ভুল মানুষকে ভালোবাসার কষ্ট

প্রভাষ আমিন
 | প্রকাশিত : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০৮:১৭

মিয়ানমার সরকার দাবি করছে, রাখাইন রাজ্যে তারা সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চালাচ্ছে। কেন এই অভিযান? গত ২৪ আগস্ট আনান কমিশনের রিপোর্ট দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সন্ত্রাসীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্তত ২৫টি ক্যাম্পে হামলা চালায়। পরে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মিÑ আরসা এ হামলার দায়ও স্বীকার করে। ব্যস, তারপরই শুরু হয় পাল্টা অভিযান। তো সেই সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের রেজাল্ট জানেন? মিয়ানমারের সরকারি হিসাবটা শুনুন, রাখাইন রাজ্যের ৪৭১টি গ্রামের মধ্যে ১৭৬টি রোহিঙ্গা শূন্য, আরো ৩৪টিতেও তেমন কেউ নেই। তবে আমার ধারণা, গত ২০ দিনে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ৪ শরও বেশি গ্রাম খালি করে ফেলেছে। যেভাবে চলছে, এভাবে চলতে থাকলে খুব শিগগিরই পুরো রাখাইন রাজ্য রোহিঙ্গা শূন্য হয়ে যাবে। তাদের টার্গেট ছিল ১৫ সেপ্টেম্বর। হয়তো আরো কিছুদিন সময় লাগবে। যেদিন মিয়ানমার রোহিঙ্গা শূন্য হবে, সেদিন নিশ্চয়ই অনেক বড় উৎসব হবে। মিয়ানমার সরকারের অনেকদিনের লালিত স্বপ্ন ছিল এটি। সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের আরো কিছু রেজাল্ট শুনুন। গত ২০ দিনে ৪ হাজারের মতো মানুষ মারা গেছে। আর ৪ লাখ পালিয়ে এসেছে। জাতিসংঘের দুটি সংস্থা আইওএম ও ইউএনএইচসিআরের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে পালিয়ে বাংলাদেশে আসা মানুষের সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। আপনারা সবাই অং সান সুচিকে অনেক গালমন্দ করছেন। আমার কিন্তু মনে হয়েছে ভদ্রমহিলার দয়ার শরীর। উনি মাত্র ৪ হাজার মানুষকে মেরেছেন, আর ৪ লাখ মানুষকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। যদি সব রোহিঙ্গাকে মেরেও ফেলতেন, আপনি কী করতে পারতেন?

আচ্ছা, মিয়ানমার যে বলছে রাখাইনে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চলছে, তাহলে সেখানে গ্রামের পর গ্রাম মানুষ শূন্য হয়ে যাচ্ছে কেন, লাখ লাখ লোক বাড়িঘর ছেড়ে পালাচ্ছে কেন, নারী-শিশু-বৃদ্ধ সবাইকে কচুকাটা করা হচ্ছে কেন? প্রিয় অং সান সুচি আপনি যতই দাবি করুন রাখাইনে পরিস্থিতি শান্ত, সবাইকে সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে; আপনি যতই রাখাইনকে আড়াল করে রাখার চেষ্টা করুন; বিশ্ববাসী জেনে গেছে আপনার আসল রূপ। আপনার সাথে তুলনা দেওয়ার জন্য এই মুহূর্তে আমার দুজন মানুষের নাম মনে পড়ছে- এডলফ হিটলার, যিনি ইহুদি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চেয়েছিলেন আর ইয়াহিয়া খান, যিনি বাঙালি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চেয়েছিলেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় তারা পারেননি। আপনিও পারবেন না। একটা জাতিকে কখনোই ধ্বংস করা যায় না।

মিয়ানমার সরকার যে সন্ত্রাসীদের কথা বলছে, তা হয়তো মিথ্যা নয়। মানলাম আরসা সন্ত্রাসী সংগঠন। কিন্তু এমন একটি সংগঠন কেন গড়ে উঠলো? এই প্রশ্নের উত্তর চলুন অং সান সুচির কাছ থেকেই শুনি। তিনি তার নোবেল বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘যখন মানুষের নিপীড়ন গ্রাহ্য করা হয় না, তখন সংঘাতের বীজ বপন করা হয়।’ প্রিয় সুচি আপনি যখন যুগের পর যুগ একটি জাতিকে ধ্বংস করতে চাইবেন, তাদের অস্বীকার করবেন, তাদের ওপর নিপীড়ন চালাবেন; তখন কি সেখানে সংঘাতের বীজ রোপণ করা হয় না? মানুষ যখন অস্তিত্বের সংকটে পড়ে, তখন ঘুরে দাঁড়ানো ছাড়া আর কিই বা করার থাকে? আপনি একে সন্ত্রাসী কর্মকা- বলতে পারেন, কেউ একে বলছে স্বাধীনতা সংগ্রাম। আমি বলবো, এটা অবশ্যম্ভাবী অস্তিত্বের সংগ্রাম।

গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘ সংগ্রাম এবং নিজ গৃহে বন্দি থাকার সময় অং সান সুচি নোবেল শান্তি পুরস্কার, শাখারভ পুরস্কারসহ অনেক সম্মানজনক পুরস্কার পেয়েছিলেন। এখন দেশে দেশে দাবি উঠেছে, তার সব পুরস্কার প্রত্যাহারের। মানবতাবিরোধী অপরাধে যার বিচার হওয়া উচিত, তার গলায় নোবেল বড্ড বেমানান। তবে আমার বেদনাটা অন্য জায়গায়। শুধু আমি নই, গোটা বিশ্বের মানবতাবাদীরা এখন ভুল মানুষকে ভালোবাসার বেদনায় নীল। বছরের পর বছর অং সান সুচি ছিলেন মানবতাবাদী মানুষের প্রেরণার নাম। আজ জানা যাচ্ছে, তার সম্পর্কে যা ভাবা হচ্ছিল, তিনি তার উল্টো মানুষ।

মিয়ানমার সরকার তাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের প্রহর গুনছে। রাখাইন রাজ্য রোহিঙ্গা শূন্য হবে, সেখানে সুন্দর অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠবে। মিয়ানমারের উন্নতি হবে। বাহ বাহ। কিন্তু গোটা বিশ্বের কাছে যে মিয়ানমার চিহ্নিত হলো নিপীড়ক রাষ্ট্র হিসেবে, তার কি কোনো দায় নেই?

অং সান সুচি জাতিসংঘে যাচ্ছেন না। কিন্তু এভাবে কি তিনি আড়াল করে রাখতে পারবেন তার মানবতাবিরোধী অপরাধ। একদিন অবশ্যই এর বিচার হবে। সুচির কাছে আমি আর কিছুই আশা করি না। খালি এই ছবিটা একটু তাকে দেখাতে চাই। রাখাইন থেকে পালাতে গিয়ে নৌকাডুবির কবলে পড়েন এই মা। নিজে বাঁচলেও বাঁচাতে পারেননি কোলের শিশুটিকে। প্রিয় শিশুকে শেষবারের মতো চুমু খাচ্ছেন এই মা। স্টেট কাউন্সিলর বা পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা নোবেল বিজয়ী বা গণতন্ত্রী সুচি নয়; একজন মা সুচির কাছে আমার প্রশ্ন কী অপরাধ করেছিল এই শিশুটি?

প্রভাষ আমিন: বার্তাপ্রধান, এটিএন নিউজ

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত