ডাকলেই বাড়ি আসবে ‘গাছের ডাক্তার’

কাজী রফিকুল ইসলাম, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১৩:৩৭

ছাত্র পড়াতে গিয়ে, ছাত্রের মুখে শুনলেন, গাছ লাগানো মালির পেশা। সেই ছেলেটার এমন ধারণা পাল্টে দিতেই তাকে তার প্রিয় ফল স্ট্রবেরির দুটি গাছ উপহার দেন তিনি। নিজের কাছেও ভালো লাগে আহসান রনির। ভাবলেন গাছের সাথে জড়িয়ে থেকেই কিছু করা যায় কিনা। শুরু করলেন গাছের চারা বিক্রির ব্যবসা। ধীরে ধীরে সেটা বেশ ছড়িয়েও পড়লো। চেনাজানা অনেককেই অবশ্য উপহার হিসেবে গাছ দিয়েছেন আহসান রনি। তাদের বাসার ছাদে, বারান্দায় গাছ লাগাতে উৎসাহিত করেছেন। আর সে গাছে পরিচর্যার উপায় বের করতে গিয়েই তিনি আজ ‘গাছের ডাক্তার’।

হ্যাঁ ঠিকই শুনছেন, গাছের ডাক্তার। গাছের পরিচর্যা যারা করে প্রচলিত ভাষায় তাকে বলে মালি। আর মালি পেশাটি পেশা হিসেবে যেমনই হোক আমাদের দেশে খুব একটা সম্মান পাননা তারা। তাই তিনি নাম রেখেছেন গাছের ডাক্তার। শুধু নিজে না, তরুণ প্রজন্মের আরো কয়েকজনকে প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করেছেন আরো বেশ কজন গাছের ডাক্তার। তাদের সাথে নিয়েই আহসান রনির প্রতিষ্ঠান ‘গ্রিন সেভারস’। রাজধানীর ছোটবড় মিলিয়ে প্রায় ২৯ হাজার বাগানে তাদের স্বচ্ছল পদচারণা। এসব বাগানে গাছের প্রয়োজনে চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন গাছ গ্রিন সেভারসের ডাক্তাররা।

গাছের উন্নত সেবা ও ব্যবস্থাপনার তাগিদে বাগান মালিকরা অসুস্থ গাছ নিয়ে আসে গ্রিন সেভারসের কাছে। ডাক্তারদের তত্ত্বাবধানে গাছগুলোকে সেবা দেয়া হয়। প্রয়োজনীয় ওষুধ দিয়ে সারিয়ে তোলা হয়।

দুই বছর যাবৎ তাদের এই ‘বৃক্ষ ক্লিনিক’ চালু করেছে গ্রিন সেভারস। বয়স কম হলেও বেশ সাড়া পাওয়া গেছে অল্প দিনের মধ্যেই। বর্তমানে প্রশিক্ষিত সতের জন ডাক্তার আছেন এই ক্লিনিকে। প্রশিক্ষণ দিয়ে গাছের ডাক্তার বাড়ানোর কাজও চলছে সমান তালে। এই তরুণ বৃক্ষ চিকিৎসকদের মধ্যে রয়েছেন উদ্ভিদবিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রিধারীরাও।

নাগরিক জীবনে শত ব্যস্ততার মধ্যে বাগান করা এবং গাছ লাগানো সহজ কাজ না। তবুও সবুজ প্রকৃতিকে ভালবেসে অনেকেই বাগান করেন। গড়ে তোলেন শখের বাগান। কিন্তু ঠিকঠাক পরিচর্যা করতে না পারলে গাছ বাঁচে না। তাছাড়া সবার এ বিষয়ে জ্ঞানও থাকে না। আর এসব ভাবনার অবসান ঘটানোর জন্যই নিয়মিত কাজ করছে ‘গ্রীন সেভারস’। ডাকলেই তারা এসে হাজির হবে আপনার বাড়িতে। চিকিৎসা আর পরিচর্যা দেবে আপনার বাগানের অসুস্থ গাছকে।

রাজধানীর শেরে বাংলা নগরের রেডিও ভবনকে হাতের ডানে কিছুটা এগিয়ে গেলেই পরিবেশ অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের দক্ষিণ গেটে তাকালেই চোখে পড়বে গ্রীন সেভারস এর অফিস। গ্রিন সেভারসের অফিসেও প্রকৃতির ছোয়া, চারদিকে সবুজের সমারোহ। দুরদুরান্ত থেকে বাগান মালিকরা গাছের বিশেষ পরিচর্যা ও চিকিৎসার জন্য এখানেই রেখে যাচ্ছেন নিজের গাছকে।

গাছকে কেন্দ্র করে ভাবনার অভাব নেই গ্রিন সেভারসের পেছনের মানুষগুলোর। কিছু ভাবনা পরিবেশকে সবুজ করে টিকে থাকার, আর কিছু ভাবনা সবুজকে টিকিয়ে রাখার। ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলের দেশটিতে নেই চাহিদা অনুপাতে পর্যাপ্ত পরিমাণ গাছ। পরিসংখ্যান বলছে, এমন অবস্থা চললে বাংলাদেশ মুখোমুখি হবে চরম প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের। অথচ দেশের ৬০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সাথে জড়িত, মানে কোনো না কোনোভাবে প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। আর এই প্রকৃতিকে বাঁচাতেই প্রাণপণ লড়ছে গ্রিন সেভারস।

পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বোতল, ভাঙা মগ, ভাঙা বালতি, বদনা, জুতা, মদের বোতল ব্যবহার করে গাছ লাগাচ্ছেন তারা। অপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলোকে কাজে লাগিয়ে একদিকে যেমন পরিবেশের দূষণ কমাচ্ছেন, অন্যদিকে বাড়াচ্ছেন গাছেরও পরিমাণ।

সাত বছরের পথ চলায় যতেষ্ঠ সফলতাও রয়েছে। যারা বাসার ছাদে বাগান করতে আগ্রহী এমন উনত্রিশ হাজার বাগান তৈরি ও পরিচালনা করছেন তারা। তবুও নিজেকে অপারগ দাবি করলেন গ্রিন সেভারসের প্রধান আহসান রনি। বললেন, "ঢাকা শহরে সাড়ে চার লাখ ছাদ রয়েছে। গত সাত বছরে কেবল উনত্রিশ হাজার বাগান করতে পেরেছি, যা মোট ছাদের এক শতাংশও না।"

আবার সাত বছরের এই অর্জনকে খুব একটা ছোটো করারও অবকাশ নেই গ্রিন সেভারের। গ্রিন সেভারের শুভাকাঙ্খী স্কুল শিক্ষক নাইমুর রহমান নাইম ঢাকাটাইমসকে বলেন, "সাত বছরে কত দিন হয়? দু হাজার- আড়াই হাজার দিন। সে তুলনায় গ্রিন সেভারের প্রচেষ্টা ব্যাপক। আমরা প্রত্যেকে যদি মাসেও একটা গাছ লাগাই। সেটাও অনেক হয়ে দাঁড়াবে।"

বাগান পরিচর্যায় খুব বেশি অর্থ নেন তাও কিন্তু নয়। যতদিন পরিচর্যা করাবেন তার প্রত্যেকদিন প্রতিটি গাছের জন্য মাত্র এক টাকা করে দিতে হবে বাগান মালিককে। এছাড়া গাছ আনা নেয়ার জন্য আছে প্লান্ট অ্যাম্বুলেন্স। রাস্তায় আনা-নেয়ার সময় কোনোভাবে যেন গাছগুলো ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং গাছে আলো বাতাসের ঘাটতি না হয়, এজন্যই এমন বিশেষায়িত অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানান আহসান রনি।

'আমার হাতে গাছ হয় না'- প্রচলিত এ কথাটিকে ভিত্তিহীন আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, "এগুলো কোনো কথা না। গাছ নষ্ট হয় পরিচর্যার অভাবে। তিনদিন পানি না দিলে পাতা হলুদ হয়ে যাবে। কয়েকদিন এ অবস্থায় থাকলে গাছটি মারা যাবে। গাছের গোড়ায় সিজনের আগে একটু সার দিলে ভাল ফল আসবে।"

তিনি আরও জানান, ‘ঢাকা শহরে গাছ আছে, গাছ লাগানোর জায়গা আছে। কিন্তু পরিচর্যা নেই। রাস্তার ধারের ফল গাছের পাতাগুলো আমরা যদি একটু ছেঁটে দেই, তাহলেই কিন্তু ফল ধরবে। আমরা যারা একটু সচেতন, যারা রাস্তার খাবার খাই না, তারা হয়তো এই রাস্তার ধারে ধরে থাকা গাছের ফলটা খাবো না। কিন্তু অনেক ছিন্নমূল মানুষ আছে, যারা ফল খেতে পায় না। তারা তো একটা-দুটো ফল খাওয়ার সুযোগ পাবে। না হয় ফলগুলো পাখিই খেল। পাখিরা ফল খাবে, বীজটা অন্য কোথাও ফেলবে, সেখানে আর একটা গাছ হবে। এটা প্রকৃতিক সিস্টেম। আমাদের নিয়মটা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’

দূর দূরান্ত থেকে গ্রীন সেভারসের কাছে গাছের ডাক্তারি শিখতে অনেকেই আসেন। তাদের একজন এস এম ফয়সাল মাহমুদ। উদ্ভিদবিদ্যায় পড়াশোনা শেষ করে এসেছেন এখানে। চান তথাকথিত পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে নতুন ধারার সন্ধান। ঢাকাটাইমসকে তিনি বলেন, 'এসেছি কিছু শিখতে। আশা করছি অনেক কিছু শেখা হবে। থিউরিটিক্যাল জ্ঞান অর্জন করেছি অনেক। এখানে এসে গাছের ডাক্তারি শিখতে গিয়ে বুঝতে পারলাম থিউরিটিক্যাল এবং প্রাকটিক্যালের মধ্যে বিস্তর ফারাক।’

ঢাকাটাইমস/২৫সেপ্টেম্বর/কারই/কেএস

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত