সুপ্রিম কোর্ট বার থেকে সরকারে যারা

মোসাদ্দেক বশির, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৮ জুন ২০১৭, ১২:৩৩ | প্রকাশিত : ১৮ জুন ২০১৭, ০৮:২৪

পাকিস্তান আমল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের কোনো না কোনো নেতা। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আইনজীবীদের এই সংগঠনের কেউ কেউ এমনকি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। তাদের প্রত্যেকেই আইন পেশার পাশাপাশি রাজনীতি ও সরকারেও সাফল্যের স্বাক্ষর রাখেন। এই সংগঠনের আরো অনেকে সরকারের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করলেও এই প্রতিবেদন রচনা করা হয়েছে কেবল সভাপতি ও সম্পাদকদের নিয়ে।

সরকারে দায়িত্ব যারা পালন করেছেন তাদের মধ্যে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, আবু সাদাত সায়েম ও আতাউর রহমান সরকারের সর্বোচ্চ পদে আসীন হয়েছিলেন। আর শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

পাকিস্তান আমলের শুরুতে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম সভাপতি ছিলেন শেরে বাংলা  এ কে ফজলুল হক। এরপর টানা আটবার সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। 

কে ফজলুল হক

বাংলাদেশের আইন পেশার অন্যতম পথিকৃৎ শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক একাধারে ছিলেন ঝানু রাজনীতিক। ১৯৩৭-৪৩ সাল পর্যন্ত অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, ১৯৫৫ সালে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ১৯৫৬-৫৮ সালে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ছিলেন শেরে বাংলা।

আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম

স্বাধীনতার পর প্রথম প্রধান বিচারপতি হিসেবে আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে নিয়োগ পান।

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ও ৬ নভেম্বরের সামরিক অভ্যুত্থানের পর বিচারপতি সায়েমকে দেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর তিনি জিয়াউর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল তিনি দুর্বল স্বাস্থ্যের কারণে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ছেড়ে দেন।

আতাউর রহমান খান

১৯৬৯-৭০ সালে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। তিনি যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে ১৯৫৪ সালে ধামরাই-সাভার নির্বাচনী এলাকা থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন। পরে পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী হন তিনি। আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম সহসভাপতি ছিলেন আতাউর রহমান খান। এরশাদের সামরিক শাসনের সময় ১৯৮৪ সালের ৩০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান তিনি।

মির্জা গোলাম হাফিজ

স্বাধীনতার পর ১৯৭৩-৭৪ সালে তিনি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ছিলেন। ১৯৭৮ সালে তিনি জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় ভূমি প্রশাসন মন্ত্রী হন। ১৯৭৯ সালে বিএনপি থেকে তিনি জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এ সংসদে তিনি স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তিনি পুনরায় জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় আইন ও বিচারমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

. কামাল হোসেন

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অন্যতম সহচর কামাল হোসেন ১৯৭২ সালে আইনমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

পরে অবশ্য আওয়ামী লীগের রাজনীতি ছেড়ে নিজেই গণফোরাম নামের রাজনৈতিক দল গঠন করেন। বর্তমানে তিনি গণফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। তিনি ১৯৯০-৯১ মেয়াদে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ছিলেন।

বিচারপতি টি এইচ খান

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির দুই মেয়াদে সভাপতি দেশের প্রবীণতম আইনজীবী বিচারপতি টি এইচ খান ১৯৮১ সালের ১৫ নভেম্বর আইন, শিক্ষা, ধর্ম, ভূমি ও রাজস্ব এবং ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

১৯৭৪ সালে প্রথমবারের মতো সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। এরপর  ১৯৯৫-৯৬ সেশনে দ্বিতীয় মেয়াদে সভাপতি নির্বাচিত হন।

এম আমীর-উল ইসলাম

বাংলাদেশ সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম সদস্য এম আমীর-উল ইসলাম যুদ্ধকালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহামদের প্রধান সহায়ক ও উপদেষ্টা হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশেষ দূত হিসেবে বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন। ১৯৭৩ সালে কুষ্টিয়া-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং বঙ্গবন্ধুর সরকারের খাদ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেন তিনি।

শফিক আহমেদ

আওয়ামী লীগের গত মেয়াদের আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ছিলেন দুবার। ২০০৯ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে টেনোক্র্যাট কোটায় তাকে আইনমন্ত্রী হিসেব নিয়োগ দেন। দেশের এই জ্যেষ্ঠতম আইনজীবী ১৯৯৯-২০০০ ও ২০০৮-০৮ সালে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন ।

নাজমুল হুদা

১৯৯৭-৯৮ সালে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবে এই সভাপতি দুই মেয়াদে মন্ত্রী ছিলেন। ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর প্রথম স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বিএনপি চেয়ারপারসন তাকে যোগাযোগমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন। এর আগে বিএনপি ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর ওই সরকারের তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান নাজমুল হুদা।

গণমাধ্যমে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ‘রূপরেখা' দিয়ে মন্ত্রিত্ব হারান তিনি। ২০১০ সালে সংগঠনবিরোধী বক্তব্য দেয়ার অভিযোগে বিএনপি থেকে বহিষ্কার হন। দলের চেয়ারপার্সনের কাছে ‘দুঃখ প্রকাশ' করে দলে ফেরার এক বছরের মাথায় ২০১২ সালে তিনি বিএনপি থেকে পদত্যাগ করেন।

নুরুল হক চৌধুরী

নুরুল হক চৌধুরী সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির দুই মেয়াদে ১৯৫৬-৫৭ ও ১৯৫৭-৫৮ সালে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এ কে ফজলুল হকের পর তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন।

নুরুল হক চৌধুরী ১৯৫৫ সালে যুক্তফ্রন্টের টিকিটে গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং পাকিস্তান কেন্দ্রীয় কোয়ালিশন মন্ত্রিসভায় স্থান পান। তিনি পূর্ত, শ্রম ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মন্ত্রী থাকাকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে গোপন টেইপ কেইজের সন্ধান লাভ করে পুরো পাকিস্তানে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। তিনি কিছুদিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।

সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ

সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ ১৯৮৯-৯০ সালে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ছিলেন। ১৯৯৬ সালে তিনি অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালে ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন।

মইনুল হোসেন

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির ২০০০-০১ মেয়াদের সভাপতি মইনুল হোসেন ড. ফখরুদ্দীন আহমদের তত্ত্ববধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি তথ্য, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন।

(ঢাকাটাইমস/১৮জুন/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত