পায়ে পায়ে রোহিঙ্গা-০১

উখিয়া-টেকনাফের জনজীবন ছত্রখান

অনলাইন ডেস্ক
 | প্রকাশিত : ২৩ অক্টোবর ২০১৭, ১১:১২

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে ঠাঁই হয়েছে রোহিঙ্গাদের। পাহাড় কেটে ঘর তোলা হয়েছে। জ¦ালানির জন্য উজাড় হচ্ছে বন। ভারসাম্য হারাচ্ছে পরিবেশ। বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। পণ্যমূল্য, গাড়িভাড়া দ্বিগুণ বৃদ্ধি। নিরাপত্তাহীনতায় স্থানীয় অধিবাসীরা। ঢাকাটাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকমের সরেজমিন অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে আরো নানা উদ্বেগজনক তথ্য।

উখিয়া, টেকনাফ ও নাইক্ষ্যংছড়ি ঘুরে এসে লিখেছেন হাবিবুল্লাহ ফাহাদ। সহযোগিতায় ছিলেন মোসলেহ উদ্দিন, সৈয়দ ঋয়াদ ও বলরাম দাশ অনুপম। আজ থাকছে প্রথম পর্ব।

কেউ বলে অ্যাকাশিয়া, কেউ আকাশি আবার কেউ আকাশমনিÑ গাছ একটাই। গাছগুলো বেশ লম্বা হয়। অল্পদিনে বাড়ে। উখিয়ার পাহাড়গুলোতে স্থানীয়রা সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির মাধ্যমে বাগান করে। যুগের পর যুগ এভাবেই বন গড়ে উঠেছিল পাহাড়ের গায়ে।

এখন সবই গল্প। পাহাড় আছে। তবে না থাকার মতোই। কয়েক মাসের ব্যবধানে পাহাড়ের বিশালতা কোদালের ধারে হারিয়ে গেছে। সিঁড়ির মতো কেটে কেটে পাহাড়কে প্রায় সমতলের সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। আর গাছ? নেই। গুঁড়িটাও তুলে নেয়া হয়েছে মাটি খুঁড়ে। বোঝারও উপায় নেই এখানে প্রকা- গাছ ছিল। ঘন অরণ্যে প্রাণীরা ছিল। হাতি ছিল। ছিল এ-ডাল থেকে ও-ডালে বানরের ছোটাছুটি। বনমোরগের ডাক শোনেনি স্থানীয় এমন বাসিন্দা সম্ভবত খুঁজে পাওয়া যাবে না। এসবই এখন অতীত।

পাহাড় ঘেরা কক্সবাজারের উখিয়া এখন ‘রোহিঙ্গা জনপদ’। নাফ নদী পার হয়ে বানের পানির মতো বাংলাদেশে ঢুকেছে মানুষ। এরা সবাই মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বাসিন্দা। সেখানেই তাদের বাড়ি। সবকিছু ওপারে রেখে এ দেশে এসেছেন উদ্বাস্তু হয়ে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্যাতনে দেশ ছেড়েছেন তারা।

আগস্টের শেষদিকে আসতে শুরু করে রোহিঙ্গারা। এর আগেও এসেছে। যার শুরু ১৯৭৮ সালে। এবার সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। প্রায় দুই মাসে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা ঢুকেছে বাংলাদেশে। এটি স্থানীয় প্রশাসনের অনুমান। তবে সরকারি হিসাবেও এই সংখ্যা ছাড়িয়েছে পাঁচ লাখ। আর বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, নাফ নদী পার হয়ে এসেছে প্রায় ১০ লাখ মানুষ।

এসব মানুুষের ঠাঁই হয়েছে সাগরঘেঁষা উখিয়া আর টেকনাফের পাহাড়ে পাহাড়ে। তারা ঘর বানাতে কেটেছে গাছ। তারপর পাহাড় কেটে চারকোনা গর্ত করে তৈরি করা হয়েছে ঘর। খুঁটি হয়েছে বাঁশের। চারপাশে বাঁশের বানানো বেড়া। ছাদ মোটা কালো পলিথিনের। শৌচাগারগুলো বেশির ভাগই দুই ঘরের মাঝখানের জায়গায়। টিউবওয়েল বসানো হয়েছে পাহাড়ের ঢালুতে। ওঠানামার জন্য সিঁড়ি কাটা হয়েছে চার পাশেই।

পালংখালীর গইয়ালমারা পাহাড় থেকে নেমে আসার পথে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা হেলাল উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি জানালেন, শফিউল্লা কাটা আর গইয়ালমারার দুটো পাহাড় সহোদরের মতো গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। আঙুলে দূরে দেখিয়ে বলেন, ‘একসময় ইয়ানো ঘন বনের লাই সূর্যের আলো ঢুকিত পাইত্যো না। অন দেখিয়েড়ে মনে হয় আঁড়া মরুভূমির কন দ্বীপে আই পইজ্যি।’ হেলাল নিজেও সামাজিক বনায়নের সঙ্গে জড়িত। পাকা পথ থেকে কয়েক শ গজ দূরে নিজ বাড়ির উঠোনে ডেকে নিয়ে বললেন, ‘এগুন সব চিকনপাতা গাছের চারা। হাজার হাজার চারা নষ্ট হইয়্যে।’

উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় এ পর্যন্ত তিন হাজার একর বনভূমি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে রোহিঙ্গা নিবাসে। তবে বাস্তবে এর পরিমাণ আরও বেশি। এদিক-সেদিক ডেরা তুলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে শরণার্থীরা। কেউ কেউ আবার বাসা ভাড়া করেও আছে। আগে উখিয়া ও টেকনাফ মিলিয়ে মোট জনসংখ্যা ছয় লাখের মতো ছিল। এখন জনসংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। রোহিঙ্গাদের সংখ্যাধিক্যে এখন স্থানীয়রাই সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছে। এখানে এলেই চোখে পড়বে বোরকা কিংবা থামি পরা নারীদের। কারো কোলে, কারো হাতে আঙুল ধরে হাঁটছে শিশুরা। ছেলেদের পোশাকেও বিশেষত্ব আছে। প্রায় সবার পরনেই লুঙ্গি। তবে গায়ের শার্ট বা গেঞ্জিটি তারা লুঙ্গিতে গুঁজে রাখে।

হঠাৎ করে বিপুল এই বাড়তি জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে উপজেলা দুটোতে। বন অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, এ পর্যন্ত বনের ক্ষতি দেড় শ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। পাহাড়, জলাশয়, সমুদ্র সৈকতসহ পরিবেশের অন্যান্য খাতের ক্ষতিও কম হয়নি। এসব নিয়ে বন ও পরিবেশবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হাছান মাহমুদ বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের প্রভাব এসে কক্সবাজারের পর্যটন এলাকাতেও পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে পর্যটন নগরী হুমকির মুখে পড়বে।’

শুধু পাহাড় কাটা কিংবা বন উজাড় নয়, রোহিঙ্গা নিবাস এলাকাগুলোতে শান্তিতে দম নেয়ার সুযোগ নেই। মলমূত্রের দুর্গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে আছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে আবর্জনা। প্রতিটি শিবিরে অসহনীয় পরিবেশ। উদ্বাস্তুদের এসব জনপদে কোনো সুস্থ মানুষ একবার ঘুরে এলে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। ডায়রিয়া ও কলেরায় আক্রান্ত অনেকের দেখা মিলছে।

উখিয়ার বালুখালীর স্থানীয় বাসিন্দা মিয়ার নাহার ঢাকাটাইমসকে  বলেন, ‘দুর্গন্ধের জন্য থাকা যায় না। কী যে আজাবে আছি বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না।’ বাড়ির সামনের ধান লাগানো খেতটি দেখিয়ে বলেন, ‘ফসল সব শেষ। প্রশাসনের লোকজন এসে বলে গেছে আর যেন ধান না লাগাই। কী নাকি রোহিঙ্গাদের জন্য হাসপাতাল বানাবে।’

রোহিঙ্গা শিবির অধ্যুষিত এলাকায় অপরাধকর্ম বেড়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকঠাক শিক্ষাকার্যক্রম চালাতে পারছে না। সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসক ও চিকিৎসা সহযোগীরাও আছেন রোহিঙ্গাদের নিয়ে। এতে স্থানীয়রা পাচ্ছেন না চিকিৎসাসেবা। জিনিসপত্রের দাম হয়েছে তিন গুণ। যানবাহনের ভাড়া হয়েছে দ্বিগুণ। শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ায় স্থানীয় দিনমজুর শ্রেণির মানুষ বেকার হয়ে পড়ছে।

থ্যাংখালীর বাসিন্দা আজু মোল্লা আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরাও গরিব মানুষ। খেত-খামার করে খাই। এখন রোহিঙ্গাদের মানবতা দেখাইতে গিয়া নিজেদেরই না খেয়ে মরতে হবে। ১০ টাকার বেগুন এখন ৯০ টাকা। পাঁচ টাকার গাড়ি ভাড়া এখন ২০ টাকা। রোহিঙ্গারা তো ত্রাণ পাবে। আমাদের তো আর কেউ ত্রাণ দেবে না। আমাদের কী হবে?’

টেকনাফের লেদা দখিন গ্রামে বাড়ি সরওয়ার কামালের। পেশায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালক। বললেন, ‘রোহিঙ্গারা এখানে আসি আমাদের ভাত মেরেছে। এখানকার দিনমজুররা কাজ পাচ্ছে না। আগে একজন মজুর সারা দিন খেটে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পেত। এখন রোহিঙ্গারা সেই কাজ করছে ২০০ টাকায়।’

স্থানীয় জনজীবনে প্রভাব সম্পর্কে উখিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নিকারুজ্জামান ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে সামাল দেয়া সহজ কথা নয়। তবে প্রশাসন সব সময়ই সচেষ্ট আছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও বেশ সতর্ক। কোনোভাবে যেন তারা অন্যায়-অপরাধে জড়াতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখা হচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এটা ঠিক পাহাড় বা বনভূমির বেশ ক্ষতি হয়েছে। এটি পরিবেশের ভারসাম্য নষ্টের কারণ হচ্ছে। তবে রোহিঙ্গাদের নির্দিষ্ট স্থানে সরিয়ে নেয়ার পর খালি জায়গাগুলোতে দ্রুত চারা রোপণ করে বনায়ন করতে পারলে ক্ষতি অনেকটা কমে আসবে।’

একই প্রসঙ্গে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাহিদ হোসেন ছিদ্দিক বলেন, ‘টেকনাফ গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যটন এলাকা। এই এলাকার ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ যেন বিনষ্ট না হয় আমরা সেই চেষ্টা করছি। রোহিঙ্গাদের কারণে কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। তবে আমরা চাইছি আর যেন কোনো ধরনের ক্ষতি না হয়।’

(ঢাকাটাইমস/২৩অক্টোবর/এইচএফ/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত