টাঙ্গাইল-২

বিএনপিতে টুকু আর ‘নতুনের খোঁজে’ আ.লীগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, টাঙ্গাইল
| আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০১৭, ০৮:৪২ | প্রকাশিত : ২৩ অক্টোবর ২০১৭, ০৮:৩১

বছর খানেক পরই আসছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট। দেশের অন্যান্য সংসদীয় আসনের মতো টাঙ্গাইল-২ আসনেও প্রস্তুতি নিচ্ছেন প্রধান দলগুলোর সম্ভাব্য প্রার্থীরা। এখানে বিএনপির একক প্রার্থী অনেকটা নিশ্চিত হলেও ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগকে খুঁজতে হবে নতুন প্রার্থী।

গুঞ্জন আছে ক্ষমতাসীন দলের বর্তমান এমপি আসাদুজ্জামান আগামী নির্বাচনে অংশ নেবেন না। সে ক্ষেত্রে মনোনয়ন চাইতে পারেন তার ছেলে।
তবে ইতিমধ্যে প্রধান দলগুলো- আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থীরা আগাম প্রচারণায় নেমে পড়েছেন। নিজেদের নামে শুভেচ্ছা জানিয়ে ব্যানার-ফেস্টুন টানানো এবং নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন তারা। উন্নয়নমূলক কাজ, জনসভা, পথসভা, শোভাযাত্রাসহ বিভিন্ন কর্মকা-ে অংশ নিচ্ছেন অনেকে। কেউ কেউ সুখ-দুঃখের অংশীদার হতে ছুটে যাচ্ছেন মানুষের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। এবারের ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণেও দেখা গেছে নির্বাচনী প্রচারণার আমেজ।

গোপালপুর উপজেলার সাত ইউনিয়ন, এক পৌরসভা ও ভুঞাপূর উপজেলার ছয় ইউনিয়ন, এক পৌরসভা নিয়ে গঠিত টাঙ্গাইল-২ আসনে কখনো কোনো একক দলের একাধিপত্য দেখা যায়নি। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত গত ১০টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে চারবার করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি, একবার করে জাতীয় পার্টি ও জাসদের (সিরাজ) প্রার্থীরা জয় লাভ করেন।

১৯৭৩ সালে ১ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হাতেম আলী তালুকদার ন্যাশনাল আওয়ামী লীগ পার্টির মো. হাতেম আলী খানকে পরাজিত করেন। ১৯৭৯ সালে বিএনপি প্রার্থী আফাজ উদ্দিন ফকির জয় লাভ করেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগের মো. হাতেম আলী তালুকদার। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী শামছুল হক তালুকদার ছানু আওয়ামী লীগের মো. হাতেম আলী তালুকদারকে পরাজিত করেন। ১৯৮৮ সালে নির্বাচিত হন জাসদের (সিরাজ) আ. মতিন হিরু। তিনি হারান জাতীয় পার্টির শামছুল হক তালুকদার ছানুকে।

এরশাদের পতনের পর গণতন্ত্র-উত্তর প্রথম (১৯৯১ সালের ৫ম জাতীয় সংসদ) নির্বাচনে বিএনপির আ. সালাম পিন্টু আওয়ামী লীগের হাতেম আলী তালুকদারকে পরাজিত করেন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির একতরফা নির্বাচনে বিএনপির আব্দুস সালাম পিন্টু আবার এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি হেরে যান আওয়ামী লীগ প্রার্থী খন্দকার আসাদ্জ্জুামানের কাছে।

২০০১ সালে বিএনপি পুনরুদ্ধার করে আসনটি। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী খন্দকার আসাদ্জ্জুামানকে অল্প ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে তৃতীয়বারের মতো এমপি নির্বাচিত হন আব্দুস সালাম পিন্টু। তিনি পান ১ লাখ ৫ হাজার ২৭৩ ভোট, আর খন্দকার আসাদ্জ্জুামান পান ১ লাখ ২ হাজার ৯৯৯ ভোট।

২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাল্লা ঘুরে খন্দকার আসাদুজ্জামানের দিকে। দ্বিতীয়বারের মতো এমপি নির্বাচিত হন তিনি। আব্দুস সালাম পিন্টু ২১ আগস্ট গ্রেনেট হামলা মামলায় কারাগারে থাকায় ছোট ভাই সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বিএনপির প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে অংশ নেন। খন্দকার আসাদুজ্জামান (আওয়ামী লীগ) পান ১ লাখ ৪৪ হাজার ৭১০ ভোট, সুলতান সালাউদ্দিন টুকু (বিএনপি) পান ১ লাখ ৩ হাজার ৫০৯ ভোট।
সর্বশেষ ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেয়ায় এ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী খন্দকার আসাদুজ্জামান ও জাতীয় পার্টির (মঞ্জু) আব্দুল আজিজের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। তৃতীয়বারের মতো এমপি নির্বাচিত হন খন্দকার আসাদুজ্জামান। এতে খন্দকার আসাদুজ্জামান পান ১ লাখ ৪০ হাজার ৭৫৯ ভোট এবং আব্দুল আজিজ পান ৪ হাজার ২৯৬ ভোট।

সম্ভাব্য প্রার্থী যারা

বর্তমান এমপি খন্দকার আসাদুজ্জামান বয়সের ভারে এলাকায় না আসায় দলীয় কর্মী-সমর্থক ও সাধারণ মানুষ তার প্রতি অনেকটাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন বলে জানায় আওয়ামী লীগের একটি সূত্র। সূত্র জানায়, তিনি আর নির্বাচন করবেন না। তার জায়গায় মনোনয়ন চাইবেন ছেলে সোনালী ব্যাংক লিমিটেডের সাবেক পরিচালক ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মশিউজ্জামান রোমেল। তিনি এলাকায় এসে গণসংযোগ চালিয়ে ভোটারদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন।

এ ছাড়া আওয়ামী লীগের আরো ৪-৫ জন নেতা নিজ নিজ আঙ্গিকে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খন্দকার আশরাফুজ্জামান স্মৃতি, জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক তানভীর হাসান ছোট মনির, গোপালপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা মো. ইউনুছ ইসলাম তালুকদার ঠান্ডু, কর্নেল মির্জা হারুন অর রশিদ (অব.), ভূঞাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি উপজেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল হালিম অ্যাডভোকেট, ভূঞাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ও পৌর মেয়র মাসুদুল হক মাসুদ।

অন্যদিক এ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক সভাপতি ও বর্তমান যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু অনেকটাই নিশ্চিত বলে দল সূত্রে জানা গেছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি অল্প ভোটের ব্যবধানে হেরেছিলেন। এবার দলীয় চেয়ারপারসনের সবুজ সংকেত পেয়ে পুরোদমে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

১৯৯১ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত এ আসনে নির্বাচন করেন টুকুর বড় ভাই কেন্দ্রীয় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম পিন্টু। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় কারাগারে থাকায় তার স্থলে এ আসনে মনোনয়ন দেয়া হয় টুকুকে।

বিএনপির একটি সূত্র জানায়, আগামী নির্বাচনে আব্দুস সালাম পিন্টু অংশ নেয়ার সুযোগ পেলে তিনিই এ আসনের মনোনয়ন পাবেন। সে ক্ষেত্রে সুলতান সালাউদ্দিন টুকুকে অন্যত্র মনোনয়ন দেয়া হবে। আর যদি সালাম পিন্টু নির্বাচন করতে না পারেন তাহলে  সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বিএনপির প্রার্থী নিশ্চিত।

এ আসনে জাতীয় পার্টির (এরশাদ) প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেবেন সাবেক এমপি শামছুল হক তালুকদার ছানু। এদিকে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জামায়াত এ আসনে অনেকটা নিষ্ক্রিয়। তবে গোপনে তারা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে দলটির এক নেতা জানিয়েছেন।  

বড় দুই দলেই অন্তঃকোন্দল

এ আসনে বড় দুই দলেই রয়েছে কোন্দল। তবে আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপির কোন্দল অনেকটা তুঙ্গে। ভূঞাপুর উপজেলা পৌর বিএনপিতে দুটি কমিটি রয়েছে। একটির উপজেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে রয়েছেন অ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তফা ও অন্যটির সাবেক পৌর মেয়র আব্দুল খালেক। অধিকাংশ নেতাকর্মী অ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তফার অনুসারী। কিন্তু বয়স্ক বেশির ভাগ নেতা-কর্মী আব্দুল খালেক মন্ডলের পক্ষে। এবার বন্যায় ত্রাণ বিতরণের সময় উভয় কমিটির লোকজনদের পৃথকভাবে ত্রাণ বিতরণ করতে দেখা গেছে।

অপরদিকে দলীয় কোন্দলের কারণে দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় ধরে আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে চলছে ভূঞাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ। দলটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন পৌর মেয়র মাসুদুল হক মাসুদ। তিনটি ইউনিয়নের কমিটি দেয়া নিয়ে কোন্দল ছড়ায় ভেতরে ভেতরে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক হিসেবে খ্যাত গোপালপুরেও রয়েছে ব্যাপক কোন্দল। গোপালপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হালিমুজ্জামান এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র মো. রকিবুল হক ছানার মধ্যে ব্যাপক দ্বন্দ্ব রয়েছে। ফলে নেতাকর্মী-সমর্থকরা এখন দুটি অংশে বিভক্ত। দলীয় কার্যক্রমেও পড়েছে ভাটা।

এদিকে এ উপজেলায় বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই। আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে চলছে দলটি। আহ্বায়ক খন্দকার জাহাঙ্গীর আলম ও যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম লেনিনের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক দ্বন্দ্ব। কেউ কারো ছায়া দেখতেও নারাজ। ফলে নেতা-কর্মীদের মধ্যে রয়েছে বিশৃঙ্খলা।

নির্বাচন কমিশন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, টাঙ্গাইল-২ আসনে মোট ভোটারসংখ্যা ৩ লাখ ৪২ হাজার ৪২৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ৭৩ হাজার ৩৯জন এবং মহিলা ভোটার এক লাখ ৬৯ হাজার ৩৮৯ জন।

(ঢাকাটাইমস/২৩অক্টোবর/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত