জিন্নাহর সেই বাড়ি

ভারতে গলার কাঁটা, পাকিস্তানে তীর্থস্থান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ১২ আগস্ট ২০১৭, ১০:৫০
মুম্বাইয়ে জিন্নাহর সেই বাড়ি

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে পাকিস্তানে কায়েদ-এ-আজম বলা হলেও সাধারণ পাকিস্তানীরা তাকে বাবা-এ-কৌম বলেই সম্মানিত করে থাকেন। কিন্তু এই জিন্নাহকেই ভারতের বেশির ভাগ মানুষ ঘৃণা করে। দেশটিতে তার নাম উচ্চারণ করাও হয়ে থাকে কিছুটা অশ্রদ্ধার সঙ্গে। কারণ, তাকেই দেশভাগের জন্য দায়ী বলে মনে করেন ভারতীয়দের অনেকে।

দেশভাগের সেই ক্ষত এখনও অনেকের মন থেকে মুছে যায়নি। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পরে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ নিজের তৈরি দেশ পাকিস্তানে চলে গেলেন, কিন্তু ভারতে ফেলে গেলেন নিজের অতি প্রিয় মুম্বাইয়ের বাড়ি।

ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে অন্য অনেক বিষয় নিয়ে যেমন বিবাদ রয়েছে, তেমনই বিবাদ রয়েছে জিন্নাহর বাড়ি নিয়েও। এই বাড়িতে থাকার সময়েই পাকিস্তান তৈরির পরিকল্পনা করেন জিন্নাহ, এখান থেকেই চলেছিল লড়াইটা। এই বাড়িটিকেই দেশভাগের পরিকল্পনার মূল আড্ডা বলে মনে করা হয়। সেজন্যই পাকিস্তান এই বাড়িটিকে তাদের সম্পত্তি বলে মনে করে।

পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের কাছে মুম্বাইয়ে জিন্নাহর বাড়ি একটা তীর্থস্থানের মতো। তবে ভারতের কাছে মুম্বাই শহরে জিন্নাহর ওই বাড়িটি চোখে বালি পড়ার মতো। ভারত এই বাংলো বাড়িটিকে 'শত্রু সম্পত্তি' বলে চিহ্নিত করে রেখেছে। সরকারের দখলে থাকা বাংলো বাড়িটি এখন পরিত্যক্ত।

মুম্বাইয়ের এক আবাসন ব্যবসায়ী ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা জিন্নাহর বাড়িটি ভেঙ্গে ফেলারও দাবি তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘এটা শত্রু সম্পত্তি। দেশভাগের জন্য দায়ী যে জিন্নাহ, তিনি বানিয়েছিলেন বাড়িটি। দেশভাগের কারণে যে রক্তপাত ঘটেছে, এই বাড়ির দিকে তাকালে সেই সব কথা মনে পড়ে কষ্ট হয়। সেজন্যই বাড়িটি ভেঙ্গে ফেলা উচিত। সেখানে একটা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়া যেতে পারে।’

জিন্নাহর কিন্তু তৎকালীন বোম্বে শহরের প্রতি খুব ভালোলাগা ছিল। ইংল্যান্ড থেকে ফিরে সেখানেই বাস করতেন তিনি। আরামে থাকার জন্য বাংলো বাড়িটি বানিয়েছিলেন। ইউরোপীয় বাংলোর ধাঁচে তৈরি হয়েছিল 'সাউথ কোর্ট' নামের বাড়িটি। ১৯৩০ এর দশকে বাড়িটি বানাতে জিন্নাহর খরচ হয়েছিল প্রায় দুই লাখ রুপি। দক্ষিণ মুম্বাইয়ের মালাবার হিলস এলাকার ওই বাড়িটি থেকে সমুদ্র দেখা যায়। প্রখ্যাত আর্কিটেক্ট ক্লড বেটলী বাংলোটির ডিজাইন করেছিলেন। ইতালিয়ান মার্বেল বসানো হয়েছিল, সঙ্গে ছিল কাঠের কারুকাজ। ইতালি থেকে কারিগর এনে স্বপ্নের বাড়ির মতো করে বাংলোটি বানিয়েছিলেন জিন্নাহ।

সেই সময়ে পেশায় ব্যারিস্টার জিন্নাহ এই বাংলো তৈরির জন্য যতটা যত্ন নিয়েছিলেন, তা থেকেই বোঝা যায় যে তিনি মুম্বাইতেই থাকার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু একটা সময়ে আইন পেশার চেয়েও বেশি তিনি রাজনীতিতে সময় দিতে লাগলেন আর মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্রের দাবি তুললেন। সেই দাবি আদায় করেও ছাড়লেন। আর শেষে নিজের তৈরি দেশেই পাড়ি জমালেন।

জিন্নাহর ধারণা ছিল দেশভাগের পরে ভারত আর পাকিস্তানের সম্পর্ক এতটাই ভাল হয়ে উঠবে যে তিনি ইচ্ছে হলেই মুম্বাইতে এসে নিজের বাড়িতে কিছুদিন কাটিয়ে যেতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে ঘটল অন্যরকম। দুই দেশের মধ্যে সীমানা তৈরি হতেই মানুষের মনেও উঁচু প্রাচীর গড়ে উঠল। নিজের স্বপ্নের বাংলোয় ফিরে আসার স্বপ্ন অপূর্ণই রয়ে গেল জিন্নাহর।

পাকিস্তানে চলে যাওয়ার আগে জিন্নাহ চেয়েছিলেন কোনও ইউরোপীয় পরিবারকে নিজের বাংলোটা ভাড়া দিয়ে দেবেন। জওহারলাল নেহরু তাতে রাজীও ছিলেন। কিন্তু দলিলপত্র তৈরির প্রক্রিয়ার মধ্যেই জিন্নাহর মৃত্যু হয়। তখন থেকেই ওই সুন্দর বাংলো বাড়িটি ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে গলার কাঁটার মতো বিঁধে রয়েছে।

জিন্নাহর মেয়ে দিনা ওয়াদিয়াও এই বাংলো বাড়ির ওপরে নিজের মালিকানা দাবি করেছেন। কিন্তু বাড়িটি এখনও ভারত সরকারেরই দখলে রয়েছে।

(ঢাকাটাইমস/১২আগস্ট/জেএস)

সংবাদটি শেয়ার করুন

আন্তর্জাতিক বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত