স্টার জলসা: সাড়ে ছয় ঘণ্টার ১৩ সিরিয়াল

সাইদুর রহমান
 | প্রকাশিত : ২১ অক্টোবর ২০১৭, ১৯:৪৪

মাত্র ১৩ সিরিয়ালের স্টার জলসা। সাড়ে ছয় ঘণ্টা, তাতেই বাজিমাত। বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবারের নারী সদস্যরা কমবেশি এখন স্টার জলসায় আসক্ত। বাসায় ফিরে টিভি দেখার উপায় নেই পরিবারের পুরুষ সদস্যদের। তাই তারাও নারী সদস্যর মতো স্টার জলসার জাদুতে জড়িয়ে পড়ছে। চ্যানেলটি জনজীবনের ওপর প্রভাব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে খুনোখুনির অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। আর ছাড়াছাড়ির দৃষ্টান্ততো অহরহ। 

বাংলা যতগুলো চ্যানেল রয়েছে তার মধ্যে ভারতীয় চ্যানেল ‘স্টার জলসা’ আমাদের দেশের দর্শকদের নজর কেড়েছে। তবে বাংলাদেশে এতো চ্যানেল থাকার পরও স্টার জলসায় মুগ্ধ হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। ভারতীয় চ্যানেলের অনুষ্ঠানগুলো অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় আর পরিবারের বিভিন্ন বয়সের সদস্যদের সঙ্গে বসে একসঙ্গে দেখার মতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, দেশের নারীদের ৬০ শতাংশই ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেল স্টার জলসার দর্শক। অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে তা ভাবনার বিষয়। আমরা এতো মেধাহীন হয়ে পড়েছে যে নিজেদের দর্শক পর্যন্ত ধরে রাখতে পারছি না। 

স্বল্প সময়ে জনপ্রিয়তা

চ্যানেলটি ২০০৮ সালের ৮ সেপ্টেম্বর চালু হয় এবং তার ব্র্যান্ড স্লোগান 'চলো পাল্টাই' নাম নিয়ে। বিভিন্ন পারিবারিক ঘরানার নাটকীয়তামূলক অনুষ্ঠানমালা প্রচার করে থাকে প্রতিদিন। চ্যানেলটি জনপ্রিয় আরেকটি সহোদর চ্যানেল হল জলসা মুভিজ ও স্টার জলসা এইচডি। স্বল্প সময়ে এতো জনপ্রিয়তা কেন? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই জরিপের পাশাপাশি আমি নিজেও বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে চ্যানেলটির জনপ্রিয়তার বিষয়টি নিয়ে ভেবেছি। জনপ্রিয় কারণ কী? চ্যানেলটি ২০০৮ সালের শেষদিকে যাত্রা শুরু করলেও জনপ্রিয়তা পেয়েছে মূলত 'মা' সিরিয়াল দিয়ে। একটানা চার থেকে পাঁচ বছর তুমুল জনপ্রিয় ছিল মা সিরিয়ালটি। প্রতিটি পর্বে এক ধরনের উত্তেজনা। পরের পর্বটি দেখার তীব্র আবেগ। প্রতিটি পর্ব এমন জায়গায় শেষ হবে যে, আপনি মানতে নারাজ, মজা পাচ্ছেন আরও বেশি কিছু প্রত্যাশা করছেন। বিশ্বকবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেরা ছোটগল্প, 'শেষ হইয়াও হইল না শেষ' এর মতো। এই যেমন কিরণমালা ও বোঝে না সে বোঝে না, ইস্টি কুটুম, আঁচল, টাপুর টুপুর, তোমায় আমায় মিলে, ভালোবাসা ডট কম, কাঁনামাছি, পটল কুমার গানওয়ালা সিরিয়াল গুলি এ দেশের নারী দর্শকদের মন জয় করে ফেলেছে। জনপ্রিয়তাও ছিল সেই রকম। মাত্র ১৩টি সিরিয়াল দিয়ে স্বল্প সময়ে ৬০ শতাংশ নারীর মন জয় করাটি কিন্তু আসলেই কষ্টকর।

স্টার জলসার ১৩ সিরিয়াল

১৩ সিরিয়াল প্রসঙ্গে আসি। বাংলাদেশ সময় সাড়ে ৫টা থেকে স্টার জলসার ঝলকানি শুরু। বর্তমানে ভারতের সময় ৫টায় প্রেমের কাহিনি দিয়ে শুরু ১৩ সিরিয়াল। প্রতি আধা ঘণ্টা পর পর একটি করে সিরিয়াল। বিরতিহীনভাবে বাংলাদেশ সময় রাত ১২টা পর্যন্ত। মাত্র সাড়ে ছয় ঘণ্টায় ঘরের গৃহিনীরা মুগ্ধ। বাংলাদেশ সময় বিকাল সাড়ে ৫টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত।

বর্তমানে সাড়ে ৫টায় 'প্রেমের কাহিনি' ৬টায় মায়ার বাঁধন, সাড়ে ৬টায় কুন্দ ফুলের মালা, ৭টায় সন্যাসী রাজা, সাড়ে ৭টায় কুসুম দোলা, ৮টায় কে আপন কে পর, সাড়ে ৮টায় জয়কালি কলকাতাওয়ালি, ৯টায় আদুরিনী, সাড়ে ৯টায় প্রতিদান, ১০টায় ভজ গোবিন্দ, সাড়ে ১০টায় রাখি বন্ধন, ১১টায় খোকা বাবু এবং সাড়ে ১১টায় ভক্তের ভগবান শ্রীকৃঞ্চ।

মজার ব্যাপার হলো সাড়ে ছয় ঘণ্টা আপনি যেকোনো একটি সিরিয়াল মিস করলেও সমস্যা নেই। প্রতিটি সিরিয়াল আবার দিনভর দেখার সুযোগ দিচ্ছে চ্যানেলটি। রাত ১২টারও আবার দেখানে হয়। এমনভাবে সিরিয়ালগুলো সাজানো যে আপনি মিস করলে চ্যানেল আপনাকে যে কোনোভাবে দেখানোর সুযোগ দেবে। 

সিরিয়ালগুলো পারিবারিক আবহে। একেকটি একেক ধরনের। কোনোটির সঙ্গে কোনোটির মিলও নেই। প্রেম, ভালোবাসা, পারিবারিক জীবন, ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ও ধর্মীয় সিরিয়ালও আছে। ৩০ মিনিটের প্রতিটি সিরিয়াল আবার তিন পর্বের। বলা যায় ২০ মিনিট সিরিয়াল। বিজ্ঞাপনের আধিক্য থাকলে খারাপ লাগে না। রয়েছে পোশাক, গহনা ও স্টাইলিশ ধরণও। চাকচিক্যময় বাড়ি, ফার্নিচারের বৈচিত্র্য। বছর শেষে 'স্টার জলসা পরিবার অ্যাওয়ার্ড' এবং জয় হে অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে। 

আমাদের চ্যানেল কেন পিছিয়ে?

কলকাতার বাংলা টিভি চ্যানেলগুলোর একটা নির্দিষ্টতা আছে, নিজস্বতা আছে। সিনেমা, নাটক, তথ্যচিত্র, খেলা, সংবাদ, গানসহ প্রত্যেকটির জন্য ভিন্নভিন্ন চ্যানেল। আর বাংলাদেশে অধিকাংশ মিক্সড চ্যানেল। একই সময়ে সংবাদ, গান, টকশো হচ্ছে প্রতিটি চ্যানেলে। একটা অনুষ্ঠান পছন্দও হলে বিজ্ঞাপনের আধিক্য অতিমাত্রায়। চ্যানেলের সংখ্যা বাড়লেও মান বাড়েনি, বরং কমেছে। অথচ কিছু দিন আগেও বাংলা টিভিজগতে আমাদের চ্যানেলই ছিল বিনোদনে, গৌরবে, মহিমায় অদ্বিতীয়। আমরা দেখেছি বা শুনেছি সকাল সন্ধ্যা, অয়োময়, রুপনগর, বহুব্রীহি, কোথাও কেউ নেই, দিনরাত্রির কথা। একান্নবর্তী, বন্ধন, রঙের মানুষ সর্বশেষ বড় ছেলেও আমাদের হৃদয় কেড়েছে। কিন্তু ক্ষণে ক্ষণে হচ্ছে ভালো কাজগুলো। কেননা এখন বাংলাদেশ নাটকের যেমন স্ক্রিপ্ট, তেমন গল্প, তেমনি অভিনয়। কলকাতার চ্যানেল মানে ঠাসা বিনোদন। অযথা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কথা বলে ভারতীয় চ্যানেল বন্ধের কথা বলছি। প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অবক্ষয়ের নামে চ্যানেল বন্ধের দাবি যুক্তিযুক্ত নয়। স্টার জলসার চেয়ে ভালো মানের অনুষ্ঠান নির্মাণ করে নিজেদের প্রমাণ করুন, আমরা পিছিয়ে নেই। আমাদের মেধা আর মনন দিয়ে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা টিকে থাকতে হবে। প্রমাণ করতে হবে স্টার জলসা বা জি বাংলা নয় আমাদের চ্যানেলই সেরা।

লেখক: সাংবাদিক, দৈনিক ইত্তেফাক সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত