ঈদের বাজারে ভারতীয় গরু না আসলেই জাতীয় কল্যাণ

শেখ আদনান ফাহাদ
| আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০১৭, ২১:৫৫ | প্রকাশিত : ১১ আগস্ট ২০১৭, ২০:৫৩

ছোটবেলা থেকে আমাদের মনে একটা ইম্প্রেশন দেয়া হয় যে, বিদেশ থেকে নানা পণ্য না আসলে আমরা না খেয়ে মরব! আমাদের নিজস্ব শক্তি সম্পর্কে জানতেই দেয়া হয় না। এভাবেই বিদেশমুখী, স্বদেশকে ছেড়ে যেতে উন্মুখ একেকটি প্রজন্ম তৈরি করা হয়। বড় হতে হতে বুঝেছি, আমরা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল না, আমরা মানসিকভাবে দুর্বল। ব্যক্তিগত লাভের জন্য আমরা লালায়িত, জাতীয় স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে হলেও। না হলে, যে দেশ যুদ্ধ জাহাজ বানিয়ে রপ্তানি করে, সে দেশে কেন নিম্নমানের ভারতীয় সিএনজি-অটোরিকশা চলবে?

ঈদ সামনে। তাই ভারতীয় গরু নিয়ে অনেক কথা হবে। সংবাদমাধ্যম থেকে বাজার সবখানেই গরু বারবার আলোচনায় আসবে। এক শ্রেণির গণমাধ্যম বলবে, ভারতীয় গরু ছাড়া আমাদের ঈদ হবে না। আবার বিজেপির ছত্রচ্ছায়ায় সাম্প্রদায়িক জঙ্গিশক্তি শিবসেনা, আরএসএস কিংবা বজরং পার্টি ঈদ আসলেই গরু ও বাংলাদেশকে  সম্পৃক্ত করে অবমাননাকর কথা-বার্তা বলে। ভারতে গরু নিয়ে সাম্প্রদায়িক বাড়াবাড়ি হলেও বাংলাদেশে গরু কোরবানি ঈদের অনিবার্য পবিত্র উপাদান।     

বৈধ-অবৈধ উপায়ে ভারত গরু বা গোমাংস বেঁচে যত টাকা উপার্জন করে তার একটা বড় অংশ যায় বাংলাদেশ থেকে। অবৈধ উপায়ে ভারত থেকে গরু আসে নানা চোরাকারবারি সিন্ডিকেট হয়ে। এই চোরাকারবারি সিন্ডিকেটে ভারতের সরকারি-বেসরকারি, রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক নানা ব্যক্তি জড়িত থাকে। বাংলাদেশের চোরাকারবারিরা সীমান্তবর্তী রাজ্যে প্রবেশ করে সে গরু অবৈধভাবে আনতে যায়। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর জানার বাইরে এই চোরাকারবার সংঘটিত হয়, এমনটি বলার সুযোগ নেই। গরু নিয়ে আসার সময় হিসেবে গড়মিল হলেই চলে বিএসএফের গুলি, মারা যায় বাংলাদেশী চোরাকারবারি। ভারতীয় অংশের যারা এই গরু চোরাচালানের সাথে যুক্ত এদেরকে নিয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কিছু করতে দেখা যায় না। সীমান্তে এভাবে মানুষ হত্যা সম্পূর্ণ বেআইনি। এত মানুষ পৃথিবীর আর কোনো সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় না।   

কিন্তু ভারত ও বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমগুলো এমনভাবে সংবাদ প্রচার করে যেন বাংলাদেশ থেকে কিছু মানুষ ভারতে গরু চুরি করতে গিয়ে সঙ্গত (?) কারণে নিহত হয়েছে! চোরাচালানের মত অবৈধ প্রক্রিয়ায় উভয় দেশের মানুষ জড়িত থাকলেও কলঙ্ক নিতে হয় শুধু বাংলাদেশকে। চোরাচালানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতীয় বিএসএফ কখনো কখনো সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে, এতে প্রতিরোধ করে আমাদের বিজিবি। এতে তৈরি হয় আন্তঃদেশীয় সম্পর্ক সংকট। দুই দেশের বন্ধুপ্রতিম মানুষদের মধ্যে নানা বাদানুবাদ শুরু হয়। তৈরি হয় দূরত্ব, যা উভয় দেশের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ।  দুই দেশের রাজনীতি, বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে গরু তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, এ কথা বললে মোটেই বাড়িয়ে বলা হয় না।

সাম্প্রদায়িক শক্তি বিজেপি ভারতের রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসার পর থেকে গরু নিয়ে কারবার নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে সাম্প্রদায়িক জঙ্গি শিবসেনা, আরএসএস, বজরং পার্টিসহ হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তির বিকাশে ভারতে গরুই যেন প্রধান চরিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতের প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তিসমূহকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পুরো ভারতে বিজেপি হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র কায়েমের যে অপচেষ্টা করছে তার যেন প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে  গরু। গরুর মাংস খেলে, হোটেলে-বাসায় ফ্রিজে রাখলে, ট্রাকে করে কোথাও গরু নিয়ে গেলে নিরীহ মুসলমানদের পিটিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলার মত একাধিক ঘটনা ঘটেছে। গরু যেন সেখানে এক প্যারাডক্স হয়ে উঠেছে। একদিকে গরুর মাংস খাওয়ার অপরাধে মুসলিম মেরে ফেলা হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগে গরুর মাংস রপ্তানি করে ভারত বিশ্বে এক নম্বর স্থান অর্জন করেছে।

ভারতের জাতীয় পর্যায়ের ইংরেজি দৈনিক দ্য হিন্দু পত্রিকায় ২০১৫ সালের ১০ আগস্ট প্রকাশিত ‘ইন্ডিয়া টপ ইন এক্সপোর্টিং বিফ’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গরুর মাংস রপ্তানিতে ভারতের পরেই আছে ব্রাজিল। ২০১৫ সালে ভারত দুই মিলিয়ন টনেরও বেশি গোমাংস রপ্তানি করেছে। অথচ ভারতের অনেকগুলো রাজ্যে গরু জবাই নিষিদ্ধ! ভারত রাষ্ট্রের কী এক ডাবলস্ট্যান্ডার্ড ভূমিকা! সাম্প্রদায়িক কারণে অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা, বিহার, ছত্তিসগড়, দিল্লি, গোয়া, গুজরাট, হরিয়ানা, হিমাচল প্রদেশ, জম্মু-কাশ্মির, ঝাড়খণ্ড, কর্ণাটক, মধ্য প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখান্ড ইত্যাদি রাজ্যসমূহে গরু জবাই কিংবা গোমাংস ভক্ষণ আইনত দণ্ডনীয়। অথচ টনকে টন গো মাংস রপ্তানি করতে কোনো দোষ নেই! ধর্মের নামে এমন জোচ্চুরি মেনে নেয়া যায় না।

গরু নিয়ে ভারতে অনেক রাজনীতি ও সাম্প্রদায়িক হামলা হলেও, গরু এবং গোমাংস রপ্তানি যে এবারো বন্ধ হবে না সেটা বলা বাহুল্য। সীমান্তে বিএসএফের হত্যাকাণ্ডও বন্ধ হবে না। গত দুই/তিন ঈদে বাংলাদেশে ভারতীয় গরু কম এসেছে। কিছু গণমাধ্যম এই ভারতীয় গরু নিয়ে হাহাকার দেখিয়েছে। কিন্তু গ্রামের কৃষক সব শঙ্কা দূর করে দিয়েছে। দেশি কৃষক দেশি গরু দিয়ে বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় অর্থনীতির শক্তি বের করে এনেছে।  এবারো বাংলাদেশে ভারতের গরু পাচার ও রপ্তানি বন্ধে নেয়া পদক্ষেপ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে বিজেপি সরকার। ভারতের গরু নিয়ে সংশ্লিষ্টদের ধারণা ভারতের গরুনীতি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে গরুর মাংসের দাম বেড়ে যাবে। তবে এদেশের মাংস ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারত গরু পাঠানো বন্ধ করলেও কোনো ক্ষতি হবে না। সাময়িকভাবে দুই-এক মাস মাংসের দাম বাড়লেও পরে ধীরে ধীরে তা কমবে। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী এতে গরুর জন্য ভারতের ওপর নির্ভরতা চলে যাবে। বছরে ৬০ থেকে ৭০ হাজার কোটি টাকা বাঁচবে বাংলাদেশের।

দেশের মাংস ব্যবসায়ীরা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশে সারা বছরে প্রায় এক কোটি ২০ লাখ গরু জবাই হয়। শুধু কোরবানি ঈদে জবাই হয় ৫০-৫৫ লাখ গরু। এর সিংহভাগই (৭০-৮০ শতাংশ) আসে স্থানীয় উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে। বাকি ২০ থেকে ৩০ শতাংশ আসে ভারত থেকে। মাংস ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রায় ১৪ লাখ গরু এসেছিল ভারত থেকে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে কমে দাঁড়িয়েছে ১১ লাখে।

ভারত  থেকে যদি গরু আমদানি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে ১/২ মাস দেশে গরুর মাংসের দাম বেড়ে গেলেও প্রতিবেশী মিয়ানমার থেকে গরু এনে সাময়িক ঘাটতি পূরণ করা যেতে পারে। তবে সরকার একটু বাড়তি মনোযোগ দিলেই বিদেশি গরুর ওপর নির্ভরতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে বলে দেশের ব্যবসায়ীরা বলছেন। প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে খামারিদের একটি করে গরু বাছর ফ্রি দিয়ে পশু পালনে উৎসাহিত করলে ২০/৩০ শতাংশ গরুর ঘাটতি দূর করা তেমন বড় সমস্যা হবে না বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলেছেন।

ভারত থেকে গরু আসা কমে যাওয়ায় ইতোমধ্যেই বিকল্প বের করে নিয়েছে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা। পরাশক্তি চীনের আশীর্বাদপুষ্ট মিয়ানমার ক্রমেই বাংলাদেশের জন্য অন্যতম গরু রপ্তানিকারক দেশ হয়ে উঠছে। কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে মিয়ানমারের গরু ও মহিষ ঝাঁকে ঝাঁকে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। প্রতিদিন পশু বোঝাই ট্রলার টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ করিডর দিয়ে দেশে ঢুকছে। গরু আসার এই ধারা অব্যহত থাকলে এ বছর কোরবানিতে দেশের পশুর সংকট হবে না বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। কোরবানির পশুর দামও সস্তা হবে বলে জানান তারা। টেকনাফ শাহাপরীরদ্বীপ করিডোরের ব্যবসায়ীরা আশা করছেন কোরবানির আগে আরো অন্তত ৫০ হাজার পশু মিয়ানমার থেকে আনা সম্ভব হবে।

টেকনাফের শুল্ক বিভাগ সূত্র জানায়, চলতি আগস্ট মাসের ১ থেকে ৭ তারিখ পর্যন্ত ১ হাজার ৪৪৮ গরু এবং ৩০৭ মহিষ এসেছে। জুলাই মাসে ৬ হাজার ৭৭০ গবাদিপশুর মধ্যে ৪ হাজার ৭৪০ গরু, ২ হাজার ২৯ মহিষ এবং মাত্র ১টি ছাগল আমদানি হয়েছে। যার বিপরীতে ৩৩ লাখ ৮৪ হাজার ৭০০ টাকা রাজস্ব আমদানি হয়েছে।

বাংলাদেশ এখন চাল উৎপাদনে স্বয়ং সম্পূর্ণ। মৎস্য, সবজি উৎপাদনে বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলোর কাতারে। মাথাপিছু আয়সহ নানা সূচকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গ্রাফ আকাশমুখী। দুর্নীতি কমিয়ে সর্বক্ষেত্রে সুব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশ প্রতিটি ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার সামর্থ্য রাখে। দরকার শুধু রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকদের একটু সাহসী ও সুদূরপ্রসারী নানা নীতি, পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন।

লেখক: শিক্ষক ও সাংবাদিক   

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত