১০০ টাকা খরচ করে ৪৮ টাকার ডিম!

হাবিবুল্লাহ ফাহাদ
| আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০১৭, ১৬:৩৩ | প্রকাশিত : ১৩ অক্টোবর ২০১৭, ১৬:১৩

ভদ্রলোক আমার পরিচিত। গত তিনদিন ধরে ডিম কেনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ডিম দিবসে ১২ টাকা হালিতে ডিম পাওয়া যাবে। ঠিক করেছিলেন কয়েকশ কিনে আনবেন। পরে জানতে পারলেন একজন ৯০টির বেশি কিনতে পারবে না। তিনি তাতেও খুশি। আমাকে বললেন, ‘সময় থাকলে আপনিও চলুন।’

আমি বললাম, ‘ডিম আমার অপ্রিয় খাদ্য তালিকার শুরুতে আছে। আপাতত আগ্রহ পাচ্ছি না।’ শুনে তিনি হতাশ গলায় বললেন, ‘আপনি না খান। বাসায় তো মানুষ আছে।’

আমি ভাবলেশহীন গলায় বললাম, ‘বাসায় যারা আছেন তারা আমার ডিমের অপেক্ষায় নেই। তারা তাদেরটা ভালো বোঝে।’

ভদ্রলোক এবার গলা কিছুটা শক্ত করেই বললেন, ‘তাহলে আমার জন্যই চলুন।’

‘ধন্যবাদ। এতেও আমি আগ্রহ পাচ্ছি না।’

তবে তাকে ডিম কেনার ব্যাপারে বেশ কিছু কৌশলগত দিক বাতলে দিলাম। প্রথমত, সস্তায় ডিম বিক্রির বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেছে। আপনার মতো অনেকেই এই দৌড়ে আছেন। এরকম প্রতিযোগিতা করে ডিম কিনতে হবে। শুনে তিনি চোখ বড় বড় করে বললেন, ‘বলেন কী? ডিম কিনতেও প্রতিযোগিতা!’

আমি সহজ গলায় জবাব দিলাম, হ্যাঁ। প্রতিযোগিতা। এইদেশে প্রথম টেলিটক সিম যখন বিক্রি শুরু হল সেই দিনের কথা মনে আছে? ভোর রাত থেকে মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল। তারপরও অনেককে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। কম টাকায় দোয়েল ল্যাপটপের বেলাতেও একই। এখন ক্রিকেট খেলার টিকিট কিনতে যে লাইন তা দেখে অনেকের মনে হতে পারে, বিনামূল্যে খাবার দেয়া হচ্ছে।

ভদ্রলোক এবার ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘উপায় কী?’

বললাম, ভোরে গিয়ে লাইন ধরতে হবে।

‘অসম্ভব! আটটার আগে ঘুম থেকে ওঠা আমার পক্ষে সম্ভব না।’

‘তাহলে ডিম কেনাও সম্ভব না।’

‘এটা কোনো কথা হলো?’

‘এক কাজ করেন দুদিন ভোরে ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করুন। তৃতীয়দিন কাজে লাগবে।’

পরামর্শে খুব একটা খুশি হয়েছিলেন বলে মনে হয়নি। তবুও অগত্যা পরামর্শের টোটকা গিললেন। দুদিন ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠে আমাকে মোবাইলে কল করলেন। ‘ভাই ঘুমাচ্ছেন?’

আমি ঘুম জড়ানো গলায় বললাম, ‘হুম। আপনি এত সকালে, কোনো সমস্যা?’

একগাল হেসে লোকটি জবাব দিলেন, ‘আরে না ভাই। ভুলে গেলেন? ডিম কেনার প্রস্তুতি চলছে। হাহাহাহা।’

গতকাল রাতেও তার সঙ্গে কথা হল। তখন ঘড়িতে ৯টা বাজে। কল করে বললেন, ‘ঘুমতে যাচ্ছি।’

আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘এত তাড়াতাড়ি? আমি তো জানি আপনি রাত ১২টা-১টা পর্যন্ত ফেসবুক, টেসবুক নিয়েই পড়ে থাকেন। শরীর খারাপ করেছে নাকি?’

ভদ্রলোক এবার মৃদু ধমক দিয়ে বললেন, ‘আরে ভাই আপনার তো দেখছি কিছুই মনে থাকে না। কাজকর্ম কীভাবে করেন কে জানে!’

আমি উৎসুক ভঙ্গিতে বললাম, ‘কেন কী হয়েছে বলেন তো?’

‘কাল না ডিম দিবস। ডিম কিনতে খামার বাড়ি যাবো না?’

‘ও আচ্ছা। ভুলে গিয়েছিলাম। এজন্য আগেভাগেই ঘুমোতে যাচ্ছেন? ভালো। খুব ভালো। ঘুমান।’

‘আপনাকে ফোন করলাম, একটা কথা বলার জন্য।’

‘কী?’

‘আমার টেবিল ক্লক, মোবাইল সবটাতেই অ্যালার্ম দিয়ে রেখেছি। আপনাকে একটা অনুরোধ করতে চাই।’

‘কী অনুরোধ?’

গলাটা নরম করে ভদ্রলোক বললেন, ‘আপনার মোবাইলে একটু যদি অ্যালার্ম দিয়ে রাখতেন। আমি নিজেই উঠতে পারবো। তারপরও যদি মিস করি। বেশি কিছু না একটা কল দিলেই লাফিয়ে উঠবো।’

নিমরাজি গলায় বললাম, ‘ঠিক আছে ঘুমান।’

মোবাইলে অ্যালার্ম দিয়ে ঘুমাতে গেলাম। এতটুকু অনুরোধ না রাখলে কেমন হয়।

আজ ভোরে ঘুম ভাঙলো মোবাইলের শব্দে। তবে অ্যালার্ম নয়, রিংটোনে। চোখমেলে স্ক্রিনে কলার আইডি না দেখে রিসিভ করে কানে ধরলাম, ‘হ্যালো।’

ওপাশ থেকে একজন কান্নাকান্না গলায় বললেন, ‘আপনি আমার এতটুকু উপকারেও আসলেন না!’

আমি চোখ ডলতে ডলতে বিছানায় উঠে বসলাম। বললাম, ‘কী হয়েছে ভাই?’

‘আপনাকে বললাম ভোরে একটা কল দিতে। আপনি দিলেন না।’

‘আপনার টেবিল ক্লক আর মোবাইল, ওগুলো বাজেনি?’

‘আরে ভাই ওগুলো বেজেছে কি বাজেনি তাই তো শুনতে পাইনি।’

আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘কেনো ব্যাটারি লো ছিল?’

এবার তিনি শক্ত গলায় বললেন, ‘আরে নাহ্! আমার বউ সব নষ্টের গোড়া। সে জানে আমি প্রতি শুক্রবার দেরি করে ঘুম থেকে উঠি। ১০টা-১১টা পর্যন্ত ঘুমাই। শব্দ হলে ঘুমে সমস্যা হয়। তাই ঘুমের সময় মোবাইলও কাছে রাখি না। অন্য ঘরে রাখি। যেন রিংটোনে ঘুম না ভাঙে। গতরাতে বউ দেখলো মাথার কাছে মোবাইল, ঘড়ি। সে মনে করেছে আমি ভুল করে এগুলো এখানে রেখেছি। সে ওগুলো সরিয়ে অন্য ঘরে রেখে এসেছিল। তারপর যা হবার তাই হল। এখন পঞ্চাশ টাকা ভাড়ায় রিকশায় করে খামার বাড়ি যাচ্ছি। বেলা বাজে ১১টা। ডিম পাবো কি পাবো না কে জানে!

আমি বললাম, ‘হতাশ হবেন না। যান। এখনও সময় আছে।’

তার ঘণ্টা দেড়েক পরে ভদ্রলোকের কল। রিসিভ করতেই তিনি বললেন, ‘ভাই, পেয়েছি!’

আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘কী পেয়েছেন?’

‘ডিম।’

‘তাই নাকি! ভালো। কতগুলো পেলেন?’

‘চার হালি।’

আমি বললাম, ‘মাত্র চার হালি!’

তিনি এবার উচ্ছ্বসিত গলায় বললেন, ‘আরে ভাই হালি গুনে লাভ নেই। এখানে ডিমযুদ্ধ চলছে। কার মাথা কে খায়। ডিম যে পেয়েছি এটাই কম কীসে! ৪৮ টাকায় চার হালি ডিম। ভাবা যায়?’

আমি ক্ষীণ গলায় বললাম, ‘জি, পঞ্চাশ-পঞ্চাশ একশ টাকা রিকশা ভাড়া দিয়ে ৪৮ টাকায় ডিম কেনা, কম কীসে।’

 

 

 

 

 

 

লেখক- সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত