বরিশাল-১: আ.লীগের অভিভাবক বনাম বিএনপির বিভক্তি

বরিশাল ব্যুরো, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ১৩ অক্টোবর ২০১৭, ১০:০৩

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বরিশাল-১ আসনে আওয়ামী লীগের এমপি ছিলেন জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ভগ্নিপতি ও ১৫ আগস্টের শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত। নব্বই-পরবর্তী গণতান্ত্রিক যাত্রার শুরুতে ’৯১’ ’৯৬-এর নির্বাচনে এখানে জয়ী হন তার ছেলে আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ। সেই থেকে এখানে এমনকি পুরো দক্ষিণেই আওয়ামী লীগের অভিভাবক হিসেবে গণ্য করা হয় তাকে।

গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত  বরিশাল-১ আসনে তাই হাসানাতেই ভরসা স্থানীয় আওয়ামী লীগের। দলে আর কেউ মনোনয়নও চাইছেন না।

অন্যদিকে আন্দোলন-সংগ্রামে ব্যর্থ বিএনপিতে এখন তিন ধারা বিভক্তি। যদিও তারা বলে এখানে বিএনপির মূল লড়াইটা হলো হাসানাত ঠেকানোর, কিন্তু এই বিভক্তি নিয়ে লড়াইয়ে দলটি কতটুকু এগুতে পারবে সেটাই এখানকার মানুষের নির্বাচনী ভাবনা।   

সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে এখানে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি হন হাসানাত আবদুল্লাহ। এর আগে এক-এগারোর সরকারের অধীনে নির্বাচনের সময় তার অনুপস্থিতিতে বিএনপির প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবাহানকে হারিয়ে এমপি হন বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট তালুকদার মো. ইউনুস।

এরপর থেকে একরকম আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর এলাকা হয়ে যাওয়া এই আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকায় রয়েছেন দলের অন্তত পাঁচজন নেতা। কেন্দ্রীয় কমিটির বরিশাল বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও বরিশাল উত্তর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান, বিএনপির সাবেক এমপি এম জহিরউদ্দিন স্বপন, দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবাহান, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট গাজী কামরুল ইসলাম সজল এবং বরিশাল জেলা উত্তর বিএনপির সহ-সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার ড. এম শাহ আলম মনোনয়নের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

এ ছাড়া জাতীয় পার্টির (এরশাদ) ঢাকা দক্ষিণ শাখার সদস্য অ্যাডভোকেট সেকেন্দার আলী, জাপার কেন্দ্রীয় সদস্য এস এম রহমান পারভেজ, গৌরনদী জাপা’র সভাপতি অ্যাডভোকেট ইউনুস বেপারী, অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাপার প্রার্থী আগৈলঝাড়া উপজেলা জাপার সাধারণ সম্পাদক সরদার হারুন রানা এবং গৌরনদী উপজেলা জামায়াতের সাবেক আমীর হাফেজ মাওলানা মো. কামরুল ইসলামের নাম এখানে প্রার্থী হিসেবে শোনা যাচ্ছে।

সাম্প্রতিক নির্বাচনী ইতিহাস অনুযায়ী ১৯৯১ সালে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী কাজী গোলাম মাহবুব ওরফে ছরু কাজীকে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো এমপি হন আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ। ৯৬ সালের নির্বাচনেও পূনরায় ছরু কাজীকে পরাজিত করে দ্বিতীয়বার এমপি হন তিনি। ২০০১ সালের  নির্বাচনে তাকে পরজিত করে এমপি হন বিএনপির প্রার্থী দলের তৎকালীন তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এম জহিরউদ্দিন স্বপন। গত ২৭ বছরে এটিই ছিল হাসানাতের দুর্গে বিএনপির প্রথম সফল হানা।

তবে এবার আর বিএনপির জয়লাভের কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না গৌরনদী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এইচ এম জয়নাল আবেদীন। তার মতে, এখানে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ বিপুল ভোটে জয়লাভ করবেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার যখন ক্ষমতায় আসে তখন এলাকার রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট, স্কুল-কলেজের ব্যাপক উন্নয়ন হয়। আর বিএনপি বহু গ্রুপে বিভক্ত। তাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে হাসানাত ভাইয়ের জয় শতভাগ নিশ্চিত বলে আমরা মনে করি।’

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বিএনপির বিভিক্তির শুরু ২০০৯ সালের অক্টোবর মাসে। ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপির পরাজিত প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবাহানকে আহ্বায়ক করে ৪৬ সদস্যবিশিষ্ট গৌরনদী উপজেলা আহ্বায়ক কমিটি, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সদস্য মনিরুজ্জামান মনিরকে আহ্বায়ক করে ৪১ সদস্যবিশিষ্ট গৌরনদী পৌর আহ্বায়ক কমিটি ও আব্দুল লতিফ মোল্লাকে আহ্বায়ক করে ৩৪ সদস্যবিশিষ্ট আগৈলঝাড়া উপজেলা আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে।

এরপর সংবাদ সম্মেলন করে এই তিনি কমিটিকে প্রত্যাখ্যান এবং ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবাহান ও মো. মনিরুজ্জামানকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন উত্তর জেলা বিএনপির তৎকালীন যুগ্ম আহ্বায়ক আকন কুদ্দুসুর রহমান। এই দ্বন্দ্বের মধ্যে ২০১৫ সলের ডিসেম্বর মাসে আবুল হোসেন মিয়াকে আহ্বায়ক করে উপজেলা বিএনপি আহ্বায়ক কমিটি এবং একই বছরের ২৮ ডিসেম্বর মনিরুজ্জামান মনিরকে সভাপতি ও শাহ আলম ফকিরকে সাধারণ সম্পাদক করে পৌর বিএনপির নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। এই দুই কমিটি অবশ্য আবার মানে না ইঞ্জিনিয়ার সোবাহান এবং তার সর্মথকরা। এসব কমিটিতে আবার তেমন একটা ঠাঁই হয়নি জহিরউদ্দিন স্বপনের অনুসারীদের।

এসব দ্বন্দ্ব, অন্তঃকোন্দলে দ্বিধাবিভক্ত বরিশাল বিএনপি। আগামী নির্বাচনের এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছে রাজনৈতিক মহল। দলের প্রতিটি গ্রুপেই রয়েছেন মনোনয়নপ্রত্যাশী। দল তাদের ওপর আস্থা রাখবে বলে আশা করেন প্রত্যেকেই।

দলের এসব অন্তর্দ্বন্দ্ব নিয়ে জানতে চাইলে জহিরউদ্দিন স্বপন বলেন, ‘বিএনপির নীতি নির্ধারকরা আমাকে নির্বাচন করার জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। তাই আমি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আমি সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে চলছি।’

কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান বলেন, ‘যে কেউ মনোনয়ন চাইতে পারেন। কিন্তু দল সিদ্ধান্ত নেবে বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকাসহ সার্বিক দিক বিবেচনা করে। সবকিছু নির্ভর করবে বিএনপির কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ড এবং দলের চেয়ারপারসন ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর।’ তবে কেন্দ্র যাকেই মনোনয়ন দেবে, তার হয়েই বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট কাজ করবে বলে জানান তিনি।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দল তাকে প্রার্থী মনোনীত করেছিল বলে তাকেই মনোনয়ন দেয়া হবে বলে আশা করছেন ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবাহান। আন্দোলন-সংগ্রামে নিজের সক্রিয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নেয়ায় ঢাকায় পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করেছিল।’

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাশাপাশি এখানে মাঠে সক্রিয় আছে জাতীয় পার্টি ও জামায়াতের মনোনয়ন প্রার্থীরা। অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসন থেকে জাপার মনোনয়ন পেয়েছিলেন আগৈলঝাড়া উপজেলা জাপার সাধারণ সম্পাদক সরদার হারুন রানা। তখন তিনি জামানত হারান। মনোনয়নপ্রত্যাশী গৌরনদী উপজেলা জাপার সভাপতি অ্যাডভোকেট ইউনুস বেপারীও এলাকায় দলীয় কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছেন।

(ঢাকাটাইমস/১৩অক্টোবর/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত