রামপাল নিয়ে ইউনেস্কো আসলে কী বলেছে?

কাওসার শাকিল, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৭ জুলাই ২০১৭, ২০:১০ | প্রকাশিত : ০৭ জুলাই ২০১৭, ১৭:৩৭

বাগেরহাটের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে চার বছর ধরে চলা বিতর্কে নতুন মাত্রা এনেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি। মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে আপত্তি থেকে সরে এসেছে জাতিসংঘের সংস্থাটি। তবে বিরোধীরা এখনও মানতে নারাজ। তাদের দাবি, এই কেন্দ্র সুন্দরবনের ক্ষতি করবে-এই সিদ্ধান্ত থেকে সরার কোনো কারণ নেই।

তবে ইউনেস্কোর এই সিদ্ধান্তে আসার খবরে সরকারের মধ্যে আপাত স্বস্তি। যদিও খবরটি জেনেছে সরকারের পক্ষ থেকে। এখন পর্যন্ত ইউনেস্কোর কোনো বিজ্ঞপ্তি আসেনি। তবে সংস্থাটি ১৯৯ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যার মধ্যে চার পাতায় সুন্দরবনের কথা বলা আছে। এখানেই রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রসঙ্গ এসেছে।

এই প্রতিবেদনে অবশ্য ইউনেস্কোর সরাসরি কোনো অবস্থান নেয়ার কথা বলা নেই। একদিকে তারা বলেছে, ২০১৬ সালে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে তাদের প্রতিবেদনে যেসব সুপারিশ ছিল, সেগুলো ২০১৮ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে হবে। যদি না করা হয়, তাহলে ওই বছর ওয়ার্ল্ড হ্যারিজেট কমিটির ৪২ তম অধিবেশনে সুন্দরবনকে বিপন্ন বিশ্ব ঐহিত্যের তালিকায় তোলার প্রস্তাব দেয়া হতে পারে।

অন্যদিকে রামপাল বিষয়ে সংস্থাটি যেসব সুপারিশ দিয়েছিল, তার কিছু অংশ এর মধ্যেই বাস্তবায়ন করায় সরকারকে স্বাগতও জানিয়েছে ইউনেস্কো।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার বিজ্ঞপ্তিতে কোনো শর্তের কথা না বললেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ শুক্রবার সাংবাদিকদেরকে জানিয়েছেন, কিছু শর্তে ইউনেস্কো রামপাল নিয়ে আপত্তি তুলে নিয়েছে। আর এই শর্তগুলো সরকার মেনে নিয়েছে। ফলে এখন রামপালের কাজ চলবে স্বাভাবিক গতিতে।

ইউনেস্কোর প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে

এই প্রতিবেদনে সুন্দরবনকে বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় লিপিবদ্ধ হবার হাত থেকে বাঁচাতে কী কী সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিতে হবে সেকথা বলা হয়েছে। রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র করলে এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষকে যে যে বিষয়ের নিষ্পত্তি করতে হবে তা জরুরি ভিত্তিতে সম্পন্ন করার তাগাদাও দেয়া হয়েছে প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনটিতে অরিয়ন পাওয়ার প্লান্টকে সরকারপক্ষের অনুমোদন না দেয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে ইউনেস্কো। একইসঙ্গে রামপালে বিদ্যুৎ প্রকল্পের দ্বিতীয় ইউনিটটি বাতিল করার সিদ্ধান্তকেও স্বাগত জানায় জাতিসংঘের সংস্থাটি।

ইউনেস্কো বলছে- “রাষ্ট্রপক্ষ ওরিয়ন পাওয়ার প্লান্টকে অনুমোদন না দেয়া, দ্বিতীয় ইউনিট করার উদ্যোগ না নেয়াকে স্বাগত জানাচ্ছে ইউনেস্কো। ২০১৬ সালে ইউনেস্কোর রিঅ্যাক্টিভ মনিটরিং মিশনের এ দুটি সুপারিশকে গ্রহণ করায় রাষ্ট্রপক্ষকে স্বাগত জানাই। সেই সাথে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য একটি এসইএ (SEA-পরিবেশের টেকসই মূল্যায়ন) চালানোর আহ্বান জানাচ্ছি। সাথে সাথে রাষ্ট্রপক্ষকে এটাও সুপারিশ করা হচ্ছে তারা যেন এসইএ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বড় আকারের অবকাঠামোগত (রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ) কিংবা শিল্প স্থাপনার অনুমোদন না দেয়া হয়।”

২০১৬ সালের অক্টোবরে সরকারকে ইউনেস্কোর দেয়া প্রতিবেদনে পশুর নদী খননের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় মানার কথা বলা হয়েছিল। সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় নাখোশ হয়েছে সংস্থাটি। তাই পশুর নদীতে খনন কাজ চালাবার আগে পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ক সংস্থা আইইউসিএন এর পরামর্শ নিয়ে ইআইএ (EIA-পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন) প্রতিবেদন নিয়ে নেবার সুপারিশ করেছে ইউনেস্কো।

শেষ পর্যায়ে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে- ‘পরিশেষে, রাষ্ট্রপক্ষকে কমিটির পক্ষ থেকে জরুরি ভিত্তিতে মিশনের সকল সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য সুপারিশ করা হচ্ছে। যদিও এই বিশ্ব ঐতিহ্যের সম্পদটিকে বিপন্ন দাবি করার মতন অবস্থায় আসেনি, তদুপরি মিশনের পরামর্শ অনুযায়ী স্বাদু পানির প্রবাহ এবং এ অঞ্চলে বড় মাপের স্থাপনা তৈরির ক্ষেত্রে মিশনের সুপারিশগুলো অনুসরণ করলে এ সম্পদের অপূরনীয় ক্ষতি রোধ করা যাবে। তবে সুপারিশ করা হচ্ছে যদি মিশনের সুপারিশ করা বিষয়গুলোতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা না যায় তাহলে ৪২ তম অধিবেশনে সুন্দরবনকে বিপন্ন বিশ্বঐতিহ্যের তালিকায় তোলার কথা বিবেচনা করা যেতে পারে।’

অর্থাৎ ২০১৮ সালে হতে যাওয়া ৪২ তম অধিবেশনে বিপন্ন বিশ্বঐতিহ্যের তালিকায় সুন্দরবনের নাম ইউনেস্কোর সুপারিশ করবে কি করবে না তা নির্ভর করছে তখনকার সুন্দরবনসহ বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের পরিবেশগত মূল্যায়নের ফলাফলের উপর।

সুন্দরবন থেকে ১৪ কিলোমিটার দুরে রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র করার উদ্যোগ নিলে পরিবেশগতভাবে সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে না বলে দাবি করছে সরকার।

তবে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরোধিতা করে আসছে পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠন এবং রাজনৈতিক দল। তারই প্রেক্ষিতে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনার তুঙ্গে উঠে আসে ইউনেস্কোর প্রতিবেদনটি।

ইউনেস্কো ২০১৬ সালে রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র করার বিপক্ষে মত দেয়। সাম্প্রতিক সময়ে তাদের প্রকাশিত প্রতিবেদন নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, ইউনেস্কো তাদের আপত্তি তুলে নিয়েছে।

২০১৩ সালে সুন্দরবনের অদূরে বাগেরহাটের রামপালে কয়লাভিত্তিক এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ২০১৯ সালের মধ্যে উৎপাদনে আসার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।

এই বিদ্যুৎ প্রকল্পে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে জানিয়ে এখান থেকে সহনীয় মাত্রার বেশি দূষণ হবে না বলে নিশ্চিত করেছে সরকার। সেই সঙ্গে কয়লা পরিবহন করার সময় যেন তা ছড়িয়ে না যায়, পাশাপাশি উচ্চ শব্দ ও আলো প্রতিরোধী ব্যবস্থাও থাকবে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে।

ঢাকাটাইমস/০৭জুলাই/কেএস/ডব্লিউবি

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত