তাঁরাও ইউএনও: পর্ব-১

শিশুদের মাঝে ছড়িয়ে দিলেন বঙ্গবন্ধুর আলো

তায়েব মিল্লাত হোসেন ও মহিউদ্দিন মাহী, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০১৭, ১১:৩৩ | প্রকাশিত : ০৯ আগস্ট ২০১৭, ১১:২৭

তৃণমূলে সরকারি সেবা নিশ্চিতের কাজ করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ―ইউএনও। সেই দায়িত্বে সবাই কী সাফল্য পান? সবাই আসলে পান না। কেউ কেউ পান। এমন ইউএনও যারা, তাদের নিয়েই ঢাকাটাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকমের বিশেষ আয়োজন। প্রথম পর্বে থাকছে এই সময়ে আলোচিত বরগুনা সদরে দায়িত্ব পালন করা ইউএনও গাজী তারিক সালমনের ইতিবাচক কাজের নানান দিক।

এক আওয়ামী লীগ নেতার মামলায় বরিশালের আদালতে নাজেহাল হওয়ার ঘটনায় আলোচিত ইউএনও গাজী তারিক সালমনকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব হিসেবে বদলি করেছে সরকার।

বরগুনা সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) দায়িত্ব পালন করে আসা এই কর্মকর্তাকে বদলি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সোমবার আদেশ জারি করে।

তারিক সালমন বরিশালের আগৈলঝাড়ার ইউএনও থাকাকালে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রে ‘বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকৃত করে ছাপিয়েছিলেন’ অভিযোগ করে বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক ওবায়েদ উল্লাহ সাজু গত ৭ জুন মামলা করেন।
ওই মামলায় গত ১৯ জুলাই দুই ঘণ্টা হাজতবাসের পর জামিন পান তারিক সালমন। সে সময় আদালত প্রাঙ্গণে তাকে পুলিশের ধরে নেওয়ার ছবি প্রকাশ হলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র সমালোচনা হয়।

আগৈলঝাড়া উপজেলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিবস ও জাতীয় শিশুদিবস-২০১৭ উপলক্ষে আয়োজিত চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় প্রথম ও দ্বিতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত দুই শিশুর আঁকা দুটি ছবি ব্যবহার করে স্বাধীনতা দিবসের আমন্ত্রণপত্রটি তৈরি করিয়েছিলেন তারিক সালমন।
তাকে নাজেহালের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিস্মিত হয়েছেন জানিয়ে তার উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম বলেছিলেন, ওই ছবিতে বিকৃত করার মতো কিছু তারা দেখেননি বরং এটি একটি ‘সুন্দর কাজ’।

সমালোচনা আর ক্ষোভের মধ্যে ২১ জুলাই ওবায়েদ উল্লাহ সাজুকে দল থেকে সাময়িক বহিষ্কার করে আওয়ামী লীগ। তারিক সালমনকে নাজেহালের দিন বরিশালের আদালতে দায়িত্বরত পুলিশের ছয় সদস্যকেও সরিয়ে দেওয়া হয়।

এর দুই দিন পর মামলা প্রত্যাহার করে নিয়ে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ওবায়েদ উল্লাহ সাজু বলেন, বঙ্গবন্ধুর ছবিটি যে শিশুর আঁকা-তা তার জানা ছিল না।

ওই ঘটনার ধারাবাহিকতায় বরিশালের জেলা প্রশাসক গাজী মো. সাইফুজ্জামান এবং বরগুনার জেলা প্রশাসক বশিরুল আলমকেও প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ফেরত নেওয়া হয়। পাশাপাশি বরিশালের মুখ্য মহানগর হাকিমকে বদলির জন্য সরকারের তরফ থেকে সুপ্রিম কোর্টে প্রস্তাব পাঠানো হয়।

জানা গেছে, গাজী তারিক সালমন আগৈলঝাড়ায় ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে গত ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবসে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষে ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’ শিরোনামে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও উন্মুক্ত রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয় আগৈলঝাড়ার এসএম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় প্রথম ও দ্বিতীয় পুরস্কারের জন্য দুই শিশুর হাতে পুরস্কার তুলে দেন উপজেলা চেয়ারম্যান ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা গোলাম মোর্তজা খান। পুরস্কার পাওয়া দুটি ছবির মধ্যে একটি ব্যবহার করা হয় আমন্ত্রণপত্রে। সেটি নিয়েই বরিশাল আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক ও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সৈয়দ ওবায়েদ উল্লাহ সাজু ইউএনও গাজী তারিক সালমনের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকৃতির অভিযোগে মামলা করেন।

দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও সাধারণ নাগরিকরা বলছে, মানুষের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকশিত করতে হলে শিশুদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ তুলে ধরতে হবে। এ জন্য চিত্রাঙ্কন, লেখালেখি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পাঠসহ সাংস্কৃতিক আয়োজন দরকার। ইউএনও গাজী তারিক সালমন যা করেছেন তা খুবই ইতিবাচক। শিশুদের মধ্যে এ ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকা- আরো বেশি হওয়া উচিত বলেও তারা মত দেয়।

জানা গেছে, ইউএনও গাজী তারিক সালমনের বিরুদ্ধে মামলার নেপথ্যে রয়েছে সৈয়দ ওবায়েদ উল্লাহ সাজুর ব্যক্তিগত রোষ। তারিক সালমন আগৈলঝাড়ায় ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এতে বহু ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তালিকা থেকে বাদ পড়েন। নকল প্রতিরোধেও তিনি ছিলেন সোচ্চার। টেস্ট রিলিফ (টিআর) ও কাজের বিনিময় খাদ্য (কাবিখা) কর্মসূচিতে বেশ কিছু অনিয়মের বিষয়ে ছিলেন কঠোর। এসব নিয়ে সেখানকার বহু লোকের সঙ্গে দ্বন্দে জড়িয়ে পড়েছিলেন তারিক সালমন। সে কারণেই তাঁর বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ওই মামলা করেন আওয়ামী লীগ নেতা ওবায়েদ উল্লাহ সাজু।

এ বিষয়ে গাজী তারিক সালমন বলেছিলেন, ‘এর আগে আমি যেখানে কর্মরত ছিলাম। সেখানে চেষ্টা করেছি আমার ওপর অর্পিত সরকারি দায়িত্ব পালন করতে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের বেশ কিছু অভিযান চালিয়েছি। টিআর, কাবিখা প্রকল্পের কাজ কঠোরভাবে তদারকি করায় আমাকে কয়েকজন জনপ্রতিনিধির রোষানলে পড়তে হয়। তারা আমার কোনো দুর্নীতি খুঁজে না পাওয়ায় এখন মামলা দিয়ে হয়রানি করছে।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের সাবেক শিক্ষার্থী গাজী তারিক সালমন কবিতা লেখেন। লেখালেখির অভ্যাস ছাত্রজীবন থেকেই। ২০১৬ সালে একুশের বইমেলায় ‘সহজ প্রেমের কবিতা’ নামে তাঁর একটি কাব্যগ্রন্থও বেরিয়েছে।

# আগামীকাল দ্বিতীয় পর্বে থাকছে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের ইউএনও ইসরাত সাদমীনকে নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন: টেকসই উন্নয়নে ঠেকিয়ে দিচ্ছেন বাল্যবিয়ে

ঢাকাটাইমস/০৯আগস্ট/টিএমএইচ

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত