হাথুরার একচ্ছত্র আধিপত্য ক্রিকেটের জন্য কাল হতে পারে

খন্দকার জামিল উদ্দিন
 | প্রকাশিত : ২২ অক্টোবর ২০১৭, ২১:৩৩

দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে যা হলো বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য তা ভয়াবহ লজ্জার। বাংলাদেশ ক্রিকেটের ফলোয়ার হিসেবে আমি খুবই লজ্জিত, এবং অপমানিতও বটে। দেশের বাইরে হারতেই পারে দল, তাই বলে এভাবে? দক্ষিণ আফ্রিকা যখন ব্যাট করে তখন মনে হয়েছে উইকেট কতইনা ব্যাটিং সহায়ক!অথচ বাংলাদেশ ব্যাট করলে মনে হয় এর চেয়ে বোলিং উইকেট আর হয়ই না! বোলাররা ওভার প্রতি ৮/৯ করে রান দিচ্ছেন। ব্যাটসম্যানরা তো দাঁড়াতেই পারছেন না। এই পর্য়ায়ে এসে দলের এমন অবস্থা মেনে নেওয়া যায় না।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের আসলে কতটুকু উন্নতি হয়েছে? দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে বাজে ফল বড়সড় এ প্রশ্নটা জুড়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের বড়ই বিব্রতকর এই সফর। এই ফল মেনে নেওয়ার মতো নয়। এই দায় কার? কেন সাসটেইন্যাবল ডেভেলপমেন্টের জন্য সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করা হয়নি।উন্নতি হতে হবে সাসটেইন্যাবল।দেশের মাটিতে স্পিন, টার্নিং উইকেট বানিয়ে জিতলাম, আর দেশের বাইরে মুখ থুবড়ে পড়লাম-এটা আসলে উন্নতি নয়। বরং এটা বিব্রতকর। দেশের বাইরে কীভাবে ভালো করবে দল- তার জন্য  কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ হয়েছে বলে মনে হয় না।

কোচ তো সুদূরপ্রসারী চিন্তা করবেন না। তার চিন্তা এটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য।যে সময় পর্যন্ত তার চাকরি আছে। আর সেটাই করছেন আমাদের কোচ চন্ডিকা হাথুরাসিংহে। কেন তাকে সর্বময় ক্ষমতা দিয়ে দেওয়া হয়েছে? তিনি যা চাইবেন, সেটা কেন হবে?কোচ ২০১৯ সালে চলে যাবেন।  বাংলাদেশ ক্রিকেট তো এদেশের সম্পদ।

কোচ যা করছেন তা মেনে নেওয়ার মতো নয়। কেন অধিনায়কের ক্ষমতা থাকবে না? একাদশ নির্বাচনে কেন এতো পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হচ্ছে? তার কারণে মুমিনুলের মতো প্রতিভা আজ কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে। ৪৬ এর উপর যার ব্যাটিং গড় তাকে কেন বাদ দেওয়া হয়? কোন যোগ্যতায় লিটন দাসকে বারবার একাদশে নেওয়া হচ্ছে? নিউজিল্যান্ড সফরে আবিষ্কার কর হলো লেগ স্পিনার তানভীর হায়দারকে। কোথায় এখন কোচের সেই পছন্দের তানভীর? যুবায়ের হোসেন লিখনওবা কোথায়?

মুশফিক বরাবরই বলে আসছেন উইকেট কিপিং তার পছন্দ।কিন্তু তার কাছ থেকে কিপিং কেড়ে নেওয়া হয়েছে টেস্ট সিরিজে। অথচ ওয়ানডে সিরিজে সেই মুশফিককেই কিপিংয়ে রাখা হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যান হিসেবে একাদশে রাখা হয়েছে লিটন কুমার দাসকে। দলের কতটা দূরাবস্থা তা এটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

একজন ক্রিকেটারের আসল জিনিস হলো মনোবল। মুমিনুলের মনোবল ধ্বংস করার জন্য যা যা করার তার সবাই করেছেন হাথুরাসিংহে। আমি মনে করি, সাব্বির, ইমরুল ও সৌম্যর ক্যারিয়ারও শেষ করে দিচ্ছেন কোচ। তামিমের সঙ্গে উদ্বোধনী জুটিতে অনেক সাফল্য আছে ইমরুলের। তা সত্বেও তাকে ওয়ান ডাউনে নামিয়ে সৌম্যকে দিয়ে ওপেন করানো হচ্ছে। কোচ সবচেয়ে বড় ভুল করেছেন সৌম্য ও সাব্বিরকে দিয়ে এত তাড়াতাড়ি টেস্ট খেলিয়ে। তারা আসলে সীমিত ওভার ফরম্যাটের খেলোয়াড়। টেস্ট খেলার মতো পরিপক্কতা এখনও তাদের মধ্যে গড়ে ওঠেনি।অথচ তাদের বারবার ৫ দিনের ম্যাচে খেলিয়ে আত্মবিশ্বাস জিনিসটা ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। তারা টেস্টে ব্যর্থ হচ্ছেন। আর  এই ব্যর্থতার চাপ পড়ছে ওয়ানডে ফরম্যাটেও। এখানেও তারা রান পাচ্ছেন না। কেন তিনি টেস্ট ও ওয়ানডের জন্য আলাদা খেলোয়াড় বাছাই করতে পারছেন না, তা আমার বুঝে আসে না।

শাহরিয়ার নাফিস, নাঈম ইসলামরা লঙ্গার ভার্সন ক্রিকেটে টানা রান করেই যাচ্ছেন। অথচ সহস্যজনকভাবে তারা উপেক্ষিত। তাদের টেস্টে জায়গা দেওয়া সময়ের দাবি।অথচ তাদের না ডেকে অপরিপক্ষ খেলোয়াড়দের নিয়ে টেস্ট খেলিয়ে তাদের ক্যারিয়ারই হুমকির মুখে ফেলে দিযেছেন হাথুরাসিংহে। কেনো কোচ যা চাইবেন সেটাই মেনে হবে? নির্বাচকরা তাহলে কী করেন? কোচ তো ঘরোয়া ক্রিকেটের খবরই রাখেন না। আন্তর্জাতিক সিডিউল না থাকলেই তিনি ছুটিতে থাকেন। অথচ ওই সময়ে তার উচিৎ ঘরোয়া ক্রিকেট দেখা। কে ভালে করলো, কে সুযোগ পাওয়ার যোগ্য তা নিয়ে কাজ করা। কিন্তু তিনি এগুলোর ধার ধারেন না। অথচ দল নির্বাচনের তার কথাই সব। কী অদ্ভূৎ! এসব বিষয়ে বিসিবিকে খুব সিরিয়াস হতে হবে। কোচে উপর সব ছেড়ে দেওয়ার ফল তো পাওয়াই যাচ্ছে। কোচের একচ্ছত্র আধিপত্য বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য বড় কাল হতে পারে।

আমি তো ভুব শঙ্কিত। আমার এ শঙ্কা বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে। আমি ভোলো কোনো পাইপ লাইন দেখতে পারছি না। ঘুরো ফিরে সেই পুরানোরাই। সাকিব, তামিম, মুশফিক, রিয়াদরা ভালো করলে দল ভালো করে। তারা ব্যর্থ হলে দলও ব্যর্থ। নতুনরা কোনা অবদানই রাখতে পারেছেন না। আমাদের তো  কোনো ‘ এ’ দলই নেই। যুব দল থেকে সরাসরি জাতীয় দল ঢুকছে খেলোয়াড়রা। মুস্তাফিজ, মিরাজ, মোসাদ্দেক, সাইফউদ্দিন- সবাই এসছেন অনুর্ধ্ব-১৯ দল থেকে।

বয়সভিত্তিক দল থেকে হঠাৎ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখা যে কোনো খেলোয়াড়ের জন্যই বাড়তি চাপের কারণ। আর সেই চাপ নিতে পারছে না তারা। অথচ এদের যদি ‘এ’ দলে রেখে দেশের বাইরে নিয়মিত সিরিজ খেলানোর ব্যবস্থা করা যেত তাহলে তাদের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার এতটা চ্যালেঞ্জে পড়তো না।

দেশে ইচ্ছামতো টার্নিং উইকেট বানিয়ে সাফল্য পেলাম, আর দেশের বাইরে গো হারা হারলাম- এটা আসল উন্নতি নয়। উন্নতি হবে হবে সাসটেইন্যাবল। নিউজিল্যান্ড সফর আমাদের জন্য শিক্ষা ছিল। তবে বাংলাদেশের জন্য চরম শিক্ষা দক্ষিণ আফ্রিকা সফর। বিসিবিকে নতুন করে পরিকল্পনা করতে হবে। আমার মনে হয়, দেশের বাইরে ভালো করার বাপারে খুব বেশি সচেতন ছিল না বিসিবি। এখন এ বিষয়ে অনেক বেশি সিরিয়াস হতে হবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে।

 খন্দকার জামিল উদ্দিন : সাবেক বিসিবি পরিচালক

সংবাদটি শেয়ার করুন

খেলাধুলা বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত