আব্রাহাম লিংকন দাড়ি রেখেছিলেন কেন?

কবির হোসাইন কাব্য, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১৫:২৭

কার্য থাকলে তার একটা কারণও থাকবে। এই কার্যকারণ সম্পর্ক একটি প্রতিষ্ঠিত দার্শনিক তত্ত্ব। তবু মাঝে মধ্যে আমরা কারণ শূন্য কার্য দেখি না বা কার্যের অন্তঃর্নিহিত কারণটা খুঁজে বের করতে পারি না, এ রকম যে হয় না তা বলা যাবে না। আমাদের চারপাশের পুরুষের মধ্যে অনেকে দাড়ি রাখেন আবার অনেক অভ্যস্ত ক্লিন শেভ করেন। যারা দাড়ি রাখেন তারা কেন রাখেন? এটা ব্যক্তিগত রুচির ব্যাপার। তবুও এর বাইরে কিছু কারণ লুকানো থাকে। যেমনটি আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ষোড়শতম প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের দাড়ি রাখার পেছনে।

১৮৬০ সালে রিপাবলিকান পার্টির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সময়েও আবাহ্রাম লিংকনের মুখমন্ডল ছিলো শ্মশ্রুবিহীন। আবাহ্রাম লিংকন প্রায়ই তার দাড়ি রাখার পেছনে ছোট্ট স্কুলগামী বালিকার অনুপ্রেরণার কথা বলতেন। লিংকন সম্পর্কিত বড় বড় জীবনী কিংবা সমালোচনামূলক বইগুলোতে সেই ছোট্ট বালিকার প্রসঙ্গ উত্থাপিত না হলেও লিংকন নিজে কখনো সে মজার প্রসঙ্গটা উত্থাপন করতে ভুলতেন না। আব্রাহাম লিংকনের শ্মশ্রু-কাহিনির এই ক্ষুদে নায়িকার নাম গ্রেস বিডেল। নিউ ইয়র্কের ওয়েস্টফিল্ডের ১১ বছর বয়সের এক স্কুলগামী সে।

আমেরিকার আসন্ন প্রেসিডেন্ট প্রচারাভিযান যখন জোরেশোরে চলছে তখনই একদিন-গ্রেস বিডেলের বাবা নিয়ে আসলেন আব্রাহাম লিংকনের একটা ছবি। উপহার দিলেন তার আদুরে কন্যা বিডেলকে। গ্রেস বিডেলের মনে একটা অসংজ্ঞায়িত অনুভূতি জন্ম নিলো যে ছবির ঐ কৃশ লোকটি তার দিকে চেয়ে আছে।

আব্রাহাম লিংকনের সেই সাদাকালো ফটোগ্রাফ দারুণভাবে আকর্ষণ করলো একাদশী ওই বালিকাকে। প্রদীপের মৃদু আলোতে তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণের ফলে ছবিটা যেন জীবন্ত হয়ে

গেলো তার কাছে। ছবিতে লিংকনের মুখের চার পাশে একটা ছায়া পড়তেই মুহূর্তে ঢেকে গেলো তার গালের গর্তগুলো। মজার একটা জিনিস আবিষ্কার করে ফেলেছে এ

রকম ভঙ্গিতে হঠাৎ করে উল্লাসিত হয়ে উঠলো গ্রেস বিডেল। মনে মনে ভাবলো-ওই শেডের মতো ছবির এই লোকের মুখে দাড়ি থাকলে চমৎকার দেখাবে তাকে। কিন্তু কথাটা তো জানাতে হবে লিংকনকে। কাগজ-কলম নিয়ে তক্ষুণি লিখে ফেললো এই চিঠি:

‘ওয়েস্টফিল্ড, চোটাওকুয়া কোং,

নিউইয়র্ক

অক্টোবর ১৫, ১৮৬০।

মাননীয় এ, বি, লিংকন,

প্রিয় মহোদয়,

আমি এগার বৎসর বয়সের একজন মেয়ে। কিন্তু আমি আন্তরিকভাবে চাই যে আপনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হন। তাই আশাকরি আপনার মতো একজন মহান ব্যক্তির কাছে

চিঠি লেখার জন্য আমাকে খুব সাহসী মনে করবেন না।

আমার বয়সী আপনার কোনো মেয়ে থাকলে তাদের আমার ভালোবাসা জানাবেন এবং আপনি এ চিঠিটার উত্তর না দিতে পারলে তাকে লিখতে বলবেন। আমার চার ভাই

এবং তাদের একটা অংশ আপনাকে ভোট দেবে। আর আপনি যদি ‘দাড়ি’ রাখেন তবে আমি চেষ্টা করবো যাতে বাকি অন্যরা আপনাকে ভোট দেয়। আপনার মুখমন্ডল কৃশ। তাই দাড়ি রাখলে আপনাকে অপেক্ষাকৃত বেশি ভালো দেখাবে। সব মহিলাই দাড়ি পছন্দ করেন এবং তারা তাদের স্বামীদের আপনার পক্ষে ভোট দিতে বলবেন এবং তখনই আপনি প্রেসিডেন্ট হবেন।

গ্রেস বিডেল’

সে সময় আব্রাহাম লিংকনের নির্বাচনী প্রচারাভিযানের হেডকোয়ার্টার দৈনিক প্রায় পঞ্চাশটি করে চিঠি আসতো। কেবলমাত্র বন্ধু-বান্ধবদের ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের চিঠি দু’জন তরুণ সেক্রেটারি জন নিকোলে ও জন গের হাত পেরিয়ে লিংকনের কাছে পৌঁছাতো।

গ্রেস বিডেলের চিঠি প্রথমে জন গের হাতে পড়ে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার সহজ পথ বাতলানো সে চিঠিটি জন গে ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটে ফেলে দিতে পারলেন না যদিও জন নিকোলে ওইসব ফালতু জিনিস বাদ দিয়ে দরকারি কাজে মন দিতে বারবার উপদেশ দিলেও জন গে তার কথায় কান দেননি। একজন মেয়ের চিঠিটার মধ্যে তিনি যেন একটা মূল্যবান জিনিস খুঁজে পেয়েছেন। তাই নিকোলোর সঙ্গে এ নিয়ে কথা কাটাকাটি হলেও অবশেষে ঠিকই চিঠিটা পৌঁছে গেলো লিংকনের হাতে।

কয়দিন পরই গ্রেস বিডেল তার চিঠির উত্তর পেলো লিংকনের কাছ থেকে। স্পিং ফিল্ড থেকে ১৮৬০ সালের ১৯ অক্টোবরে লেখা সে চিঠির উপরে ‘প্রাইভেট’ সিল লাগানো ছিলো।

চিঠিটি ছিলো এ রকম:

‘প্রিয় ক্ষুদে মিস,

তোমার ১৫ তারিখের চমৎকার চিঠি আমি পেয়েছি। দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে আমার কোনো কন্যা সন্তান নেই। আমার তিন ছিলে-একজনের বয়স সতেরো, একজন নয় আর একজন সাত বছরের। তারা এবং তাদের মাকে নিয়েই আমাদের পরিবার। দাড়ির ব্যাপারে যা কখনো রাখিনি, তুমি কি চিন্তা করো না যে আমি এখন দাড়ি রাখলে লোকে এটাকে নির্বোধ স্নেহের কাজ বলবে?

তোমার একান্ত শুভাকাক্সক্ষী

এ, লিংকন।'

যাহোক, আব্রাহাম লিংকন সে নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। পরের বছর ১৬ ফেব্রুয়ারিতে তিনি একটি বিশেষ ট্রেনে করে হোয়াইট হাউজে এসেছিলেন তখন পথে তিনি ওয়েস্টফিল্ডের কাছাকাছি একটি স্টেশনে থেকে এক জনসভায় বক্তৃতা দেন। বিডেলের পরিবারও অন্যদের সঙ্গে সেখানে এসেছিলো নব নির্বাচিত প্রেসিডেণ্টকে অভিনন্দন জানাতে। স্টেশনের চার দিকের রঙিন ব্যানার ফেস্টুনে তখন বড় বড় অক্ষরে লেখা ‘হেইল টু দ্যা চিফ’। লোকে লোকারণ্য সেই স্টেশন এলাকা। বারাবার উকি দিয়েও বিডেল দূরের মঞ্চে আসীন লোক গুলোকে দেখতে পারছিলেন না।

‘লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান’ মাইকে এটুকু ধ্বনিত হতেই জনতার মাঝে নেমে আসলো আশ্চর্যরকম স্তব্দতা লিংকন বলতে লাগলেন, ‘আমার বক্তৃতা দেবার কিছু নেই, নেই কথা বলার পর্যাপ্ত সময়। আমি আপনাদের এখানে এসেছি যাতে আমি আপনাদের সাথে দেখা করতে পারি এবং আপনারা আমার সঙ্গে দেখা করতে পারেন।’

এ কথাটুকু শুনেই বিডেল যেন একেবারে বরফ-শীলতা অনুভব করলো। ইনিই কি তাহলে সেই আব্রাহাম লিংকন। ছবিতে যাকে দেখেছিলো। যার কাছে সে চিঠি লিখে উত্তর পেয়েছিলো?

লিংকন আবার বলতে লাগলেন ‘আজ আমাদের দেশের পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে আপনাদের একটা প্রশ্ন করবো, আমি যেমন এই পতাকার পাশে দাঁড়িয়ে আছি আপনারা কি সেভাবে আমার পাশে দাঁড়াবেন? হাত, টুপি আর মহিলারা রুমাল উড়িয়ে সহস্র কণ্ঠে জানিয়ে দিলেন- ‘yes yes-we sure will, Abe!’বক্তার কথাগুলো আরো একবার চমৎকৃত করলো বিডেলকে। কিন্তু না শুধু চমৎকৃত না, এবার আব্রাহাম লিংকন এবার বললেন, ‘এখানের আমার একটু ছোট্ট যোগাযোগ আছে। আমার চেহারায় যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে তার অনুপ্রেরণা এসেছে এক ছোট্ট মহিলার কাছ থেকে। যে যদি এখানে উপস্থিত থাকে তো আমি তার সঙ্গে কথা বলতে পারলে খুশি হবো। তার নাম গ্রেস বিডেল।’

গ্রেস বিডেলের পিতা তার উপরে তুলে ধরে জানিয়ে দিলেন যে গ্রেস উপস্থিত আছে। মুহূর্তে বিশাল জনসমুদ্রে প্রশস্ত পথ তৈরি হতে থাকলো তাদের মঞ্চে যাওয়ার জন্য। সবাই শুধু ফিস ফিস করে বলতে লাগলো কে এই বালিকা, লিংকন যার নাম ধরে সাক্ষাতের আহ্বান জানিয়েছেন। লিংকন আবার বললেন ‘সে আমাকে লিখেছিলো, সে মনে করে যে আমি দাড়ি রাখলে আমাকে আরো ভালো দেখাবে।’ এবার লিংকন থামলেন। বিডেল মঞ্চে উঠে এসেছেন। লিংকন দু’হাতে তাকে উপরে তুলে ধরলেন, চুমোয় ভরিয়ে দিলেন তার পেলব কাপপল, তারপর নামিয়ে রাখলেন মঞ্চে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিলো যে লিংকনের আশে পাশের সেই বিশাল জনসমুদ্র বিলীন হয়ে গেছে, আছে শুধু লিংকন আর বিডেল।

আনন্দে গ্রেস বিডেল কেঁদে ফেলে আর কী! লিংকন যখন বললেন, ‘দেখো, তোমার জন্যই আমি দাড়ি রেখেছি গ্রেস তখন নির্বাক বিস্ময়ে একজন লম্বা কৃশ মহান ব্যক্তিত্বকে দেখছিলো।

লিংকন গ্রেসের হাত ধরে তাকে মঞ্চের সোপানে নামিয়ে দিতে দিতে জানালেন সে আবার তিনি তার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পেলে খুশি হবেন। বিশাল জনতার করতালির মধ্য দিয়ে গ্রেস ফিরে এলা তার গর্বিত পিতার কাছে। স্প্রিং ফিল্ডের আব্রাহাম লিংকনের সাদা দু’তলা বাড়িটি আজো সে রকম আছে যে রকম ছিলো লিংকনের সময়ে।

সে বাড়ির একটি দেয়ালে আজো বাঁধানো আছে একটি চিঠি, ‘Dear Sir, ‘I am a little girl, II years old’ গ্রেস বিল্ডের সেই চিঠি।

আর লিংকনের নিজের হাতে লেখা, গ্রেসের চিঠির উত্তরটিও গ্রেস বিডেল সযত্নে সংরক্ষণ করেছিলো অনেকদিন পর্যন্ত। পরে ১৯৬৬ সালে গ্রেস বিল্ডের তিন দৌহিত্র সেই চিঠিটি নিলামে বিক্রি করেছিলো বিশ হাজার মার্কিন ডলার মূল্যে। এই চিঠির ক্রেতা টিভি প্রযোজক ডেভিড উলপার নিজেকে একজন ‘লিংকন ফ্যান’ বলে মনে করতেন।

চিঠিটা ঐ ভদ্রলোকের আবেগতাড়িত হয়ে কিনেছিলেন কিনা সেটা বড় কথা। একজন ভাবী রাষ্ট্রনায়কের কাছে দাড়ি রাখার পরামর্শ (অন্য কথায়, নির্বাচনে জয় হওয়ার

উপায় বাতলানো পরামর্শ) দিয়ে সেই ছ্ট্টো বালিকার চিঠি দেয়া আর সেই পরামর্শ মতো, সেই রাষ্ট্রনায়কের দাড়ি রাখা সেটাই বড় কথা এবং মজার কথা।

(ঢাকাটাইমস/২০সেপ্টেম্বর/এজেড)

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত