তাঁরাও ইউএনও: পর্ব-২

ঠেকিয়ে দিচ্ছেন বাল্যবিয়ে

তায়েব মিল্লাত হোসেন ও মহিউদ্দিন মাহী
 | প্রকাশিত : ১০ আগস্ট ২০১৭, ০৭:৫৯

তৃণমূলে সরকারি সেবা নিশ্চিতের কাজ করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ―ইউএনও। সেই দায়িত্বে সবাই কী সাফল্য পান? সবাই আসলে পান না। কেউ কেউ পান। এমন ইউএনও যারা, তাদের নিয়েই ঢাকাটাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকমের বিশেষ আয়োজন। দ্বিতীয় পর্বে থাকছে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের ইউএনও ইসরাত সাদমীনের কার্যক্রম নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন।

রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে দিনরাত কাজ করে চলেছেন টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের ইউএনও ইসরাত সাদমীন। সরকারের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ১৪টি বিষয় সামনে রেখে এ উপজেলার সব জায়গায় ছুটে চলেছেন। এখানে আসার পর আর দাপ্তরিক কাজে সীমাবদ্ধ থাকেননি সাদমীন। তিনি অনেকটা সমাজকর্মীর মতোই সক্রিয়। নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, স্কুল, কলেজ ও মাদরাসা পরিদর্শন, উঠান বৈঠক, মাদকবিরোধী অভিযান, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধসহ বিভিন্ন সামাজিক কাজে নিরলসভাবে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন।

এসডিজির নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়টি তার কাছে সর্বাধিক গুরত্ব পাচ্ছে। তিনি যখন কোনো স্কুল-কলেজ পরিদর্শনে যাচ্ছেন তখন মেয়েদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কথা বলছেন। তাদের সমস্যার তাৎক্ষণিক পরামর্শ দিচ্ছেন। বিপদে-আপদে যোগাযোগ করতে ইউএনও নিজের মুঠোফোন নম্বর পর্যন্ত মেয়েদের দিচ্ছেন। অনেকে তাকে ফোনও দিচ্ছেন। মির্জাপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী উপজেলার মহড়া ইউনিয়নের মীম আক্তার গত ১০ জুলাই সাদমীনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করেন। মীমকে কম বয়সে বিয়ে দেয়া হচ্ছে, এমন বার্তা পান তিনি। ১১ জুলাই এই বাল্যবিয়ে ঠেকিয়ে দেন ইসরাত সাদমীন। এ করেই দায়িত্ব শেষ করেননি। মীমকে প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্বও নেন। তার মাকে একটি সেলাই মেশিনও দেন। আরো বেশ কয়েকটি বাল্যবিয়ে ঠেকিয়ে দিয়েছেন ইসরাত সাদমীন। কম বয়সের বিয়ের কুফল সম্পর্কে প্রচারণাও চালাচ্ছেন তিনি। তাঁর মতে, আইনি ব্যবস্থার চেয়ে মানুষকে বুঝিয়েই বেশি সুফল মিলছে। এতে সচেতন হচ্ছে অনেকেই। এখন পর্যন্ত প্রায় ২৫টি বাল্যবিয়ে ঠেকিয়ে দিয়েছেন। এর অনেকক্ষেত্রেই ছুটে গিয়েছেন ইউএনও নিজে।

এলাকার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে যাতে মেয়েরা সহজে তাদের সমস্যার কথা প্রশাসনকে জানাতে পারে এজন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিসে ‘কন্যা সাহসিকা’ নামে একটি সেল খোলা হয়েছে। বাল্যবিয়ের কুফল স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুরো উপজেলায় এ বিষয়ক বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হচ্ছে। এছাড়া উপজেলার বিভিন্ন মসজিদের ইমাম ও কাজীদের নিয়ে প্রশিক্ষণ কর্মশালারও আয়োজনও করা হচ্ছে। ইউএনও ইসরাত সাদমীন সপ্তাহের ২-৩ দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজে শ্রেণি পাঠদানের সময়ে আচমকা গিয়ে হাজির হচ্ছেন। তিনি শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করেন। এই সময় সঠিক উত্তরদাতারা পান বিশেষ পুরস্কার।

ইসরাত সাদমীন মির্জাপুরকে নতুনভাবে সাজাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছেন। বজ্রপাত থেকে মির্জাপুরবাসীকে রক্ষায় উপজেলার সর্বত্র তালগাছ রোপণের উদ্যোগ নিয়েছেন। এছাড়া উপজেলার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ, দর্শনীয় স্থান ও আলোকিত ব্যক্তিদের নিয়ে ‘প্রেয়শী মির্জাপুর’ নামে একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করার কাজও শুরু করেছেন। এছাড়া ১৯ জুলাই উপজেলার ১৭০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একযোগে পরিচ্ছন্নতা ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করেছেন। ইসরাত সাদমীনের উদ্যোগে প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কিশোরীদের নিয়ে সচেতনতামূলক কর্মশালার আয়োজন করেন। পরে তিনি তাদের মধ্যে স্যানেটারি ন্যাপকিন বিতরণ করেন।

উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নে ‘সবাই মিলে তৃণমূলে জনগণের দোরগোড়ায়’ সেবা পৌঁছে দেয়ার জন্য জনসম্মুখে সভা অব্যাহত রেখেছেন। এছাড়া উপজেলার বিভিন্ন হাটে নারীদের জন্য ‘নারী অঙ্গন’ নামে ঘর নির্মাণ ও ‘মৈত্রী খেয়া’ নামে উপজেলা চত্বরে লেডিস ক্লাব নির্মাণ করেছেন। ‘সড়ক দুর্ঘটনারোধ করি নিরাপদে ঘরে/ কাজে ফিরি’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে ইউএনওর উদ্যোগে মির্জাপুর বাইপাস বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ক্যাম্পিং করে চালকদের গোলাপ ফুল, টি-শার্ট, ফাস্ট এইড বক্স বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় চালকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করেন তিনি। ইসরাত সাদমীন তার অফিসে ‘বেদনা তাড়–য়া’ নামে অবহেলিত বাবা-মাকে সহায়তা প্রদান ও মানবসম্পদ উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ সমন্বয় সেল চালু করেছেন। মির্জাপুরের বিভিন্ন বিদ্যালয় পরিদর্শন শেষে মেধাবী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘রোদ বৃষ্টিতে ভয় নাই সময় মতো স্কুলে যাই’ স্লোগান সংবলিত ছাতা ও বুদ্ধিমত্তা উৎসাহ স্মারক তুলে দিয়েছেন।

উপজেলার বিনোদনপিয়াসীদের জন্য কোনো বিনোদন পার্ক না থাকায় নির্বাহী কর্মকর্তা বিনোদন পার্ক নির্মাণ, স্কাউট ও শিল্পকলাকে গতিশীল করা, হিজড়া, প্রতিবন্ধী ও অসহায় দুস্থ মানুষদের নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। এছাড়া পথ লাইব্রেরি ও স্থায়ী লাইব্রেরি নির্মাণের পরিকল্পনাও গ্রহণ করছেন।

# আগামীকাল তৃতীয় পর্বে থাকছে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের ইউএনও এস. এম. গোলাম কিবরিয়াকে নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন: সুন্দর উপজেলা গড়তে রকমারি উদ্যোগ

ঢাকাটাইমস/১০আগস্ট/টিএমএইচ

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত