

 

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত