চাঁদের আলোয় পড়তো যে ছেলেটি

কাওসার শাকিল, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১৪:১২ | প্রকাশিত : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১৪:০৯

কেরোসিনের তখন অনেক দাম। ১৬ টাকা করে কেজি। তাই রাতের বেলা অতো দামের তেল পুড়িয়ে পড়ালেখা করা বারণ ছিলো। কিন্তু রাতের বেলা না পড়লে ছেলেটার ঘুম আসে না। তাই চাঁদের আলোয় পড়তো সে। এস এম নাদিম মাহমুদ নামের সেদিনের সেই ছেলেটা পড়তে পড়তে স্বপ্ন দেখতো একদিন সে অনেক বড় হবে। কৃষকের ঘরে জন্ম নেয়া ছেলেটার সাহস ছিলো বুক ভরা। আর ছিলো বড় হবার প্রচণ্ড ইচ্ছে। সেই ইচ্ছে আর তার অধ্যবসায়, এই দুই মিলে নাদিম মাহমুদ বাংলাদেশের মানুষের হার না মেনে নেয়ার দুর্দান্ত উদাহরণ। কেরোসিনের অভাবে চাঁদের আলোতে পড়তে বসা সেদিনের সেই কৃষকের সন্তান এস এম নাদিম মাহমুদ জাপানের ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স শেষ করে পিএইচডি করছেন এখন।

নাদিম নওগাঁর বদলগাছীর এক নিম্ন মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারের ছেলে। বাবা পুরোদস্তর কৃষক আর মা গৃহিনী। বাবা পড়াশোনা জানেন না একদমই, মা ক্লাস সিক্স পর্যন্ত পড়েছিলেন। তাদের তিন ভাই বোনের পড়ালেখা নিয়ে তাই মায়েরই আগ্রহ ছিলো সবচেয়ে বেশি। অথচ অভাবের সংসারে তিন বেলা খাবারই পায় না নাদিমরা। প্রচণ্ড শীতের সময় একটা ফিনফিনে পাতলা শার্ট পরে পড়তে যেতেন। সেসব দিনের কথা মনে করে বললেন, ‘একদিন আব্বা দুই মণ আলু বিক্রি করে ২’শ টা পেলো। ওই টাকা দিয়ে আমাকে এক দোকানির কাছ থেকে কিস্তিতে পাঁচশ টাকার একটা জ্যাকেট কিনে দিয়েছিল। তবে দোকানির শর্ত ছিলো, পাঁচশ টাকার বদলে তাকে ছয়শ টাকা দিতে হবে কিস্তিতে।’

নাদিম সেইসব কষ্টের দিনের কথা আজও ভোলেননি। বলছিলেন ‘সংসারে অভাব তখন এমন পর্যায়ে, তখন তাদের তিন ভাই-বোনের পড়ালেখা প্রায় দু:স্বপ্নের মতই ছিলো। কলেজ পর্যন্ত তাকে টেনে নিয়ে যেতে দুই দফা জমিও বিক্রি করতে হয়েছে তাকে। কিন্তু শত বাধার মধ্যেও নাদিমের মা তার অবস্থান থেকে সরে আসেননি এক চুলও, স্বামীকেও সরে আসতে দেননি। ছেলে মেয়েদের পড়ালেখা শিখিয়ে মানুষ করবেন এই ছিলো তার একমাত্র সংকল্প।

আর সেজন্যই নাদিম আর তার ভাই বোনের পড়ালেখার খরচ যোগাতে গিয়ে নিজের গহনা, রান্নাঘরের হাড়ি পাতিল, গোয়াল ঘরের গরু বিক্রি কোনো কিছু বিক্রি করতে পিছপা হননি তিনি। নাদিমও বুঝতো বাবা মায়ের এ কষ্ট। তাই প্রতিদানে প্রথম হওয়া ছাড়া দ্বিতীয় হয়নি কখনোই। যখন স্কুলে এসএসসির ফরম ফিলআপ চলছিল, তখন নাদিমের মা নিজের কানের দুল আর তাদের বাড়ির উপর থাকা কড়ই গাছ বিক্রি করেছিল টাকা যোগাড় করতে। সেই টাকা দিয়ে স্কুলের ফরম পূরণ করেছিলো নাদিম।

এইচএসসির পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজিতে পড়ার সুযোগ পেলেন নাদিম। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পড়তে সংসারের খানিকটা ভার এসে পড়ে তার কাঁধে। টিউশনি করে, কোচিং সেন্টারে ছাত্র পড়িয়ে সেই টাকায় তিন ভাই-বোনের পড়ালেখার খরচ চালাতো নাদিম।

রাজশাহীতে ভাই বোনদের এনে পড়ালেখা করাতে চাইছিলো নাদিম। তাই একটা বাসা কোথাও পাওয়া যায় কিনা সে খোঁজ করছিলো। খুঁজতে খুঁজতে একটা বাড়ি পেয়েও গেল। তেরোখাদিয়া উপশহরের সেই বাড়িওয়ালা নাদিমকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার বাবা কি করেন?’ নাদিম উত্তর দেয় ‘আমার বাবা কৃষক।’ তখন সেই ভদ্রলোক বলে বসলেন, ‘কৃষকের ছেলে হয়ে তুমি এখানে কেন বাসা ভাড়া নিতে এসেছো? আমি কোন কৃষকের ছেলেকে বাসা ভাড়া দেবো না।’

সেদিন খুব গায়ে লেগেছিলো কথাটা। আজও সেই বাড়িওয়ালা লোকটার শ্লেষ ভরা কথাটুকু কানে বাজে নাদিমের। কিন্তু লড়াই করতে করতে যার এতোদূর আসা, তার তো এতো সহজে হার মানার কথা না। নাদিমও মানেনি। নিজের চেষ্টায় নিজেকে প্রমাণ করেছেন বারবার। তার দেখাদেখি ভাই বোনরাও নিজেদের গড়ে নিয়েছে। ছোট ভাই নাহিদ হাসান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স থেকে মাস্টার্স করছেন। আর ছোট বোন নাজমুন নাহার বাংলায় চতুর্থ বর্ষে।

নাদিম বলছিলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ বর্ষে থাকা অবস্থায় পেয়ে যাই জাপানে পড়ার সুযোগ। মনবসু স্কলারশিপের অধীনে মাস্টার্স লির্ডিং পিএইচডি কোর্স। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স শেষ করতে ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে গেল আমার নতুন শিক্ষালয়। দুই বছর অপেক্ষা করে আজ সেই দিনটি পেলাম, যে দিনটির জন্য আমি, আমার মা, আমার বাবা, আমার বাবা, আমরা সবাই অপেক্ষায় ছিলাম। এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আজ সমাবর্তনে পেলাম মাস্টার্স অফ ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি।’

তবে নাদিম জানেন, এখানেই শেষ নয়। অনেক দূর, আরো অনেক দূর তাকে যেতে হবে। পথ পেরুতে হবে আরো অনেকটা। জেনোটিক্যাল ইনকোডেড ন্যানোসেন্সর নিয়ে গবেষণারত নাদিম মাহমুদ তাই পিএইচডি শেষ করে তবেই বাড়ি ফিরবেন। আজকের জন্য অবশ্য এটুকু অর্জনও কম নয়। তাই নাদিম বলছিলেন, ‘আমি শুধু বলতে চাই- মা, তোমার ছেলের এই অর্জন সম্ভব হয়েছে কেবল তোমার জন্য। বাবা তুমি কৃষক হয়েছিলে বলে, আজও আমি গর্ব করে বলতে পারি আমি কৃষকের সন্তান। এই বাঙলা মায়ের সন্তান। শিক্ষা জীবনের এই অর্জনটুকুও তোমাদেরকেই উৎসর্গ করলাম। শুকরিয়া মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি।’

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত