চীনের বার্মাপ্রীতি

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
 | প্রকাশিত : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১৫:৫৬

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বিশ্ব নেতা হতে চান। এ জন্য প্রায়ই ছুটছেন পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। মুক্ত বানিজ্য থেকে জলবায়ু পরিবর্তন, সব বিষয়েই তার আগ্রহ। কথাও বলেন অনেকটাই বিশ্ব নেতার মতো। যেমন গত সপ্তাহে ব্রিক্স সম্মেলনে তিনি বলেছেন, তার দেশ দারিদ্র্যে বাস করা মানুষের কষ্ট অনুভব করে। সম্মেলনের শেষ দিনে উন্নয়নশীল দেশ সমুহের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের জন্য তিনি ৫০০ মিলিয়ন ডলারের সাহায্য ঘোষণাও দিয়েছেন।

দারিদ্র্য, মানুষের কষ্টের নানা বর্ণনা দিলেও একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি মিয়ানমারে হত দরিদ্র রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিয়ে যাদের নিষ্ঠুর পথে নির্মূল করছে মিয়ানমার সরকার। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী বাড়িঘরে আগুন দিয়ে, জ্যান্ত  পুড়িয়ে, গুলি করে, জবাই করে মানুষ হত্যা করছে রাখাইনে। জীবন বাঁচাতে এর মধ্যেই বাংলাদেশে ছুটে এসেছে ৬ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। পৃথিবীতে নানা সময়ে অনেক জাতিগত নির্মূলের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির উপর যে ধরণের হিংসার প্রকাশ দেখা গেলো, তা ইতিহাসে বিরল।   

জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মানবাধিকার সংগঠন সমূহসহ নানা স্তর থেকে নিন্দা জানানো হলেও, চীনের মুখে মিয়ানমারের সুর। চীন বলছে সে তার বন্ধু দেশের সাথে আছে। মে মাসে চীনা নেতা ঘোষণা করেন, তার দেশ যেকোন ইস্যুতে থাকবে মিয়ানমারের সাথে। চীনের অন্ধ সমর্থন নিশ্চিত হয়েই আগস্ট মাসে ২৫ দারিখ থেকে সাম্প্রতিক কালের ভয়াবহ রোহিঙ্গা নির্মূল অভিযান শুরু করে নোবেল শান্তি পুরষ্কারের ভূষিত অং সান সুচির সরকার।

কিন্তু এত বড় একটা মানবিক সংকটে চীন এবাবে চুপ করে থাকতে পারে? এমন প্রশ্ন উঠছে বিশ্বব্যাপী। চীন বরাবরই রাষ্ট্রীয়ভাবে শরানার্থী বিরোধী। মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সাথে বিরোধে চীনে মাঝে মাঝেই আশ্রয় নেয় শরনার্থী। গত মার্চে মিয়ানমারের উত্তর পূর্বের কোকাং অঞ্চলে জাতিগত দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়লে হাজার হাজার চৈনিক আদিবাসী শরনার্থী আশ্রয় নেয় চীনের ইউনান প্রদেশে। চীন প্রাথমিক আশ্রয় দিলেও তাদের বেশিদিন রাখেনি নিজ দেশে।

বানিজ্যিক কারণে ভারতের অবস্থান মিয়ানমারের পক্ষে হলেও অন্তত দেশটি মানবিক সাহায্য পাঠিয়েছে। চীন তাও করেনি। চীন বলতে চায়, বিষয়টি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীন বিসয়। এটা মেনে নিয়েই বলা যায়, সমস্যা মিয়ানমারের, সমাধান করতে হবে মিয়ানমারকেই। কিন্তু ভিকটিম বাংলাদেশ। তাই চীনের ভূমিকা এখানে জরুরী। 

চীনের ট্রিলিয়ন ডলারের ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ অবকাঠামো প্রকল্পের বড় অংশিদার মিয়ানমার। মিয়ানমারে ১৯৮৮ থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে চীন। এর মধ্যে অতি সম্প্রতি করেছে প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার। চীন মিয়ানমারের প্রায় অবকাঠামোতে চীনের বিশাল বিনিয়োগ। এবং সেই বিনিয়োগ বিস্তৃত হচ্ছে রাখাইন পর্যন্ত। এমন বাস্তবতায় তার সুসম্পর্ক প্রয়োজন মিয়ানমারের সাথে। বানিজ্যিক স্বার্থের কাছে পরাজিত হয়েছে মানবিকতা। এবং চীনের নিজস্ব মানবাধিকারের রেকর্ডও কখনোই পাশ মার্ক পায়নি।

আমরা চীনকে বন্ধু দেশ বলি। কিন্তু ভূ-রাজনীতির দিক থেকে দেখলে চিনের আচরণ ঠিক বন্ধুত্বপূর্ণ নয়। চীন সীমান্ত নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে একটা অশান্তি জিইয়ে রাখতে চায়, যাতে বাংলাদেশ কখনও খুব নিশ্চিন্ত না থাকতে পারে। ‘ইসলামি সন্ত্রাসবাদ’ ছড়িয়ে পড়তে পারে এমন আশংকার আছে চীনের। এ ভয় বাংলাদেশেরও। তাই আরসার হামলার পর বাংলাদেশের তরফে মিয়ানমারের সঙ্গে যৌথ অভিযানের কথা বলা হয়েছিল।

চরম অত্যাচার, নির্যাতন ও গণহত্যার শিকার হয়ে তারা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। এই জনগোষ্ঠীকে গ্রহণ না করে বাংলাদেশের কোনো পথ ছিল না। কিন্তু রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে মিয়ানমারের যে নীতি ও পরিকল্পনা দিনে দিনে পরিষ্কার হচ্ছে, তাতে এদের ফেরত পাঠানো কঠিন। কারণ মিয়ানমারন সব ধরণের সমর্থন পাচ্ছে চীন থেকে।

মিয়ানমারে রয়েছে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ। তাই এর ওপর প্রভাব বিস্তারে সব সময সচেষ্ট চীন। তাই ‘ইসলামি সন্ত্রাসবাদের’ বিপদের পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বার্থ, বিনিয়োগ ও ভূরাজনীতির হিসাব-নিকাশটিকেই আসল কারণ চীনের এমন অন্ধ আচরন করা।

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: পরিচালক (বার্তা), একাত্তর টিভি

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত