নেত্রীর জীবন বাঁচাতে জীবন দেন বরিশালের সেন্টু

বরিশাল ব্যুরো, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২১ আগস্ট ২০১৭, ১৩:৩৩ | প্রকাশিত : ২১ আগস্ট ২০১৭, ০৮:৫৫

প্রিয় নেত্রীর (শেখ হাসিনা) জীবন বাঁচাতে গিয়ে সেদিন নিজের জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সহসম্পাদক মোস্তাক আহম্মেদ সেন্টু। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের জনসভায় বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলার সময় সেন্টু মাত্র ৩৬ বছর বয়সে মারা যান।

সেন্টুর পরিবারের অভিযোগ, প্রতিবছর ২১ আগস্ট এলেই তাদের প্রতি দায়সারাভাবে সমবেদনা জানিয়ে দায়িত্ব শেষ করেন কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। আর মিডিয়াকর্মী ছাড়া নিহত পরিবারে খবর কেউ রাখেন না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করে মোস্তাক আহম্মেদ সেন্টুর বিধবা স্ত্রী আইরিন সুলতানা বেবী। তিনি একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলাকারী ও পরিকল্পনাকারীদের অনতিবিলম্বে ফাঁসি দাবি করেন।

বরিশালের মুলাদী উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের রামারপোল গ্রামের মৃত আফছার উদ্দিন হাওলাদারের সাত পুত্র ও তিন কন্যার মধ্যে গ্রেনেড হামলায় নিহত মোস্তাক আহম্মেদ সেন্টু ছিলেন ষষ্ট। সেন্টুর লাশ রামারপোল গ্রামের পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়।

ক্ষোভ প্রকাশ করে সেন্টুর বিধবা স্ত্রী বেবী বলেন, ‘বিগত বছরগুলোতে ২১ আগস্ট স্মরণসভায় কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের দাওয়াত পেয়ে আমি ও আমার একমাত্র কন্যা আফসানা আহম্মেদ রিদি, বৃদ্ধ শাশুড়ি মনোয়ারা বেগমসহ (৮৬) শোকাহত পরিবারের ৫/৬ জন সদস্য গেলেও আমরা বসার জায়গা পর্যন্ত পাইনি। শোকাহত পরিবারদের বসার নির্ধারিত জায়গায় আগে থেকেই নেতারা দখল করে বসে থাকেন। আমাদের বসার ব্যবস্থা পর্যন্ত কেউ করে দেয় না। তাই বৃদ্ধা শাশুড়িসহ আমরা গত দুই বছর ধরে শোকসভায় যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি।’

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে শোকাহত পরিবারগুলোর সদস্যরা যেন সাক্ষাৎ করতে পারেন সে ব্যবস্থা করার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি জোর দাবি করেন তিনি।

সূত্র মতে, মোস্তাক আহম্মেদ সেন্টু বরিশাল জিলা স্কুল থেকে এসএসসি ও বিএম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে শহীদুল্লাহ হলে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দেন। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে সেন্টু মাস্টার্স পাস করেন। ১৯৯৬ সালে মুলাদী উপজেলার রামারপোল এএম উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আবুল হাসানাত মৃধার কন্যা আইরিন সুলতানা বেবীকে সামাজিকভাবে বিয়ে করেন সেন্টু। দাম্পত্য জীবনে তিনি (সেন্টু) আফসানা আহম্মেদ রিদি (১৫) নামের এক কন্যা সন্তানের জনক।

সেন্টুর নিজ এলাকা মুলাদী উপজেলার রামারপোল শহীদ সেন্টু স্মৃতি সংঘের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক নেতা এবং সেন্টুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী রাজীব হোসেন ভূঁইয়া রাজু ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের জনসভা চলাকালে মোস্তাক আহম্মেদ সেন্টু ভাইয়ের সাথে আমি মঞ্চের সামনে বসে নেত্রীর দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ শুনছিলাম। আকস্মিকভাবে গ্রেনেড হামলা শুরু হওয়ার সাথে সাথেই সেন্টু ভাই প্রিয় নেত্রীকে (শেখ হাসিনা) রক্ষা করতে একলাফে মঞ্চে উঠে অন্যান্যদের সাথে নেত্রীকে জড়িয়ে রাখেন। একপর্যায়ে আমি (রাজু) দৌড়ে নিরাপদে আশ্রয় নিই। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর ঘটনাস্থল থেকে গ্রেনেডের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত সেন্টু ভাইকে উদ্ধার করে মুমূর্ষু অবস্থায় ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালের নিয়ে যাই। সেখানে বসে শরীর থেকে গ্রেনেডের স্প্লিন্টার বের করতে অপারেশন থিয়েটারে নেয়া হয়। অপারেশন চলাকালে ওইদিন রাত সাড়ে নয়টার দিকে সেন্টু ভাই মারা যান।’

রাজু জানান, এর একমাস পর আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল সেন্টুর স্ত্রী বেবীকে মার্কেন্টাইল ব্যাংকে চাকরি দেন।

একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সহসম্পাদক মোস্তাক আহম্মেদ সেন্টুর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে রাজীব হোসেন ভূঁইয়া রাজু আরও বলেন, ‘ছাত্রজীবন থেকেই সেন্টু ভাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। রাজনৈতিক জীবনে কখনোই তিনি নিজের কথা ভাবেননি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেশপ্রেম, মাটি ও মানুষের সাথে গভীর মমতার ছাপ ছিল তার মাঝে। সেন্টু ভাই ছিলেন এতদাঞ্চলের মাটি ও মানুষের নেতা। দলমত নির্বিশেষে এলাকার সর্বস্তরের জনগণের হৃদয়ে ছিল তার অবস্থান। তিনি ছিলেন মিষ্টভাষি ও সদালাপি। খুব অল্প সময়েই তিনি মানুষকে ভালোবেসে আপন করে নিতেন। তার অনুপস্থিতি আজ মুলাদীকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে।’

রাজু আরও জানান, প্রতিবছর গ্রেনেড হামলাকারীদের বিচার ও শাস্তির দাবিতে মুলাদীর রামারপোল গ্রামে শহীদ সেন্টু স্মৃতি সংঘের উদ্যোগে ২১ আগস্ট স্মরণসভা ও দোয়া-মোনাজাতের আয়োজন করা হয়। এবছরও অনুরূপ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।

শহীদ মোস্তাক আহমেদ সেন্টুর নিজ উপজেলা মুলাদী ও পাশ্ববর্তী বাবুগঞ্জ উপজেলার আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, জীবদ্দশায় মোস্তাক আহমেদ সেন্টু স্বপ্ন দেখেছিলেন বরিশাল-৩ আসনের উন্নয়ন ও সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় মোস্তাক আহমেদ সেন্টুর সব স্বপ্ন তছনছ হয়ে যায়।

একাধিক আওয়ামী লীগ নেতা জানান, বিএনপি-জামায়াতের চারদলীয় জোট সরকারের সময় মুলাদী, হিজলা ও বাবুগঞ্জ উপজেলায় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ছিল স্থবিরতা। আওয়ামী লীগের কোনো সভা, সমাবেশ ও মিছিল রাজনৈতিক কর্মসূচি করতে দেয়া হতো না। সেই পরিস্থিতিতেও মোস্তাক আহমেদ সেন্টু আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবকাঠামোকে জোরদার করতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। এতে স্বল্প সময়েই সর্বত্র মোস্তাক আহমেদ সেন্টুর নাম ছেড়িয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একজন সাহসী নেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন মোস্তাক আহমেদ সেন্টু।

(ঢাকাটাইমস/২১আগস্ট/টিটি/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত