যৌথ প্রযোজনার পক্ষে-বিপক্ষে: পর্ব-৫

হঠাৎ বৃষ্টির আগে এবং পরে

তায়েব মিল্লাত হোসেন
 | প্রকাশিত : ১৫ জুলাই ২০১৭, ০৮:১৭

ভারতীয় উপমহাদেশে চলচ্চিত্র নির্মাণের যে সূচনাপর্ব তাতে সোনার হরফেই লেখা আছে বাঙালির নাম। ঢাকার পাশে মানিকগঞ্জের ছেলে হীরালাল সেন (১৮৬৬-১৯১৭) ভারতে প্রথম নির্বাক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। তার হাত ধরেই যাত্রা করে উপমহাদেশের প্রথম বিজ্ঞাপনচিত্র। এই রকম তথ্য দিচ্ছে বাংলাপিডিয়া। সেই হিসেবেই ভারতীয় উপমহাদেশে চলচ্চিত্রের বিকাশে গৌরবের যে ইতিহাস আছে তার ভাগীদার বাংলাদেশও।

তবে আজকের বাংলাদেশ এই দিক দিয়ে ভারতের চেয়ে অনেক অনেক পিছিয়ে আছে। হালে বিশ্বজুড়ে মুক্তি পায় বলিউডের সিনেমা। আর ঢালিউডের ছবির বাজার আরো সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এই শতকের প্রায় দেড় যুগে দেশে হলের সংখ্যা কমতে কমতে তিন ভাগের এক ভাগ বা তারও কমে গিয়ে ঠেকেছে। এর কারণ হলমালিকদের আরো মুনাফার দিকে যাত্রা। কারণ সিনেমা ব্যবসায় তারা মন্দার আভাস পেতেই অন্যদিকে চোখ রাখেন। বাজারের এই নিম্নগামীতার পেছনে আবার ভালো ছবির অভাব, তারকা-ঘাটতিকে সামনে রাখেন বোদ্ধারা।

হালে দর্শক টানতে হলমালিক, প্রদর্শক, বুকিং এজেন্টরা ভরসা রাখতে চান ওপার বাংলার ছবিতে। কারণ ছোটপর্দার অভিজ্ঞতায় তারা দেখেছেন মুম্বাইয়ের পাশাপাশি কলকাতার সিনে তারকাদেরও এই দেশে বাজার আছে। দেব, জিৎ, সোহমের জন্যে অনেক তন্বী পাগলপারা। সঙ্গে যদি ঢাকাই শাকিব থাকেন। তাহলে তো কথাই নেই। ছবি হিট, সুপারহিট না হয়ে আর যায় কই!

দুই বাংলার রসায়ন থাকলে আম-দর্শকরা দারুণভাবে নিচ্ছে কাহিনিচিত্র। এই সুযোগেই যৌথ প্রযোজনা তার সব রং-রূপ-রস নিয়ে সিনেমার দোকানে হাজির হয়েছে। এতে কেউ কেউ মুনাফার মুখ দেখছে। কিন্তু ক্ষতির মুখে যারা, তারা তো আর চুপ করে বসে থাকতে পারেন না। তাই যৌথ প্রযোজনার বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছেন। বাধ্য হয়ে আমাদের সরকার যৌথ উদ্যোগে আপাতত লাগাম টেনে ধরেছে। যৌথ প্রযোজনার বিপক্ষ শক্তি তাই কিছুটা নির্ভার।

অথচ ভারত ও বাংলাদেশ তথা দুই বাংলার যৌথ নির্মাণের পর্ব শুরু সেই ১৯৭৩ সালে। তখন শর্তের অতো বেড়াজাল ছিল না। চিত্রনির্মাতা আলমগীর কবিরের পরিচালনায় ‘ধীরে বহে মেঘনা’ ছিল প্রথম প্রয়াস। সেই বছরেই আশীর্বাদ চলচ্চিত্র প্রযোজনা করে ঋত্বিক ঘটকের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। যৌথ রসায়নে শুধুই ভারত নয়; ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও কানাডার সম্মিলিত উদ্যোগে ববিতা অভিনীত ‘দূরদেশ’ আসে প্রেক্ষাগৃহে। এরপর আমরা দেখি কিছুটা বিরতি পর্ব।

১৯৮৬ সালে আমাদের সরকার যৌথ উদ্যোগে কিছু শর্তের বিষয় যুক্ত করে। এর মাধ্যমেই মূলত যৌথ ছবি নির্মাণ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। আসে নীতিমালা। ২০১২ সালে এক্ষেত্রে নতুন নিয়ম করা হয়। তার আগে-পড়ে বেশকিছু চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। এর কোনোটি আলোচিত হয়। কোনোটি থাকে অনালোচিত। আছে বাণিজ্যিক সিনেমা। আবার আছে ধ্রুপদী ধারায় নির্মিত কাহিনিচিত্রও।

তবে বাণিজ্য, ধ্রুপদ, বড়পর্দা, ছোটপর্দা- সব ধারার দর্শকদের কাছে এখন পর্যন্ত যে ছায়াছবি সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে তা হচ্ছে, ভারতের চলচ্চিত্রকার বাসু চ্যাটার্জির ‘হঠাৎ বৃষ্টি’। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ প্রযোজনার এই কাহিনিচিত্র নির্মিত হয়। ছবির নায়ক ছিলেন বাংলাদেশের ফেরদৌস। আর নায়িকা ভারতের প্রিয়াঙ্কা ত্রিবেদী। এই ছবির গানগুলো এখনো মুখে মুখে ফেরে।

আকাশের পাখির মতোই আসলে সীমানা মানে না গান-কবিতা-নাটক। এক্ষেত্রে চলচ্চিত্র কিন্তু আরো শক্তিশালী মাধ্যম। মানুষের মন যা টানে, তা থেকে তাকে নিবৃত করে রাখতে পারে না কাঁটাতার। তাই যুথবুদ্ধ সিনেমা থাকে তো থাকুক। কিন্তু আমাদের ঢাকা থেকেও এমন চলচ্চিত্র চাই, যা শুধু ওপার বাংলা বা ভারত নয়, পৃথিবীজুড়েই আলোচিত-আলোড়িত হবে। জানি, এটা আজকের বাস্তবতায় অনেকটাই উচ্চাভিলাষ। কিন্তু স্বপ্ন যদি দেখতেই হয়, তবে বড় স্বপ্ন দেখাই উত্তম- আপনারা কী বলেন?

তায়েব মিল্লাত হোসেন: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

আসছে...পর্ব-৬: ঢালিউডে বিভাজন কেন?

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিনোদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত