সে হারালো কোথায় কোন দূর অজানায়!

দিলরুবা শরমিন
 | প্রকাশিত : ১৮ অক্টোবর ২০১৭, ০৮:৫৭

কবে তার সাথে আমার পরিচয় মনে পড়ে না বা আমি জানি না। বড়দের মুখে শোনা, ছেলেবেলা থেকেই নাকি আমাকে আদর করতো ভীষণ! কোনোদিন নাকি হিংসা করেনি। রাগ করেনি। মারেনি। অথচ সে ছিল আমার চেয়ে মাত্র দুই বছরের বড়।  

বলছিলাম দিলরুবা শিপারীন জয়ন্তীর কথা। আমার বোন। বন্ধু, সঙ্গী। আমার নিঃশ্বাস নেবার একমাত্র জায়গা।  

ছোটবেলায় যশোর শহরে সুরেন্দ্র নাথ রোডের ষষ্ঠীতলা পাড়ার বাড়ির ঘটনা থেকেই মনে পড়ে জয়ন্তীর কথা। ওই পুরানো আমলের বিশাল বাড়িটার সব শেষে যে বড় একটা শোবার ঘর ছিল সেখানে জয়ন্তী, আমি আর আশিষ মা’র সাথে ঘুমাতাম। বাবা ছিল না তাই জানতাম না ‘বাবা’ কী! তখন আমাদের কোনো ফ্যান ছিল না। প্রচণ্ড গরমের দিনে মা সারা রাত আমাদের বাতাস করতো। মা’র যে কষ্ট হতো সেটা জয়ন্তী বুঝতো তাই বাতাস করার দায়িত্ত মা’র সাথে ভাগাভাগি করে নিতো।  

আমাদের স্কুলজীবন শুরু হবার আগে দুই বোন পাড়ায় ছুটেই বেড়াতাম! খুব গাছ লাগাতো জয়ন্তী। ওর গাছ লাগাবার হাতের যাদু ছিল। গুরুই মানতাম কারণ আমাকে দিয়ে এই সবকিছুই হতো না। এক সময় দেখলাম শিশু কালেই সেলাই টেলাই করছে। আবার রান্না বান্নার প্রতিও চরম আকর্ষণ। আমি কেবল দরশক। এই সবে আমার মন নাই বলে খুশিই হতো।  ভরসা দিতো এসব কিছুই করতে হবে না তোকে। তুই হবি...। আমার আর কিছুই হওয়া হয়নি। আমি তো ওকে ছেড়ে কিছুই হতে চাইনি।

একদিন হঠাৎ জয়ন্তী বাসায় এসে হাঁপাতে হাঁপাতে জানালো, ‘মা মোমিন এ পরীক্ষা দিয়েছিলাম। পাস করেছি। শিগগির টাকা দাও ভর্তি হতে যাবো বুড়ি আপার সাথে।’ সকলের সাথে মা’ও অবাক। কবে পরীক্ষা হলো আর কখন ই বা দিলো!

সেই ছেলেবেলা থেকেই, সবকিছুতেই ওর তাড়া ছিল।সে কি এই জন্য যে মাত্র ৪১ বছর বয়সেই জীবন শেষ হয়ে যাবে?  

এইভাবে একাই যশোর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ওর শিক্ষাজীবন শুরু। এর আগে  হাতেখড়ি বা লেখাপড়া শুরু খেলতে খেলতে কুড়িয়ে পাবার মতো পরম শ্রদ্ধেয় কাওসার স্যারকে দিয়ে। পাড়ার বন্ধু মলিদের বাসায় খেলতে গিয়ে আবিষ্কার করে ফেললো ওরা দল বেঁধে ‘স্বরে অ’ ‘স্বরে আ’ পড়ছে।  পড়াচ্ছেন কাওসার স্যার। ব্যস সেদিনই স্যারকে পাকড়াও করে বাসায় এনে মা’কে জুলুম চাপালো– মা এখন থেকে ইনিই আমাদের স্যার। এবার থেকে আমি আর সুসু তার কাছেই পড়বো! সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত।

এইভাবে ক্রমাগত যা চেয়েছে যা বলেছে সেটাই করেছে। যেমনটি দশ বছর আগে হঠাৎ করেই চলে গেল। কিছুই বলে গেল না।  

ও স্কুলে ভর্তি হবার পর এক বছর মন মরা করে ছিলাম। ছেলে বেলায় জয়ন্তী ছিল যেমন চঞ্চল আমি তেমনি শান্ত। আমি সারাদিন ওর অপেক্ষায় বসে থাকতাম। বিকালে ফিরে একসাথে ভাত খাওয়া সেই থেকে আমার অভ্যাস। প্রতিদিন স্কুলের টিফিনটা আমার জন্যে নিয়ে আসতো। কতই বা বয়স ছিল? তারপর ও অনুভূতিটা?   আমাদের সময় সকাল ৯:৩০ এ অ্যাসেম্বলি এরপর ১০টা থেকে বিকাল ৫টা অব্দি স্কুল হতো। আজও বুঝে পাই না স্কুল সময়টা এত দীর্ঘ ছিল কেন? ছোট শিশুদেরকে এইভাবে আটকে রেখে কী মজা পেতেন শিক্ষকরা!

পরের বছর আমি স্কুলে যাওয়া শুরু করলাম প্রাইমারি ট্রেইনিং স্কুলে ক্লাস টু এ ভরতি হয়ে। মন বসতো না। কোথায় সেই মোমিন গারলস-যেখানে জয়ন্তী?

মোমিন গারলস স্কুলে জয়ন্তী ক্লাস থ্রি তে ভর্তি হয় সম্ভবত ১৯৭৩ সালে, ১৯৮১ তে ওর এসএসসি। আমি ভর্তি হই ১৯৭৫ সালে। তখন ওই সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে আজকের দিনের মতো দুই শিফটও ছিল না বা ভর্তিযুদ্ধও নয়। অথবা কোনো কোচিং। সহজ সরল জীবন আর কী!  আমাদের সময় লেখাপড়া মনে হয় এত জটিল কঠিনও ছিল না, জীবন ছিল সহজ সরল। বাতাস পারদের ভারে ভারী ছিল না। অসাধারণ মেধাবী এই মেয়েটি যে আসলে নেত্রীই হবে সেই পঞ্চম শ্রেণিতেই বোঝা গিয়েছিল। তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে যে ক্লাসে আমরা বসতাম সেটা ছিল পুরানো, ভাঙাচোড়া, পানি পড়ে। যেকোনো সময়ে ভেঙে পড়ার মতো অবস্থ। জয়ন্তী তখন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। হেড মিস্ট্রেস এর রুমে একদল সহপাঠী নিয়ে হাজির – এই রুম চলবে না বদলাতে হবে। আন্দোলনের মুখে পরিবর্তিত হয়ে গেল আমাদের রুম।  

জয়ন্তী খেলধূলায় খুব আগ্রহী আর পারদর্শী ছিল। আমি ভর্তি হবার পর শুরু করে দিলো গান বাজনার জোরদার অনুষ্ঠান। আমি ক্লাস শেষে বসে থাকতাম তার সাথেই ফিরবো বলে। স্কুল নেত্রী জয়ন্তীকে স্কুল শেষে একঝাঁক মেয়ে যখন ঘিরে ধরে এটা ওটা বিচার দিতো ও সেই সময় কী এক অদ্ভুত মায়ায় আমার দিকে তাকিয়ে নির্দেশ দিয়ে দিতো, ‘আচ্ছা বসে বসে তেঁতুল পাতা খা আমি আসছি।’ এ যুগের ছেলে মেয়েরা কি বুঝবে তেঁতুল পাতা বা আমড়ার ডাল খাবার তৃপ্তি কতটা! আমিও গাধার মতো তাইই করতাম।

আমাদের সময়ে বড় ভাই বোনের পোশাক ছোট হয়ে গেলে ছোট ভাই বোন পরবে, ভাই বোন এর বই পরের ক্লাসে ছোটরাই পড়বে এমনই রেওয়াজ ছিল। ত্খন আসলে ভাই বোন বন্ধু বান্ধবের তেমন ভেদাভেদ ছিল না। তাই আমার জীবনটাও কেটেছে জয়ন্তীর বই পড়ে। আমি পড়বো বলেই কি ও এত যত্ন করে মলাট দিয়ে নিখুঁত, নিপাট বই রেখে দিতো?    

এক মুহূর্ত পারতাম না জয়ন্তীকে ছেড়ে থাকতে। সেই যে আমাকে রেখেই স্কুল ছেড়ে কলেজে গেল কিন্তু বারবারই ওর কলেজে আমাকে যেতে হয়েছে। তাই বাসার কাছেই এম এম কলেজ থাকার পর ও ভর্তি হলাম ওর কলেজে মহিলা কলেজে। সেখানেও ওর কী ভীষণ জনপ্রিয়তা দেখেছি।

জয়ন্তী আমাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। মন্নুজান হলে। স্কুল– কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিতে। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। এমনকি নিজে সোশ্যাল ওয়ার্কে ভর্তি হয়েছিল বলে আমি আইনে। একই বিল্ডিং একই অনুষদ ( সেই সময়) একই হল। এক মুহূর্ত কাছ ছাড়া করেনি বা আমি হইনি। সে কি কেবল আজীবন কাছ ছাড়া হবো বলেই?

বিপুল জনপ্রিয় নেত্রী ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে।দুঃসাহসী মেয়ে। মেধাবী রেজাল্ট। কিন্তু সবকিছুতেই আমাকে সে ঠেলতো। আমি প্রকৃত অর্থে অলস প্রকৃতির ছিলাম। ওর ছিল সবকিছুতেই বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা। কোনো ক্লান্তি ছিল না দীরঘাঙ্গী এই মেয়েটির। যাকে যমের মত ভয় পেতো অনেকে তেমনি দুর্দান্ত ভালোবাসতো।

এই ভালোবাসাই কাল হয়ে গেল? ওর এই জীবন চলে যাবার পেছনে কি আমার সামান্যতম হাতও নাই? একদিন হলে ফিরে সন্ধ্যায় হঠাৎ এসে আমাকে বললো শোন ‘......’ আমাকে নাকি ভালোবাসে। কী করবো? আমিও রাগের মাথায় বলে দিলাম যাহ, তুইও তাকে ভালোবাস। সেদিনই কি তার মরণ আমি আহ্বান জানাইনি?

আমার দুই বছর আগেই জয়ন্তীর ক্যাম্পাস ছাড়ার কথা। দারুণ রেজাল্ট করেছিল অনার্সে, মাস্টার্সে। তবে একটু দেরি করেই ক্যাম্পাস ছাড়লো। সে কি কেবলই  নিজের মরণকে আরও নিকটতম প্রতিবেশী করার জন্য? গণউন্নয়ন প্রচেষ্টায় মাদারীপুর রাজৈরে কাজে যোগ দিলো। সেখানেও আমাকে নিয়ে গেল। সেখানেও ওর জনপ্রিয়তা রীতিমত অনুভবের। অনেক কষ্ট করেছে ওর হাসব্যান্ডকে বিসিএস ক্যাডার বানাতে। নিজে যখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে উপ পরিচালক পদে যোগ দিল সেখানে কীভাবে তার চেয়ে নিচে রাখে তার জীবনের সঙ্গীকে! এভাবে মরণকে বারবার ডেকেছে।  

একজন মেধাবী মেয়ে যার ছিল অসাধারণ প্রতিভা এবং জনপ্রিয়তা সেই মেয়েটি নিজেকে শেষ অব্দি রান্না ঘরেই বন্দী ফেলেছিল। আত্মার মুক্তি চাওয়া কি অপরাধ? প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নেয়া? একজন স্বাধীন মানুষ কীভাবে সূর্যের আলো না দেখে থাকতে পারে? সেই না দেখাও মেনে নিয়েছিল। দুই বোন এক জায়গায় হলেই বিমল মিত্রের কড়ি দিয়ে কিনলাম বইটা নিয়ে আলোচনা করতাম। জয়ন্তী অনেক কিছুই মেনে নিয়েছিল। জয়ন্তীরা মেনে নিতে বাধ্য হয়।  সারাজীবন মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করা মেয়েটি হারিয়েছিল তার বেঁচে থাকার অধিকার। উপারজন করার অধিকার। শখ মেটাবার অধিকার। হয়তো মরণের জন্যেই বেঁচে ছিল! অথবা মরেই বেঁচে গেছে! এমন জীবনের চেয়ে মরণ ভালো নয়কি?

লেখক: আইনজীবী

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত