আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এবং জঙ্গিবাদবিরোধী লড়াই

মোহাম্মদ জমির
 | প্রকাশিত : ১৬ অক্টোবর ২০১৭, ১২:০৩

গত বছর জঙ্গিবাদের নতুন মাত্রার মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ, যা বিশ্বেরও নজর কেড়ে নেয়। এটি অবশ্যই নেতিবাচক দিক। কারণ জঙ্গিরা যাদের টার্গেট করেছিল, তাদের মধ্যে ছিল এই দেশে অবস্থানরত ভিনদেশিরাও। আশার কথা হচ্ছে, সেই সমস্যা থেকে অনেকটাই বের হয়ে এসেছে বাংলাদেশ।

একের পর এক অভিযান চালিয়ে আমাদের সন্ত্রাসবাদবিরোধী নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা দক্ষতার সঙ্গে জঙ্গিদের ধরছে। তাদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। আমাদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত সাহসী মানুষ কখনো কখনো একই সঙ্গে ত্যাগ ও বীরত্বের নতুন মাত্রার পরিচয় দিচ্ছে।

সর্বশেষ আমরা দেখলাম, নিহত ‘জঙ্গি’ নুরুল ইসলাম মারজানের বোন ‘নব্য জেএমবি সদস্য’ খাদিজা আক্তারকে ধরেছে পুলিশ। ৮ অক্টোবর গভীর রাতে পুলিশ যশোরের ঘোপ নওয়াপাড়া রোড মসজিদের পেছনে চারতলা একটি ভবন ঘিরে ফেলে। ওই ভবনের দোতলার একটি ফ্ল্যাটে বছরখানেক ধরে ভাড়া থাকছিলেন তিন সন্তানসহ খাদিজা ও তার স্বামী মশিউর। গত বছর জুলাই মাসে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলা চালিয়ে ১৭ বিদেশিসহ ২২ জনকে হত্যার ঘটনার পর তদন্তের মধ্যে মারজানের নাম আসে।

পাবনার হেমায়েতপুরের আফুরিয়া গ্রামের হোসিয়ারি শ্রমিক নিজাম উদ্দিনের ছেলে মারজান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও লেখাপড়া শেষ করেননি। চলতি বছর ৬ জানুয়ারি ঢাকার মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ এলাকায় কাউন্টার টেরোরিজম পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মারজান নিহত হন বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়।

হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পরপরই কিন্তু আগের কয়েক বছরের তুলনায় বিগত বছরে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে। এখনো তার থেকে বের হওয়া যায়নি। শিক্ষাখাত নিয়ে আরো নানা বিতর্ক আছে। বিশেষ করে শিক্ষাক্রমের মৌলিক কিছু বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বেসরকারি পর্যায়ে নানা রকম শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠেছে আমাদের দেশে। বিশ্লেষকরা শিক্ষা খাতের সমস্যা নিয়ে তাদের মতামত প্রায়ই জানাচ্ছেন। কিন্তু তাও সেভাবে সমাধানের কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

আমাদের শিক্ষার প্রধান যে সমস্যা, সেটি হচ্ছে শিক্ষার নানা ধরনের পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া। নানা রকম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে এই দেশে। এর মধ্যে আছে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং এসবের একেবারে বিপরীত ধারার কওমি ও আলিয়া মাদ্রাসা। শিক্ষার এই বিভিন্ন ধারাকে একমুখী করতে এ পর্যন্ত অনেক সভা, সেমিনার আর লেখালেখি হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।

শিক্ষাব্যবস্থা সেই পুরনো চোরাবালিতেই ঘুরপাক খাচ্ছে। অথচ গুলশান ও শোলাকিয়ায় সন্ত্রাসী হামলার পর শিক্ষাব্যবস্থায় বদল আনার বিষয়ে অনেকেই উচ্চকণ্ঠ হয়েছিলেন। কারণ এসব হামলায় যেসব তরুণ জড়িত ছিল, তাদের বড় একটা অংশ একসময় আধুনিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিল। উচ্চ মধ্যবিত্ত বা বিত্তবান পরিবার থেকে আসা এসব তরুণ পড়াশোনা করেছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিপরীত দিকে বিপথগামী তরুণদের একটি অংশ মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছে।

গুলশান ও শোলাকিয়ার হামলার আগেও কিন্তু সন্ত্রাসী কিছু কর্মকাণ্ডণ্ড হয়েছে এ দেশে। আসলে ২০০৫ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এই ১১ বছরে ধারাবাহিক বেশকিছু সন্ত্রাসী ঘটনার চেয়ে এই দুটি হামলা ছিল একেবারেই ভিন্ন রকম। দক্ষিণ এশিয়ার জঙ্গিবাদ নিয়ে কাজ করা পোর্টাল সাউথ এশিয়ান টেরোরিজম পোর্টাল (এসএটিপি) কিছু পরিসংখ্যানও দিয়েছে। তাদের হিসাবে ২০০৫ থেকে ২০১৬ সালের ১৭ জুলাই পর্যন্ত জঙ্গি হামলায় ৬৩৬ জন নিহত হয়েছেন বাংলাদেশে।

এর মধ্যে ৩৬০ জন সাধারণ নাগরিক এবং ৩৩ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। এই সময়ের মধ্যে ২৪৩ জন হামলাকারী জঙ্গিও নিহত হয়। বছরওয়ারি হিসাবে ২০০৫ সালে ৩৫, ২০০৬ সালে ১২, ২০০৭ সালে ৮, ২০০৮ সালে ১, ২০১০ সালে ৬, ২০১২ সালে ৩, ২০১৩ সালে ৩৭৯, ২০১৪ সালে ৬০, ২০১৫ সালে ৫৬ ও ২০১৬ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত ৭৬ জন নিহত হয়েছে।

২০১৬ সালের পর দেশে জঙ্গিবাদের মাত্রা ও ধরন পাল্টে গেছে। আমরা দেখছি, টার্গেট করা হচ্ছে বিভিন্ন মানুষকে। তবে এসব কার্যক্রমে ধারাবাহিকভাবে পরিবর্তন আসছে। জঙ্গি তৈরি, প্রশিক্ষণ, প্রচারণা, যোগাযোগসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ে অ্যানালগের পরিবর্তে ‘ডিজিটাল পদ্ধতি ও প্রযুক্তি’ ব্যবহার করছে জঙ্গিবাদের মাস্টারমাইন্ডরা। একটা সময় জঙ্গিবাদে যারা জড়িত ছিল, তাদের প্রায় সবাই মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছে।

এদের বেশিরভাগই আসলে সমাজের নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা। কিন্তু গত এক-দেড় বছরে দেখা যাচ্ছে, জঙ্গিবাদ শুধু তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ছড়িয়ে পড়েছে সমাজের উচ্চবিত্ত পরিবারে; কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সরকারি-বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠানে। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রবেশ করেছে উচ্চশিক্ষিত মেধাবীদের মধ্যেও। এ বিষয়ে নতুন এক উদ্বেগ এনে দিয়েছে আমাদের নাগরিক সমাজে। যার জের থেকে আমরা আসলে বের হতে পারছি না।

সন্ত্রাসবাদের সংকট উত্তরণে আমাদের সর্বপ্রথম এর সম্পর্কে মৌলিক ধারণা নিতে হবে। এ প্রসঙ্গে ‘দ্য পলিটিক্যাল ইকোনোমি অব টেরোরিজম’ বইয়ে ওলান্টার এন্ডারস ও টড স্যান্ডলার কিছু বিষয় অবতারণা করেছেন। তাদের মতে, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সমর্থনে বিক্ষিপ্ত যে হামলা হয়, যাতে কম বা বেশি মানুষ মারা যায়, তার মূল লক্ষ্য হচ্ছে সন্ত্রাসীরা যাতে তাদের দাবি-দাওয়া, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সবার মধ্যে প্রচার করতে পারে। এর জন্যই তারা অতর্কিতে হামলা করে।

জঙ্গিবাদবিষয়ক গবেষক জেমস এম. লুৎজের মতে, কোনো গোষ্ঠীর হয়ে সন্ত্রাসীরা যে হামলা করে, তার মূল হচ্ছে বা উদ্দেশ্য হলো ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করা। এর জন্য তারা নানা অপকৌশল বেছে নেয়। এর মধ্যে আছে অপহরণ ও জিম্মি করা। বোমা মারা, আত্মঘাতী বোমা হামলা, নির্বিচার হত্যাযজ্ঞের মতো বিষয়েও জড়িয়ে পড়ে সন্ত্রাসীরা। তারা আজকাল প্রযুক্তিগত ক্ষেত্র ব্যবহার করেও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডণ্ড চালাচ্ছে। এর মধ্যে ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিশেষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে কিংবা অন্যান্য ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে জঙ্গিবাদে জড়ানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে। সন্ত্রাসীদের অপতৎপরতা গত কয়েক বছরে বেশি যেসব জায়গায় দেখা গেছে, তার মধ্যে আছে যুক্তরাষ্ট্র, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, তুরস্ক, ইরাক, সৌদি আরব, জার্মানি ও পাকিস্তান।

স্বাধীন হওয়ার কিছুকালের মধ্যেই বাংলাদেশ এক ধরনের সন্ত্রাসী ঘটনার শিকার হয়। ১৯৭২ সালের পর সাম্যবাদ বা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নাম করে দেশজুড়ে অস্থিরতা তৈরি করে। তাদের ছোট্ট একটি গোষ্ঠী তখন নানা মাত্রায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে। তারা কিছু হত্যাকাণ্ডও ঘটায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে আফগান যুদ্ধ (১৯৭৯-৮৯) আমাদের দেশে ধর্মীয় লেবাসের জঙ্গিবাদের এক ধরনের সূচনা তৈরি করে। কারণ মাদ্রাসা পড়–য়া একটি গোষ্ঠী সেই যুদ্ধে আফগানদের পক্ষে লড়তে বাংলাদেশ থেকে যায়। দেশে ফিরে এসে তাদের একটি অংশ জিহাদের নাম করে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন গড়ে তোলে। তারাই পরে তালেবান ও আল-কায়েদার আদর্শের সঙ্গে মিশে যায়। তাদের হাত ধরে তৈরি হয় হরকাতুল জিহাদ ও জামায়াতুল মুজাহিদিনের মতো জঙ্গি সংগঠন। তারা দেশের বুদ্ধিজীবী, ভিন্নমতাবলম্বী, রাজনৈতিক নেতাদের হত্যার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামে। কিছু ক্ষেত্রে তারা সফলও হয়।

কিন্তু এই সব সন্ত্রাসী সংগঠনের বিরুদ্ধে সরকার যখন কঠোর অবস্থান নিয়েছে, তখনি তারা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এটা কিন্তু ইতিবাচক দিক। নিরাপত্তা বাহিনীর জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে সাফল্য পাওয়ার বড় একটি কারণ হচ্ছে এই দেশের সাধারণ মানুষ ধর্মীয় উগ্রবাদকে কখনোই মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেয়নি। এটা হোক সন্ত্রাসবাদ কিংবা ভোটের রাজনীতি। উগ্রবাদীরা কোথাও সেভাবে জনসমর্থন পায়নি।

অন্যদিকে ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করে, তখন তা বানচাল করতে উগ্রবাদী একটি গোষ্ঠী সক্রিয় হয়। বিশ্লেষকদের মতে, একাত্তরের এই দেশের ঘাতকদের বিচার ঠেকাতে একটি গোষ্ঠী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মদদ দিতে থাকে। যদিও তারা সেভাবে সফল হতে পারেনি। কিন্তু বিভিন্ন সময় দেশে তারা অস্থির পরিস্থিতি তৈরি করেছে। তারপরও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যকর হয়েছে এবং হচ্ছে।

তার ফাঁকেই আমরা দেখেছি বাংলাদেশের মতো নিরাপদ একটি দেশে ব্লগার, ভিন্নমতাবলম্বী, ভিনদেশি নাগরিক, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও মাজারপন্থি মানুষ হত্যা শুরু হলো। সেই সময় পাড়ি দিয়ে আমরা আবার শান্তির বাংলাদেশের পথে আছি। জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে আমাদের র‌্যাব, পুলিশসহ সব সংস্থা দারুণ কাজ করছে। ‘আনসারুল্লাহ বাংলা’র মতো সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে কোণঠাসা করে ফেলতে পেরেছে তারা।

জঙ্গিবাদ ঠেকাতে আমাদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগও বেড়েছে। এটা করতেই হবে। কারণ ইসলামের নামে যেসব জঙ্গি তৎপরতা চলছে তার গোড়াঘর আসলে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু অঞ্চলের সংঘাতময় পরিস্থিতি। জঙ্গিবাদ ছড়ানোর পেছনে ভ‚-রাজনীতি, ভৌগোলিক অবস্থান, আর্থ-সামাজিক অবস্থাও অনেকাংশে দায়ী। তাই বৈশ্বিক উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই।

আশার কথা হচ্ছে, জঙ্গিবাদ ও আন্তঃদেশীয় অপরাধ দমনে সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে চলতি বছরের মার্চে ঢাকায় এশিয়ার বিভিন্ন দেশের পুলিশপ্রধানদের এক সম্মেলন হয়েছে। এখানে যৌথ ঘোষণা দেওয়া হহয়। দক্ষিণ এশীয় অঞ্চল এবং বিশ্বব্যাপী অপরাধের ধরন চিহ্নিতকরণ, আন্তঃদেশীয় অপরাধ দমনে একটি কৌশল উদ্ভাবন, ইন্টারপোল সদস্য দেশসমূহের মধ্যে এনসিবির মাধ্যমে ওয়ান-টু-ওয়ান কমিউনিকেশন, পুলিশপ্রধানদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য একটি প্লাটফর্ম গঠন, কাউন্টার টেররিজমে সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে তথ্য বিনিময়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিশ্বের নেতৃস্থানীয় সংস্থার মধ্যে পেশাগত সম্পর্ক বৃদ্ধি, সন্ত্রাসবাদ এবং আন্তঃদেশীয় অপরাধ দমনে তথ্যপ্রযুক্তি নেটওয়ার্ক স্থাপন, ফরেনসিক ল্যাবরেটরি এবং ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি, মানি লন্ডারিং, সাইবার ক্রাইম এবং অর্থনৈতিক অপরাধ দমনে সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতা বাড়ানো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে অপরাধ দমনে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের লক্ষ্যে যৌথ সিম্পোজিয়াম ও প্রশিক্ষণ আয়োজন ইত্যাদি গুরুত্ব পেয়েছে। এশিয়ার একটি অঞ্চলের পুলিশপ্রধানদের এই সম্মেলনের মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াই আরো গতিশীল হয়েছে।

পৃথিবীতে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি যে বেড়েছে, এ বিষয়টি জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা পর্যন্ত বলছেন। এগুলো নির্মূলে তারা সদস্য দেশগুলোর যৌথ নানা উদ্যোগ দেখতে চাইছেন। বাংলাদেশের মানুষ বরাবরই শান্তিপ্রিয়। তারা জঙ্গিবাদীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার পক্ষপাতী নয়। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও জাতিসংঘে গিয়ে শান্তির পক্ষে কথা বলেছেন। গত বছর তিনি সাধারণ অধিবেশনে বলেন, ‘আমরা মনে করি, সন্ত্রাসীদের কোনো ধর্ম, বর্ণ বা গোত্র নেই। এদেরকে সর্বতোভাবে সমূলে উৎপাটন করার সংকল্পে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। সন্ত্রাস ও সহিংস জঙ্গিবাদের মূল কারণগুলো আমাদের চিহ্নিত করতে হবে। একই সঙ্গে এদের পরামর্শদাতা, মূল পরিকল্পনাকারী, মদদদাতা, পৃষ্ঠপোষক, অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহকারী এবং প্রশিক্ষকদের খুঁজে বের করতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।’

তবে শুধুই আইনি ও নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান দিয়েই জঙ্গিবাদ নির্মূল করা যাবে না। এর জন্য সাংস্কৃতিক লড়াই অব্যাহত রাখতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় যেসব গলদ রয়েছে তা দূর করতে হবে। কারণ দার্শনিক কিছু মতবাদ দ্বারা জঙ্গিরা প্রভাবিত হয়। তা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আমাদের বড় ধরনের সংস্কার কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রে শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক খাতে প্রথমে হাত দিতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষা ক্ষেত্রে এই সংস্কার অত্যন্ত জরুরি।

বর্তমানে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বহু ধরনের বিভক্তি রয়েছে। একদিকে সনাতন শিক্ষা, অন্যদিকে ইংলিশ মিডিয়াম এবং মাদ্রাসা শিক্ষা। মাদ্রাসা শিক্ষার মধ্যে আবার আলিয়া মাদ্রাসা, কওমি মাদ্রাসা, হাফেজিয়া মাদ্রাসাসহ বহু ধরনের মাদ্রাসা রয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থার কারিকুলামের মধ্যে ব্যাপক তারতম্য রয়েছে। এসব তারতম্য সমন্বিত করতে না পারলে আমাদের সংকট কমবে না বরং বাড়বে। গুলশান ও শোলাকিয়ার হামলায় কিন্তু আমরা সেই নমুনা দেখেছি।

বিশেষ করে গুলশানের হলি আর্টিজানের হামলায় আমরা দেখেছি জঙ্গিত্বের উৎস হিসেবে নতুন এক দিক। উচ্চবিত্ত পরিবারের উচ্চশিক্ষিত সন্তানরা সন্ত্রাসী হচ্ছে। যারা মাদ্রাসা কিংবা এতিমখানায় পড়ে তাদের থেকে এদের পার্থক্য হচ্ছে, ওরা বিভিন্ন কিছু থেকে বঞ্চিত। কিন্তু অর্থবিত্ত বেশি হওয়ার কারণে ধনীদের সন্তানদের বঞ্চনার বিষয় কিন্তু একই রকম নয়। বঞ্চনাবোধ বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। এমন না যে, বঞ্চিত লোকের মধ্যেই কেবল ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। কেউ যদি দেখে সে সুবিধাভোগী এবং তার সুবিধা ভোগের ফলে অন্যরা বঞ্চিত হচ্ছে, ফলে তার মধ্যেও এক ধরনের বঞ্চনা এবং আক্রোশ কাজ করতে পারে।

আর একটি বিষয় হচ্ছে বঞ্চনাবোধ যখন কারো মনের মধ্যে গ্রথিত হয় এবং সেই বঞ্চনা থেকে পরিত্রাণের জন্য যথোপযোগী ব্যবস্থাগুলো সমাজ গ্রহণ না করে তাহলে এই বঞ্চনা জঙ্গিত্বের দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এসব নিয়ে সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা বিস্তর বলছেন। সন্তান যাতে বখে না যায়, তার জন্য তাকে যথাযথ সময় দেওয়া বাবা-মায়ের বড় দায়িত্ব। কারণ পরিবারে বাবা-মায়ের সমস্যা থাকলে হতাশা থেকে সন্তান জঙ্গিবাদের পথে পা বাড়াতে পারে। এমন কিছু ঘটনাও আমরা দেখেছি।

পরিশেষে আমি বলতে চাই, জঙ্গিবাদবিরোধী প্রচার-প্রচারণায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। জিহাদের নামে মানুষ হত্যার মতো পাপ কাজে যাতে শিক্ষার্থীরা না জড়ায়, সেই শিক্ষা দিতে হবে তাদের। এ বিষয়ে তাদের সতর্ক করতে হবে। ইসলাম যে সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করে না, বরং শান্তির ধর্ম এই শিক্ষা দিতে হবে সবাইকে। শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেদিয়েই আসলে সন্ত্রাসবাদের বীজ ও চারা সব উপড়ে ফেলতে হবে। এর বিকল্প কিছু কিন্তু আমাদের হাতে নেই।

মোহাম্মদ জমির: সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং প্রধান তথ্য কমিশনার

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত