ঐতিহ্যের ছাপ দানবীর রণদা প্রসাদ পূজামণ্ডপে

জাহাঙ্গীর হোসেন, মির্জাপুর (টাঙ্গাইল)
 | প্রকাশিত : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১৩:০৭

তোরণ নেই, নেই আলোজসজ্জা। প্রতিমা ও মণ্ডপটিও সাদামাটা। তবু সাদামাটা এই মণ্ডপটি দুর্গোৎসবের সময় এখনও মির্জাপুর তথা টাঙ্গাইলের মূল আকর্ষণ। এই পূজামণ্ডপটি হলো মির্জাপুর উপজেলা সদরের লৌহজং নদী তীরের দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার।

তবে কবে থেকে এখানে এই পূজা শুরু হয়, তার সঠিক হিসাব কেউ বলতে না পারলেও প্রায় ৩শ বছর হবে বলে জানান কুমুদিনী কল্যাণ সংস্থার শিক্ষাবিষয়ক পরিচালক প্রতিভা মুৎসুদ্দী।

মির্জাপুর গ্রামের প্রায় শত বছরের প্রবীণ ব্যক্তি ঋষিকেশ সাহা জানান, এই মণ্ডপের পূজাটি শরীকি হলেও ১৯৪২ সাল থেকে দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা এককভাবে মহাধুমধামে পূজা করতে শুরু করেন।

তিনি জানান, প্রতিবছর পূজার সময় রাতে কোন বছর পাঁচ দিন, আবার কোন বছর সাত দিনব্যাপী যাত্রাপালার আয়োজন করতেন। যাত্রাপালা চলার সময়ে বাড়ির পশ্চিম পাশে রশিক ভবনের পেছনের বিশাল মাঠে লঙ্গরখানা খুলে প্রতিমা দর্শন ও যাত্রাপালা শুনতে আসা হাজার হাজার মানুষকে খাওয়াতেন। এই পূজামণ্ডপকে কেন্দ্র মির্জাপুর পুরো গ্রামটিই জাতি-ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে মিলনমেলায় পরিণত হতো।

১৯৫২ সাল থেকে দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা মহাষ্টমীর দিনে হাজার হাজার মানুষের মধ্যে বস্ত্র বিতরণ শুরু করতেন। ষাট দশকের মাঝামাঝি সময়ে এই বস্ত্র বিতরণের সময় দুর্ঘটনা ঘটায় তিনি পরবর্তীতে এলাকার জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে বস্ত্র বিতরণ অব্যাহত রাখেন বলে জানান, মির্জাপুর উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অতুল প্রসাদ পোদ্দার ও সম্পাদক পীযুষ কান্তি সাহা নন্দ।

পূজার সময় ১২ জোড়া ঢাকি ঢাক বাজাতেন, এছাড়া রশিক ভবনের পেছনে তৈরি করা প্রায় ৬০ ফুট উঁচুতে তৈরি করা নহবতখানা থেকে সানাই বাজানো হতো। এই যাত্রাপালায় সুদূর কলকাতার নাট্য কোম্পানির শিল্পীরাও অভিনয় করতেন।

দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার দুর্গাপূজা উপলক্ষে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে প্রতিটি বাড়িতেই নায়ড়ী-ঝিয়াড়ীসহ আত্মীয়-স্বজনে পরিপূর্ণ হয়ে উঠত বলে জানা গেছে।

উপজেলার সদরের বাওয়ার কুমারজানী গ্রামের বাসিন্দা সাবেক কাউন্সিলর বয়োবৃদ্ধ হাজী সিরাজ মিয়া জানান, দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার বাড়ির পূজামণ্ডপের অনুষ্ঠান উপভোগ করতে যাতায়াতের সুবিধার্থে আমরা মির্জাপুরের পাশের গ্রাম পুষ্টকামুরী শ্বশুড়ালয়ে পূজার সময়টাতে  অবস্থান করতাম।

পুষ্টকামুরী গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা লাল মিয়া জানান, দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার বাড়ির দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে এলাকার প্রতিটি বাড়িই আত্মীয়-স্বজনে ভরপুর থাকত।

১৯৭১ সালের ৭ মে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকবাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের হাতে দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা ও তার একমাত্র পুত্র ভবানী প্রসাদ সাহা নির্মমভাবে নিহত হওয়ার পর দানবীরের পূজামণ্ডবের অনেক কিছুই আর নেই, বিশেষ করে যাত্রাপালা ও লঙ্গরখানা।

নহবতখানায় কলকাতা থেকে আনা সানাইয়ের ক্যাসেট বাজানো হয়। নানা কারণে বস্ত্র বিতরণও সীমিত করা হয়েছে।

মির্জাপুরসহ টাঙ্গাইলের বিভিন্ন উপজেলায় শারদীয় উৎসব উপলক্ষে বিভিন্ন পূজামণ্ডবে লাখ লাখ টাকা খরচ করে তোরণ নির্মাণ করা হয়। করা হয় চোখ ধাধানো আলোজসজ্জা। দেশি-বিদেশি শিল্পী এনে আধুনিক ডিজাইনের প্রতিমাও তৈরি করা হয়। কিন্তু তারপরও সাদামাটা এই পূজামণ্ডবটি এখনও মির্জাপুরের শারদীয় উৎসবের মূল আকর্ষণ হিসেবে অম্লান রয়েছে।

প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শনার্থী সাদামাটা এই প্রতিমাটি দেখতে ভিড় জমান। এছাড়া দেশি-বিদেশি ভিআইপিদের ভিড়ও পূর্বের মতোই রয়েছে।

টাঙ্গাইল জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি সুভাষ চন্দ্র সাহা জানান, দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার পূজামণ্ডপ শুধু মির্জাপুরের নয়, শারদীয় উৎসবে সারা টাঙ্গাইলেরই পূজারীদের কাছে এখনও মূল আর্কষণ বলে তিনি মন্তব্য করেন।

(ঢাকাটাইমস/২৪সেপ্টেম্বর/প্রতিনিধি/এলএ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত