আদালতে আ.লীগের কোনো বন্ধু পাওয়া গেল না?: তোফায়েল

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০০:০৩ | প্রকাশিত : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ২০:০২

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে উচ্চ আদালত রিটের শুনানিতে অংশ নেয়া এমিকাস কিউরিদের (আদালতের নির্বাচিত আইনি সহায়তাকারী) নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য তোফায়েল আহমেদ।  তিনি বলেছেন, বিএনপিকে উৎফুল্ল করতেই তাদের দিয়ে যাতে ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করা যায়, সেই প্রক্রিয়াটা শুরু হয়েছিল।

এই রায় প্রসঙ্গে এমিকাস কিউরিদের (আদালতের বন্ধু) দেয়া বক্তব্যের সমালোচনা করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমি বিস্মিত হই, এই দেশে এই আদালতে আওয়ামী লীগের কোনো বন্ধু পাওয়া গেল না?’  

বুধবার রাতে সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ১৪৭ ধারায় আলোচনায় অংশ নিয়ে তোফায়েল এসব কথা বলেন। সন্ধ্যায় এ বিষয়ে আলোচনার প্রস্তাব দেন চট্টগ্রাম-৮ আসনের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সাংসদ মইনুদ্দীন খান বাদল। প্রস্তাবটি হলো: সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী ‘অসাংবিধানিক’ ঘোষণা করে আপিল বিভাগের দেওয়া রায় বাতিল এবং রায়ে জাতীয় সংসদ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মাননীয় প্রধান বিচারপতির দেওয়া অসাংবিধানিক, আপত্তিকর ও অপ্রাসঙ্গিক পর্যবেক্ষণ বাতিল করার জন্য যথাযথ আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক’।

আলোচনায় অংশ নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এই জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ষোড়শ সংশোধনী পাস করেছিলাম। যার লক্ষ্য ছিল ৭২-এর সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদে ফিরিয়ে আনা। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট একটি রায় দিয়েছে, যে রায়ের আগে তারা আদালতের বন্ধু (এমিকাস কিউরি) হিসেবে কয়েকজনকে নিযুক্ত করেছে। জাতির কাছে প্রশ্ন রাখি আদালতের বন্ধু এরা কারা?’

তোফায়েল আহমেদ একে একে এমিকাস কিউরিদের পরিচয় তোলেন। ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে দেয়া হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সরকারের আপিলের শুনানিতে আদালত ১২ জন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীকে নিযোগ দেন আদালতের আইনি সহায়তাকারী হিসেবে।

এমিকাস কিউরিদের মধ্যে ছিলেন ড. কামাল হোসেন ও ব্যারিস্টার আমির উল ইসলাম, যারা বাহাত্তরের সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম। ড. কামাল সম্পর্কে তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘তিনি আওয়ামী লীগ-বিরোধী। আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে তিনি নিজে একটি দল করেছেন। ব্যারিস্টার আমির উল ইসলাম আওয়ামী লীগের সাথে সম্পৃক্ত নন। তিনি নিজে সংবিধান প্রণেতা হিসেবে দাবি করেন। আবার ষোড়শ সংশোধনীর বিরোধিতা করেছেন।’

এমিকাস কিউরি রোকন উদ্দিন মাহমুদ সম্পর্কে তোফায়েল বলেন, ‘তিনি হাইকোর্টে এক কথা বলেছেন, সুপ্রিম কোর্টে আরেক কথা বলেছেন।’

অন্য এমিকাস কিউরিদের বিএনপির মতাদর্শের বলে দাবি করেন তোফায়েল। বলেন, ‘এই যে মাহমুদ আলী, আমরা যখন ২০০৬ সালে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করার প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলাম, তখন আকস্মিকভাবে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষককে যখন প্রধান উপদেষ্টা করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল, আমরা তার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে অভিযোগ উত্থাপন করেছিলাম। এই মাহমুদ আলী দৌড় দিয়ে তখন চিফ জাস্টিসের কাছে গিয়েছিলেন। এরপর আমরা যে বিচারটা চেয়েছিলাম সেটা আর পাইনি।’

এ ছাড়া ‘হাসান আরিফ বিএনপি দলের নিযুক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এবং ১/১১ এর সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা। ফিদা এম কামাল ১/১১ সরকারের অ্যাটর্নি জেনারেল। আবদুল ওয়াদুদ বিএনপির সরকারের অ্যাডিশনাল অ্যাটর্নি জেনারেল। টি এইচ খান বিএনপির জিয়াউর রহমানের মন্ত্রী।’

তোফায়েল বলেন, নয়জন এক দিকে, একমাত্র আজমল হোসেন কিউসি ষোড়শ সংশোধনীর সমর্থন করেছেন। 

তোফায়েল আহমেদ প্রশ্ন রাখেন, ‘এই সুপ্রিম কোর্টে নিরপেক্ষ বা আওয়ামী লীগ সমর্থিত কোনো আদালতের বন্ধু পাওয়া গেল না? কারণ এসব লোককে দিয়ে যাতে ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করা যায়, সেই প্রক্রিয়াটা শুরু হয়েছিল।

মন্ত্রী আরও বলেন, ‘পত্রিকায় ড. কামাল হোসেনের একটি সাক্ষাৎকার দেখে আমরা বিস্মিত হই। তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের সংবিধান শুরুই হয়েছিল আমরা দিয়ে। হঠাৎ এই প্রশ্ন আসল কেন? তিনি অনেক কিছু ভুলে গেছেন। তিনি কি জানেন না যে স্বাধীনতার ঘোষণা হয়েছিল আমি (বঙ্গবন্ধু) দিয়ে। কে বলেছিলেন? জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বলেছিলেন, ‘এটাই হয়তো তোমাদের কাছে আমার শেষ বার্তা...স্বাধীনতার ঘোষণা’। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা কে ছিল? ‘আমি  এবং আমরা’ একটি অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি করার জন্য করা হয়েছে।’

সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ন্যস্ত করে আনা সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করেছে আপিল বিভাগ। এর ফলে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের হাতে ন্যস্ত হয়। ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রতিস্থাপিত করেছিল জাতীয় সংসদ। ওই সংবিধানের ৯৬ ধারা অনুযায়ী নৈতিক স্খলনজনিত কারণে বিচারপতিদের অপসারণ করতে পারতো সংসদ।

গত ১ আগস্ট এই মামলার যে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়েছে, তাতে শাসনব্যবস্থা, সংসদ নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে নানা মন্তব্য এসেছে। ওই রায় এবং পর্যবেক্ষণ নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা, এমনকি খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও প্রধান বিচারপতির সমালোচনা করেছেন। রায়ের পর্যবেক্ষণে বঙ্গবন্ধুকে ‘খাটো করা হয়েছে’ অভিযোগ তুলে প্রধান বিচারপতির পদত্যাগের দাবিও তুলেছেন ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতা।

বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি। সংসদকে কেউ যদি ছোট করার চেষ্টা করে তাহলে সমস্ত জাতিকেই ছোট করা হয়। কারণ আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি।’

তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘কোনো বড় দেশেই জুডিশিয়াল কাউন্সিল নেই। আজকে আমার অবাক লাগে এটি এখানে চালু করা হয়েছে। ১৯৫৬ এর সংবিধানে আছে সংসদ বিচারপতিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। আর ৭৭ এর সামরিক সরকারের প্রচলন করা আইনটি প্রধান বিচারপতির ভালো লেগে গেল।’ 

ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদের হাতে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা ফিরিয়ে নেয়ার কথা উল্লেখ করে তোফায়েল বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে এটি সামঞ্জস্যপূর্ণ। আমি মাননীয় আইনমন্ত্রীকে অনুরোধ করব এটাকে রিভিউতে পাঠানোর জন্য। সংসদ কর্তৃক যদি কেউ অপসারিত হয় তবে সেটা অধিকতর গণতান্ত্রিক।’

(ঢাকাটাইমস/১৩সেপ্টেম্বর/এএকে/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত