স্বাস্থ্যমন্ত্রী আপনাকে ব্যবস্থা নিতেই হবে

কাওসার শাকিল
 | প্রকাশিত : ১৯ অক্টোবর ২০১৭, ১৩:২৭

কিছু কিছু ঘটনা দেখলে মাথা আর ঠিক রাখা যায় না। নিজের, নিজেদের মানুষ পরিচয়ের দিকে আঙুল তোলা এসব ঘটনার ভয়বহতা এতো তীব্র, লজ্জায় ভেতরে ভেতরে কুকড়ে যাই আমি।

গতকাল ভোররাতে পারভীনের প্রসব বেদনা ওঠে। বাস্তুহারা মেয়েটির এ শহরে কেউ নেই, থাকে গুলিস্থানের ফুটপাতে। ওর এই অবস্থা দেখে একজন পথচারী দয়া করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যায় প্রথমে। সেখানে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর প্রথমে স্বাভাবিক প্রসবের কথা বলা হয়। পরে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানান, সিজারের প্রয়োজন পড়বে। হাসপাতালের অন্যান্য স্টাফরা এসে সেই পথচারিকে জানান, সিজার করাতে টাকা লাগবে, ওষুধপথ্য কিনতে হবে। কিন্তু সঙ্গে টাকা না থাকায় স্টাফরা পারভীনকে মিটফোর্ড হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। পারভিনকে নেয়া হয় মিটফোর্ড হাসপাতালে। সেখানেও কিছু সময় রাখার পর একই ঘটনা ঘটে। দেড় হাজার টাকা খরচ দিতে হবে, না পারলে রোগীকে অন্য কোথাও নিয়ে যান, সাফ সাফ জানিয়ে দেয় তারা।

নিরুপায় হয়ে সেই পথচারী পারভীনকে নিয়ে যান আজিমপুর ম্যাটারনিটিতে। শুরুতে সেখানে তাঁকে ভর্তি করে প্রসবের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। কিন্তু কিছু সময় পর ওই প্রতিষ্ঠানেও একই সমস্যা দেখা দেয়। ওষুধ-পথ্যের টাকা আছে কি না জানতে চান স্টাফরা। টাকা নেই জানার পর স্টাফরা হাত গুটিয়ে নেন। তখনো ব্যথায় কাতরাচ্ছিলেন পারভীন। এর মধ্যেই এক স্টাফ পারভীনকে হাত ধরে টানাহেঁচড়া করে বাইরে নিয়ে যান। যেতে না চাইলে গার্ডের সাহায্য নিয়ে প্রায় জোর করে বের করে দেওয়া হয় তাকে। এর কিছুক্ষণ পরই ওই ম্যাটারনিটির গেটের সামনে সড়কের ওপর পড়ে যান পারভীন। সেখানেই একটি ছেলেসন্তান প্রসব করেন। পথচারী ও আশপাশের কয়েকজন নারী এ সময় এগিয়ে এসে পারভীনকে শাড়ি পেঁচিয়ে আড়াল করে প্রসবে সাহায্য করেন।

জন্ম নেওয়ার মিনিট দুয়েক পরই বাচ্চাটা মারা যায়। এই দৃশ্য দেখে এবং পারভীনের কান্না শুনে এলাকাবাসী ও পথচারীরা এগিয়ে এসে ওই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকে। খবর পেয়ে পুলিশ আসে। একপর্যায়ে হাসপাতালের লোকজন এসে পারভীনকে ট্রলিতে তুলে ভেতরে নিয়ে প্রসব-পরবর্তী চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।

কিন্তু ততক্ষণে যা হবার তা হয়ে গেছে। পারভীনের সন্তানটি মারা গেছে। তাকে আর কোনো ভাবেই ফিরিয়ে আনা যাবে না। এই যে একটা দিনও দুনিয়াটাকে দেখতে না পারা বাচ্চাটা, এই যে ফুটপাতের উপর জন্ম নেয়া বাচ্চাটার চলে যাওয়া, এই রাষ্ট্রের মুখে এর চেয়ে জোরে লাথি মারা সম্ভব কি না জানি না। এই মৃত্যুর শতভাগ দায় এই রাষ্ট্রের, তার সরকারের এবং শাসনব্যবস্থার।

এদেশের স্বাস্থ্যখাতের অবস্থা যে কতটা ভয়াবহ সেটাই আরো একবার প্রমাণ করে দিয়ে গেল এই ছোট্ট বাচ্চাটা। ওর মৃত্যু দিয়ে আরো একবার প্রমাণ হয়ে গেলো, এদেশে চিকিৎসা ব্যবস্থার অবস্থা কতটা খারাপ। এদেশে একটা জীবনের দাম মাত্র ১৫০০ টাকা? মাত্র ১৫০০ টাকা? মাত্র?

কিসের উন্নয়নের গল্প শোনান ভাই আপনারা? কোন অর্থনৈতিক মুক্তির কথা বলেন?  যে দেশে তিন তিনটা সরকারি হাসপাতাল ঘুরে একজন মা তার সন্তানের জন্ম দিতে পারে না, শুধুমাত্র এই জন্য যে তার কাছে ১৫০০টি টাকা নেই, সেই দেশে এসব রূপকথা গল্প শোনান কোন সাহসে? কারা জিডিপি গ্রোথের ভোজবাজি দেখিয়ে আমাদের ব্যস্ত রাখে? যে দেশে চিকিৎসার মতন সবচেয়ে মৌলিক অধিকারের কোনো ঠিকঠিকানা নেই সে দেশে এসব উন্নয়নের গল্প স্রেফ চাপাবাজি ছাড়া আর কি? একটা দেশের চিকিৎসাখাতে এতো দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা আর উদাসীনতা যে সেদেশের মানুষকে মানুষ নয় বরং জবাই হবার অপেক্ষায় থাকা জানোয়ারের সাথেই কেবল তুলনা করা যায়। তারপরও আপনার উন্নয়নের গল্প শোনাতে আসেন কোন সাহসে?

স্বাস্থ্যমন্ত্রী কি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন আপনি? আপনার না হয় কাড়ি কাড়ি টাকা আছে, পেটে সামান্য গ্যাস হলেও সিঙ্গাপুর ঘুরে আসেন, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যাওয়ার দরকার পড়ে না। তাই বলে নিজের দায়িত্ববোধ থেকেও কি একটাবার ঝটিকা সফরে যেতে পারেন না হাসপাতালগুলোতে? গিয়ে শুনতে পারেন না এদেশের গরিব অসহায় মানুষ রোগে শোকে যখন সবচেয়ে বেশি কাবু হয়ে থাকে তখন কেমন ব্যবহার পায় সরকারি হাসপাতালগুলো থেকে? কোনদিন জানতে চেয়েছেন, যখন মানুষ ভাতের চাল কিনতে বেতনের সিকি ভাগ খরচ করে ফেলে, তখন বিনা পয়সায় কটা ওষুধ পাবে বলে সরকারি হাসপাতাল, স্বাস্থ্যসেবা কমপ্লেক্সে বসে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, অথচ তাদের ওষুধ দেয়া হয় না, কেননা ঘুষ দেবার মতন সামর্থ্য নেই বলে, তখন সেই মানুষটা কি করে? তার কেমন লাগে? জানতে চেয়েছেন কোনোদিন? চাননি।

আপনারা পারেনও বটে। এতো অন্যায় এতো অনাচার করে কি করে নির্বিকার হয়ে বসে থাকেন?

এদেশের মানুষ এখন সামান্য সামর্থ্য হলেই ভারতে চলে যায় চিকিৎসা করাতে। ভারতের মেডিকেল ট্যুরিজমের ৮০% বেড়ে গেছে শুধুমাত্র বাংলাদেশিদের কারণে। ভেলর এখন বাংলাদেশিদের জন্য ভরসার জায়গা। চিকিৎসা করাতে কি করে ওখানে যেতে হবে, কতটাকা খরচ হবে এসব বৃত্তান্ত আমাদের গণমাধ্যম ফলাও করে ছাপছে। এসব চোখে পড়ে না আপনার? কত মোটা ঠুলি বেধে আছেন চোখে, হে মহাশয়?

এদেশে গরু ছাগলের দাম মানুষের চেয়ে বেশি। আমাদেরও গায়ের চামড়া ভাই, গন্ডারের চেয়েও কয়েকগুণ মোটা। নইলে আর কত? আর কত সহ্য করবেন এসব? আরো বহু আগেই আমাদের উচিৎ ছিলো রাস্তায় নামা, একটাই দাবি নিয়ে। সেটা হচ্ছে আর যেই যাক, স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের সচিব, কর্মকর্তা, কর্মচারী- কেউ সরকারি হাসপাতাল ছাড়া আর কোথাও চিকিৎসা করাতে পারবে না। না দেশে, না বিদেশে। কোথাও না। তখন দেখতেন চেহারা বদলে যেতো এদেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর।

লেখক: জনসংযোগ বিশেষজ্ঞ

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত