প্রভাবশালীদের থাবায় পাহাড়

চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৬ জুন ২০১৭, ১৭:২৭ | প্রকাশিত : ১৬ জুন ২০১৭, ১৪:৫৭

চট্টগ্রাম মহানগরীর মতিঝর্ণার পাহাড়ে গত আট বছর ধরে বসবাস করছেন আরব আলী। তার বাড়ি হাতিয়া দ্বীপে। কাজের সন্ধানে পাঁচ বছর আগে চট্টগ্রামে আসেন তিনি। পরে পরিবার-পরিজনকেও নিয়ে আসেন তিনি।

মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে মতিঝর্ণার পাহাড়ে খুঁজে নেন আরব আলী। গ্যাস, বিদ্যুৎ বিলসহ মাসিক সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা ভাড়ায় পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে তোলা বাসায় থাকেন তিনি। ২০১৪ সালে পাহাড় ধসে তার ছোট মেয়ে নাজনিন আকতারকে হারান তিনি। একথা বলতেই চোখ মুছেন আরব আলী।

এরপরও মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে কেন এখানে থাকা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এর চেয়ে কম পয়সায় চট্টগ্রাম শহরের কোনো কলোনীতেও বাসা পাওয়া যায় না। তাই নিরুপায় হয়ে থাকি।’ বাসাগুলো কার জানতে চাইলে তিনি মুখ বন্ধ রাখেন। পরে তিনি বলেন, ‘পার্টির লোক ছাড়া তো পাহাড়ে বাসা করার ক্ষমতা কারো নাই। ক্ষমতা যাদের আছে তারাই বানাইছে।’

আরব যে বাড়িতে থাকেন, সেখানে আরও ১৭টি পরিবার আছে। তাদের সবাই চট্টগ্রামের বাইরের মানুষ। নিরুপায় হয়ে বসবাস করছেন সবাই।

বসবাসকারীরা জানান, মতিঝর্ণার পাহাড়ে কম করে হলেও ১০ হাজার পরিবার বসবাস করে। এ পাহাড় কেটে কাচা ঘরবাড়ি যেমন তৈরি করা হয়েছে তেমনি বহুতল ভবনও রয়েছে। এ পাহাড়ে সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলরের মালিকানাধীন ভবনও আছে।

এই মতিঝর্ণা পাহাড় গত দুই দশকে একাধিকবার বড় ধরণের পাহাড় ধসে ব্যাপক প্রাণহানীর ঘটনা ঘটেছে। তারপরও ঘরবাড়িগুলোর নিরাপত্তায় কোনো পদক্ষেপ নেই মালিকদের।

বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের চট্টগ্রাম মহানগরীর ঝুঁিকপূর্ণ বসতি পরিদর্শনে নগরীর লালখান বাজারের মতিঝর্ণা ও বাটালি হিলে যান। পাহাড়ে লাখো মানুষের বসতি দেখে তিনি বিস্মিত হন। এ সময় পাহাড়ে অবৈধ বসতি উচ্ছেদে রাজনৈতিক প্রভাবের কথা জানেন।

নগরীর বাইরে বিরাজ করছে আরও ভয়াবহ পরিস্থতি। বিশেষ করে রাঙ্গুনিয়া, রাউজান, হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, সাতকানিয়া, সীতাকু-, চন্দনাইশ, বোয়ালখালীসহ বেশিরভাগ উপজেলার পাহাড়ে ঝুঁিকপূর্ণ বসবাস করছে হাজার-হাজার মানুষ।

নগরীর পাহাড়গুলোর মতো স্থানীয় প্রভাবশালীরা পাহাড় দখল করে কেটে কেউ ঘরবাড়ি বানিয়ে ভাড়ায় টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। কেউ দখল হিসেবে মৌখিক চুক্তি এমনকি লিখিত চুক্তির মাধ্যমে লাখ টাকায় পাহাড়ি জমি বিক্রি করে দিয়েছে। আবার কেউ পাহাড়ের মাটি কেটে ইটভাটাগুলোতে সরবরাহ করছে।

কথা হয় ইসলামপুর ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের পেয়ারাবাগান পাহাড়ে হোসেন তালুকদারের সাথে। তিনি বছরে ১০ হাজার টাকা ভাড়ায় জায়গা নিয়ে ঘর তুলেছেন। মঙ্গলবার ভোরে পাহাড় ধসে তার ঘর মাটির নিচে চাপা পড়লেও ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান তিনি ও তার পরিবার। বুধবার দুপুরে আবার সে ঘর মেরামত করছিলেন। ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ে থাকা কেন জানতে চাইলে হোসেন বলেন, ‘কম টাকায় মাথা গোঁজার ঠাই পাইছি। বাড়ি ভাড়া করে থাকার সামর্থ্য তো আমার নাই।’

পেয়ারাবাগানসহ পাহাড়বেষ্টিত রাঙ্গুনিয়ায় পাহাড়ে জায়গা ভাড়া দিয়েছেন এলাকার প্রভাবশালীরা। দরিদ্র শ্রেণির মানুষ এখানে ঘর তুলে বসবাস করছে। একই পাহাড়ে প্রায় কয়েকশ পরিবারের বসবাস।

সেখানেও পাহাড়ের মাটি কেটে ইট ভাটায় সরবরাহ করা হয়। চট্টগ্রাম দক্ষিণ ও উত্তর বনবিভাগের সংরক্ষিত বনের ভেতর রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ইসলামপুর, উত্তর রাজানগর, দক্ষিণ রাজানগর, লালানগর, হোসনাবাদ, কোদালা, সরফভাটা, বেতাগি ও চন্দ্রঘোনা কদমতলি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ১৪৪টি ইটভাটা রয়েছে। যেখানে প্রতিনিয়ত পোড়ানো হচ্ছে সংরক্ষিত বনাঞ্চলসহ বিভিন্ন বনাঞ্চল উজাড় করে কেটে আনা কাঠ।

রাউজানের কদলপুর ইউনিয়নেও পাহাড় কেটে বিক্রি করা হচ্ছে মাটি, ভরাট করা হচ্ছে ফসলি জমি, পুকুর ও ডোবা।  

লোহাগাড়া, সাতকানিয়া ও চন্দনাইশ উপজেলার পাহাড় কেটে ও পাহাড়ের ছড়ায় বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ চলছে। তবে এ ব্যাপারে প্রশাসন কোনা ব্যবস্থাই নিচ্ছে না।

রাঙ্গুনিয়া উপজেলার এক ইউপি চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে স্থানীয় অনেকে পাহাড়ে বসতি গড়ে তুলেছেন। কিন্তু পাহাড়ের পাদদেশে বাস করা এতোটা ভয়ঙ্কর জেনেও বসবাসকারীরা কেন ভাড়া নেয়, তা তিনি বোঝেন না।

রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কামাল হোসেন বলেন, ‘আমরা আসলে পাহাড়ের পাদদেশে বাস করা লোকদের সচেতন করা ছাড়া আর কোনো কর্মকা-ে যেতে পারি না। মাঝে মাঝে স্থানীয় প্রতিনিধিদের ডেকে সতর্ক করে দেওয়া হয় যাতে পাহাড়ের পাদদেশে কেউ বসতি স্থাপন না করে। আর বনবিভাগকে সতর্ক করি পাহাড় থেকে গাছ কেটে যেন ইটভাটার মালিকরা নিয়ে যেতে না পারে। আসলে এলাকার প্রভাবশালীদের সাথে পারা যায় না।’

১০ বছর আগের সুপারিশের বাস্তবায়ন নেই

২০০৭ সালে চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে ১২৯ জনের প্রাণহানির ঘটনার পর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে একটি কমিটি ২৮টি কারণ নির্ধারণ করে ৩৬টি সুপারিশ প্রণয়ন করলেও তা আজো বাস্তবায়ন হয়নি।

কমিটির সিদ্ধান্তের মধ্যে ছিল, পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরতদের উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত রাখা, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়োজিত থাকা, পাহাড়ে কাঁটাতারের ঘের দেওয়া এবং সামাজিক বনায়নের আওতায় আনা, পাহাড়ের পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে হাউজিং প্রকল্প না করা, পাহাড়ি এলাকার ১০ কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা নিষিদ্ধ করা প্রভৃতি।

এছাড়া পাহাড় ধস এড়াতে এবং পাহাড় ব্যবস্থাপনায় সভায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। কিন্তু কমিটির বেশিরভাগ সিদ্ধান্ত এখনো কাগজে কলমেই রয়ে গেছে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জিল্লুর রহমান চৌধুরী ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য বসতি উচ্ছেদ জরুরি। কিন্তু বসতিদের সকালে উচ্ছেদ করলে বিকেলে আবার ফিরে আসে। গত কয়েক বছর উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে সেখানে গাছের চারা রোপন করলেও সেগুলো ধ্বংস করে পুনরায় ঘরবাড়ি নির্মাণ করেছে প্রভাবশালীরা। তবে এ ব্যাপারে এখন কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পরিকল্পণা নেওয়া হয়েছে।’   

এক দশকে যত পাহাড় ধস

২০০৭ সালের ১১ জুন নগরীর মতিঝর্ণায় পাহাড় ধসে ১২৭ জন, ২০০৮ সালের ১৮ আগস্ট ১১ জন, ২০০৯ ও ২০১০ সালে নগরীর পাহাড়তলী, সিআরবি, ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে মারা যান আরও ১৫ জন।

২০১১ সালের ১ জুলাই পাহাড় ধসে একই পরিবারের আট জনসহ বাটালি পাহাড়ের রিটেইনিং দেয়াল ১৭ জন, ২০১২ সালে ১৭ জুন নগরীর ফিরোজ শাহ কলোনিসহ বিভিন্ন এলাকায় ২৩ জন, ২০১৩ সালে পাহাড় ও দেয়াল ধসে ছয় জনের মৃত্যু হয়েছে।

সর্বশেষ গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামের দুটি এলাকা ও পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে কমপক্ষে ১৫৩ জন লোক প্রাণ হারায়।

ঢাকাটাইমস/১৬জুন/আইকে/ডব্লিউবি

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত