সুদিন ফেরাতে পারে বিআরটিসি বাস সার্ভিস

শাহান সাহাবুদ্দিন, গাজীপুর
 | প্রকাশিত : ২০ আগস্ট ২০১৭, ২১:৫৯

লেগুনাসহ ফিটনেসবিহীন পরিবহন কমে যাওয়ার পাশাপাশি কমবে দুর্ঘটনা। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বাধ্য হয়ে লেগুনায় যাতায়াতকারী যাত্রীদের মাঝে ফিরবে স্বস্তি। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের পরিবারের সদস্যরা খুঁজে পাবে সান্তনা। সম্ভাবনাময় ‘চান্দনা চৌরাস্তা টু ভালুকা’ বাস সার্ভিস চালু করে অন্যন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে বিআরটিসি। সেই সঙ্গে ফিরতে পারে সুদিন।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের চান্দনা চৌরাস্তায় নিরুপায় হয়ে লেগুনায় বসে থাকা যাত্রীদের সাথে আলাপকালে তারা গাজীপুর জেলা প্রশাসকসহ বিআরটিসি কর্তৃপক্ষের কাছে নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন। কেননা গত ৭ আগস্ট ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মাস্টারবাড়ী এলাকায় একটি বেপরোয়া গতির লেগুনা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি কাভার্ডভ্যানকে ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলেই তিনজন মেধাবী কলেজ ছাত্রীসহ পাঁচজন নিহত হয়। এ ঘটনায় শোকে বিহ্বল জেলাবাসী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিরাপদ সড়কের দাবিতে গণজোয়ার সৃষ্টি করে। পরে দুর্ঘটনা তদন্ত ও লেগুনা সিন্ডিকেট চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনতে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের অংশগ্রহণে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। তবে এ দুর্ঘটনাই প্রথম নয়।

সূত্র থেকে জানা গেছে, গাজীপুরে গত দুই বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ১৫০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন চার শতাধিক। গত দুই বছরে শুধুমাত্র লেগুনা দুর্ঘটনায় অর্ধশতাধিক যাত্রী প্রাণ হারিয়েছে।

সরেজমিনে জানা গেছে, গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা থেকে শ্রীপুরের মাওনা চৌরাস্তা পর্যন্ত কয়েকটি মিনিবাস নিয়মিত চলাচল করছে। তবে এসব বাসে স্বল্প দূরত্বের- সালনা, পোড়াবাড়ী, মাস্টারবাড়ী, রাজেন্দ্রপুর, হোতাপাড়া ও ভবানীপুরের যাত্রীদের না নেয়ায় নিত্যদিন হাজার হাজার যাত্রী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাধ্য হয়েই লেগুনায় যাতায়াত করছে। এসব যাত্রীদের মধ্যে হাজারো স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, শিল্প কারখানার শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ রয়েছে। লেগুনায় বাড়তি ভাড়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে আতঙ্কিত যাত্রীরা গন্তব্যস্থলে পৌঁছে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছে।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বিগত দিনে চান্দনা চৌরাস্তা থেকে ময়মনসিংহ রুটে বিআরটিসি বাস সার্ভিস চালু করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু এ রুটে একটা তস্কর শ্রেণি বহুদিন ধরে এ বাস সার্ভিস চালুতে বাধা দিয়ে আসছে। তাদের প্রত্যক্ষ মদদে এ রুটে সরকারি জনহিতকর পরিবহন যেমন বিআরটিসির মতো বাসগুলো চলাচল করতে পারছে না।

গাজীপুর বিআরটিসি সূত্রে জানা গেছে, মহানগরীর চান্দনা চৌরাস্তা থেকে ঢাকা-গাবতলী পর্যন্ত ৪৫টি বাস নিয়মিত চলাচল করছে। এর মধ্যে ৫৮সিট বিশিষ্ট আর্টিকুলার (সংযুক্ত) ৩২টি এবং ৭৫সিট বিশিষ্ট ডাবল ডেকার ১৩টি বাস রয়েছে। চান্দনা চৌরাস্তা থেকে ঢাকা-গাবতলী পর্যন্ত একটি বাস যাওয়া-আসা করতে কখনো ৫-৬ ঘণ্টা সময় লেগে যাচ্ছে। এ যাত্রায় যাত্রীদের কাছ থেকে ৪-৫ হাজার টাকা ভাড়া উত্তোলন করা যায় বলে বাসচালক সূত্রে জানা গেছে। তবে বাসগুলোর অতিরিক্ত জ্বালানি খরচসহ মূল্যবান সময় অপচয় হওয়ায় খুব একটা লাভের মুখ দেখছে না বিআরটিসি। কিন্তু গাজীপুর বিআরটিসি বাস ডিপো থেকে ১০টি বাস যদি চান্দনা চৌরাস্তা থেকে অন্তত শ্রীপুরের মাওনা চৌরাস্তা পর্যন্ত চলাচল করে তবে একটি বিআরটিসি বাস জ্বালানি সাশ্রয়ের ফলসহ যাত্রীদের কাছ থেকে ৫-৬ হাজার টাকা ভাড়া উত্তোলন করা সম্ভব হবে বলে জেলা বিআরটিসি সূত্রে জানা গেছে। এতে বিআরটিসি লাভবান হওয়ার পাশাপাশি যাত্রী দুর্ভোগ ও দুর্ঘটনা কমবে। এছাড়াও একটি বিআরটিসি ডবল ডেকার বাসে অন্তত ৬টি লেগুনার যাত্রী বহন করা সম্ভব। ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে ১০টি ডবল ডেকার বাস চলাচল করলে ৬০টি লেগুনা যাত্রী বহন করা সম্ভব। এতে মহাসড়কে শৃঙ্খলাও ফিরে আসবে।

এ ব্যাপারে ব্যাপক আগ্রহ ও উৎসাহ রয়েছে গাজীপুর বিআরটিসির। তবে নানামুখী প্রতিবন্ধকতায় এ সার্ভিসটি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।

তবে গাজীপুর জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীর ঢাকাটাইমসকে জানান, ‘এটি একটি চমৎকার প্রস্তাব। এ বিষয়ে শিগগিরই বিআরটিসি কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

এদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গাজীপুর বিআরটিসির এক কর্মকর্তা জানান, কর্তৃপক্ষ চাইলে তাদের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে। চান্দনা চৌরাস্তা থেকে ভালুকা পর্যন্ত বিআরটিসি বাস সার্ভিস চালু হোক- এ দাবি জেলা বিআরটিসিরও। এতে করে মহাসড়ক থেকে ফিটনেসবিহীন পরিবহন কমে যাওয়ার পাশাপাশি বিআরটিসি লাভবান হবে। তবে এ ব্যাপারে চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু মালিক সমিতির অসহযোগিতার কারণে তা আর সম্ভব হয়নি। বিগত দিনে চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় বিআরটিসি বাস ভাঙচুর করা হয়েছিল। এ রুটে বিআরটিসি বাস চলাচল করলে লেগুনা সিন্ডিকেটের স্বার্থে আঘাত লাগবে।

তবে সকল প্রতিবন্ধকতা উড়িয়ে দিয়ে বিআরটিসির ডিজিএম (অপারেশন) আলমাছ আলী জানান, ‘চান্দনা চৌরাস্তা থেকে ভালুকা পর্যন্ত বাস সার্ভিস চালুর ব্যাপারে যাত্রীদের পক্ষে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকে বিআরটিসি বরাবর চাহিদা পাঠাতে হবে। প্রস্তাব পেলে ডাবল ডেকার বাস দিতে কোন সমস্যাই নেই। যাত্রীসেবায় বিআরটিসি নিবেদিত বলেও তিনি জানান।’

গাজীপুর হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আহমেদ ঢাকাটাইমসকে জানান, মহাসড়কে অবৈধ লেগুনা চলাচল বন্ধের প্রস্তাব ইতোমধ্যে জেলা হাইওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে লেগুনা বন্ধ করে বিআরটিসি সার্ভিস চালু করতে চাইলে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে হাইওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে বলেও তিনি জানান।

অপরদিকে গাজীপুর ট্রাফিক পুলিশ বিভাগের সিনিয়র পুলিশ সুপার সালেহ আহমেদ বলেছেন, চান্দনা চৌরাস্তা থেকে বিআরটিসি বাস সার্ভিস চালু করা সম্ভব না হলেও যদি ঢাকা গাবতলী থেকে গাজীপুরগামী বিআরটিসি বাসগুলো শ্রীপুরের মাওনা চৌরাস্তা পর্যন্ত চলাচল করে। তবে ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে লেগুনা কমে যাওয়ার পাশাপাশি কমবে দুর্ঘটনা।

(ঢাকাটাইমস/২০আগস্ট/এলএ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত