রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারকে চাপ দেবে চীন: দীপু মনি

তানিম আহমেদ, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ২৪ অক্টোবর ২০১৭, ০৮:০০

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের ঘনিষ্ঠ মিত্র চীনের দিকে তাকিয়ে বাংলাদেশ। দেশটিতে সফরে যাওয়া বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলকে চীন সরকার আশ্বাস দিয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি দীপু মনি।

ঢাকাটাইমসকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে দীপু মনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়গুলো অনেক ক্ষেত্রেই জটিল। চীন মিয়ানমারকে সমর্থন করছে-এই কথাটা সত্য হলে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে এ নিয়ে আলোচনায় বাধা দিত তারা।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে আলাপচারিতার তৃতীয় ও শেষ পর্বে থাকছে রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গ। ভ

রোহিঙ্গা সংকট সরকার মোকাবেলা কীভাবে করবে?

রোহিঙ্গা সংকট একটা বিশাল সমস্যা। বিপুল সংখ্যক মানুষ আশ্রয় নিতে বাংলাদেশে আসছে। মানবতা ও মানবিকতার স্বার্থে বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক, সামাজিক, পরিবেশগতভাবে ও নিরাপত্তাসহ বিভিন্নভাবে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। বিশেষ করে স্থানীয় জনগণ বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এখন এ সমস্যার সমাধান বাংলাদেশের হাতে নয়, মিয়ানমারের হাতে। কারণ তাঁরাই এ সমস্যার সৃষ্টি করেছে, সমাধানও সেখানেই হতে হবে। তাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়াই হলো চূড়ান্ত সমাধান।

কিন্তু মিয়ানমার তো ফিরিয়ে নিচ্ছে না এখন পর্যন্ত।

ফিরিয়ে নিতে হলে আন্তর্জাতিক চাপের কোন বিকল্প নেই। আমরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমরা আমাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সফল কূটনীতির কারণেই আন্তর্জাতিক অঙ্গন আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দেশ যেভাবে চাপ সৃষ্টি করেছে তাতে আমরা আশাবাদী যে মিয়ানমারের বোধদয় হবে।

মিয়ানমার সময়ক্ষেপনের জন্যই কি এখন বাংলাদেশের সাথে আলোচনায় অংশ নিচ্ছে?

তাদের (মিয়ানমার) দিক থেকে সময়ক্ষেপনের কৌশল হলেও দ্বিপাক্ষিক আলোচনা রুদ্ধ করার সুযোগ নেই।  একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক চাপ আরও বৃদ্ধি করার জন্য কাজ করতে হবে। সরকার এখন যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা কার্যকর উদ্যোগ। তা আমাদের বজায় রাখতে হবে।

এ ইস্যুতে চীন, রাশিয়া ও ভারত কি যথাপোযুক্ত ভূমিকা রাখছে?

এ দেশগুলো সমর্থন দিচ্ছে কি দিচ্ছে না, এটা সাদাকালোভাবে বলা সহজ। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ভূরাজনৈতিক বিষয়টি খুবই জটিল। রোহিঙ্গা ইস্যূতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান, সেটি আমাদের জন্য ভালো। কিন্তু তাদের এ অবস্থানের পিছনে হয়তো ভূরাজনৈতিক কারণ থাকতে পারে। কোন দেশই তা ভূরাজনৈতিক ও দেশের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে কোন কাজ করে না। সেক্ষেত্রে চীন, রাশিয়া ও ভারত তো তাদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ নিয়ে কথা বলবে।

চীনে আমাদের দলের যে প্রতিনিধি গিয়েছিলাম। তখন তারা আমাদের সরাসরি জানিয়ে দিয়েছেন এ ইস্যুতে তাঁরা আমাদের পাশে আছে। তাদের পক্ষে মিয়ানমারকে যেভাবে প্রভাবিত করার দরকার তা করবে। চীন ও রাশিয়া যদি বিরোধিতায় করতো তাহলে এখন জাতিসংঘে যে প্রক্রিয়ায় আলোচনা চলছে, তা চলত না। একই সঙ্গে তারা তাদের ভূরাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থও বিবেচনায় আনছে কিন্তু তারা আমাদের পাশে নেই এ কথাটি বলার কোন সুযোগ নেই।

সমস্যার সমাধান কখন হতে পারে?

এ ধরণের সমস্যার সমাধান রাতারাতি কোথাও হয়নি। আমাদের এখানেও হবে না।

বিপুল জনসংখ্যার চাপ কি কক্সবাজার নিতে পারবে?

তাই সামগ্রিক বিবেচনায় আমরা মনে করি যে রোহিঙ্গা আমাদের এখানে চলে এসেছে তাদের নিরাপত্তাসহ অন্যান্য বিষয়গুলো মাথায় রেখে ভাসানচরে তাদের স্থানান্তরের যে উদ্যোগ নিয়েছে তার সমর্থন করি।

এবার অন্য প্রসঙ্গে আসি। আপনি মন্ত্রী থাকাকালে সমুদ্র সীমা মামলায় রায় এসেছে। বাংলাদেশ। আপনাদের কাজের প্রক্রিয়া কি ছিল?

সমুদ্র আইনটি আমাদের মেরিটাইন জোন অ্যাক্ট-১৯৭৪ । এটি জাতির পিতা করে গিয়েছেন। তাঁর সময়েই ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা শুরু করা হয়। মিয়ানমারের সঙ্গে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ নিয়ে একটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্তেও পৌঁছেছিলাম। কিন্তু জাতির পিতাকে হত্যার পরে কোন সরকারই এ বিষয়ে আলোচনা করেনি। ১৯৯৬ সালে জাতির পিতার কন্যা ক্ষমতায় এসে উদ্যোগ নিলেন। জাতিসংঘের সমুদ্র আইন-১৯৮২ সালে অনুস্বাক্ষেরে শেখ হাসিনা সরকার সম্মত হয়। অনুস্বাক্ষরের পর ১০ বছরের মধ্যে মহীসোপানের দাবির কালক্ষেপনের গণনা শুরু হয়ে যায়। আমাদের ২০১১ সালের জুলাই মাসের মধ্যে উত্থপান করতেই হতো, না হলে চিরদিনের মতো মহীসোপানের দাবি আমাদের হাত থেকে চলে যেতো। আমরা ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পরে প্রতিবেশি দুই দেশের সাথে আলোচনা শুরু করি, কিন্তু যখন বুঝতে আলোচনার মাধ্যমে খুব তাড়াতাড়ি এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। সেই কারণেই আমরা আন্তর্জাতিক আদালতে যাই। সেখানে প্রথমে মিয়ানমারের সাথে মামলার নিষ্পত্তি হয়, পরে হয় ভারতের মামলার রায়। দুটো রায়ই আমাদের পক্ষে এসছে। আমাদের দাবি ন্যায্য ছিলো বলেই আমরা যা চেয়েছি তাই পেয়েছি।

এ সমস্যার কোন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়েছেন কি না?

ষোলআনা সমর্থন ও সাহস জুগিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। যখন যে কোন সময় তাঁর কাছে গিয়েছি তিনি এ সম্পর্কে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও খুব ভালো কাজ করেছে। আইনি লড়াইয়ের জন্য অনেকগুলো বৈঠক লন্ডনে হয়েছে। এ সভাগুলোতে যখন যেতাম তার অনেক সময়ই বলে যাওয়া সম্ভব হতো না। আবার অনেকক্ষেত্রে এসেও বলা সম্ভব হয় নাই। সেই জন্য অনেক সময় সমালোচনা শুনতে হয়েছে। সেসময় দেশের অনেক নামী পত্রিকা লিখিছিলো আমার ছেলে সেখানে আছে বলে আমি বারবার সেখানে যাই। অথচ আমার ছেলে সেখানে ছিলই না।

আপনি যখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন তখন বিশ্বব্যাংক পদ্মাসেতুতে অর্থায়ন বন্ধ করে দিয়েছিল...

দুর্নীতির অভিযোগ এর অর্থায়ন বন্ধ করা হয়েছিল, এ চ্যালেঞ্জ প্রধানমন্ত্রী সরাসরি গ্রহণ করেছিলেন। তাদের দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণের কথা বলেছেন কিন্তু বিশ্বব্যাংক ব্যর্থ হয়েছে। কারণ এ অভিযোগটি মিথ্যা ছিলো, প্রথমে তারা (বিশ্বব্যাংক) বলেছিল, দুর্নীতি হয়েছে। পরে বলেছে দুর্নীতির ষড়যন্ত্র হয়েছেঅ তবে সেটিও প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে তারা।  আমি তো বলব, বিষয়টি আমাদের জন্য শাপেবর হয়েছে। কারণ আমরা হয়তো জানতামই না পদ্মা সেতুর মতো বৃহৎ প্রকল্পে অর্থায়নের সাহস ও সক্ষমতা আমাদের রয়েছে। জাতিকে আমরা আরও বেশি মর্যাদার আসনে উন্নতি করেছি। আমাদের সরকার প্রধান বিশ্বে প্রশংসিত ও সন্মানিত হয়েছেন। আমরা আত্মবিশ্বাসী হয়েছি। 

আপনাকে ধন্যবাদ।

ঢাকাটাইমসকেও ধন্যবাদ।  

(ঢাকাটাইমস/২৪অক্টোবর/টিএ/ডব্লিউবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাক্ষাৎকার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত