২০০ বছরের সাক্ষী ঢাকার ব্রাহ্ম সমাজ

ইব্রাহিম রাকিব, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ২০ আগস্ট ২০১৭, ০৮:১৭

অনেকেই ‘ব্রাহ্ম’ আর ‘ব্রাহ্মণ’ শব্দ দুটিকে গুলিয়ে ফেলেন। হিন্দু ধর্মের একটি বর্ণ হলো ব্রাহ্মণ আর ব্রাহ্ম ভারতবর্ষে রাজা রামমোহন রায় প্রবর্তিত একটি ধর্ম। ঢাকায় ব্রাহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয় এই ধর্ম প্রবর্তনের প্রায় দুই যুগ পর। হিন্দু ধর্মের গোঁড়ামি ও অজ্ঞতা দূর করার জন্য রাজা রামমোহন রায় ১৮১৫ সালে ‘আত্মীয় সভা’ প্রতিষ্ঠা করেন। এ আত্মীয় সভাই ১৮২৮ সালে ব্রাহ্ম সমাজে রুপ লাভ করেন।

ঢাকার ব্রাহ্ম সমাজের উপাসনালয়টি পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলিতে অবস্থিত। বাংলাবাজার চৌরাস্তার মোড় থেকে ডানে কিছু দূর সামনে গেলেই পড়বে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল। ঠিক এর পাশেই অবস্থিত মন্দিরটি। এই মন্দিরটি দেখতে ১৯২৬ সালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে এসেছিলেন। এখানেই বসবাস করেন বাংলাদেশের প্রথম নারী বিবাহ নিবন্ধক কবিতা রানী দত্ত রায় ও চন্দনা পাল।

প্রবেশদ্বার পেরুলেই দেখা মেলবে লোহার বেষ্টনী দিয়ে ঘেরাও করা বাগান। সেখানে রয়েছে বাহারি ধরনের গাছ। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে চোখে পড়ে সাদা আর লাল রঙের মিশেলে দোতলা সমান উঁচু একতলা ভবনটি। সেটির চূড়ায় নকশাদার ফলকে সাদা রঙে লেখা ব্রাহ্ম সমাজ। মূল ভবনের পাশেই রয়েছে পুরনো জীর্ণ ভবন ও নিচতলা একটি আধাপাকা ঘর যেখানে বিবাহ নিবন্ধন করা হয়। আর জীর্ণ ভবনটিতে একসময় ছিল রাজা রামমোহন লাইব্রেরি। ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বর্তমানে লাইব্রেরিটি মূল ভবনে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

বেদান্তের একেশ্বরবাদের ওপর ভিত্তি করে ১৮২৮ সালে রাজা রামমোহন রায় ব্রাম্মসভা গঠন করেন। পরে এটি ব্রাহ্মসমাজ নামে পরিচিত হয়। ব্রাহ্মরা নিরাকার ঈশ্বরের আরাধনা করেন। নিরাকার ব্রহ্ম/ঈশ্বর বিশ্বাস করেন বলেই এই ধর্মের নামকরণ হয় ‘ব্রাহ্ম’। এই সমাজের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় হিন্দুদের মধ্যে ধর্মীয় ভেদাভেদ ও কুসংস্কার দূর করা। সতীদাহ প্রথা নিরোধ, বিধবা বিবাহ ও ইংরেজি শিক্ষার প্রসারে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে ব্রাহ্ম সমাজ। ব্রাহ্ম সমাজের সাথে জড়িয়ে রয়েছে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, কেশবচন্দ্র সেনসহ অনেক বিখ্যাত ব্যক্তির নাম।

বর্তমানে সারা দেশে মোট ব্রাহ্মের সংখ্যা প্রায় ১০০ এর কাছাকাছি। ব্রাহ্ম সমাজের সাত সদস্যর কার্যনির্বাহী কমিটি রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে সাত সদস্যর ট্রাস্টি বোর্ড। এরাই মন্দিরসহ সব সম্পদের দেখভালের দায়িত্বে আছেন। মন্দিরের আচার্যের দায়িত্বে আছেন সবুজ কুমার পাল। তিনিই প্রার্থনাসভা পরিচালনা করেন। ব্রাহ্ম সমাজের মন্দিরে রয়েছে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের প্রবেশাধিকার। প্রতি রবিবারই অনুষ্ঠিত হয় সাপ্তাহিক প্রার্থনা। এছাড়াও বছরে ছয় থেকে সাতটি উৎসব আয়োজিত হয়ে থাকে মন্দিরটিতে। বিশেষ করে জানুয়ারি, মে, জুন ও সেপ্টেম্বর মাসে।

১৮৪৬ সালের দিকে ব্রজসুন্দর মিত্র, যাদবচন্দ্র বসু, গোবিন্দচন্দ্র বসু, রামকুমার বসুসহ অন্যরা মিলে ঢাকায় ব্রাহ্ম সমাজ আন্দোলন শুরু করেন। প্রথম দিকে ব্রাহ্ম সমাজের সভ্যদের বাড়িতেই এর কার্যক্রম চলত। তবে ঢাকা ব্রাহ্ম সমাজের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয় ব্রজসুন্দর মিত্রের ভাড়াবাড়িতে। পরবর্তীতে ১৮৬৯ সালে কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষক দীননাথ সেনের ভূমিকায় ঢাকায় ব্রাহ্ম সমাজের এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। সেই সময় ভবনটি নির্মাণে প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়। মন্দিরটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য ব্যাপক আয়োজন করা হয়। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নবাব আব্দুল গনি, নবাব আহসানুল্লাহ, ত্রিলোচন চক্রবর্তী ও জোয়াকিন পোগজসহ প্রমুখ ব্যক্তিরা।

ঢাকাটাইমস/২০আগস্ট/আইআর/কেএস

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজধানী বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত