পায়ে পায়ে রোহিঙ্গা-০২

উখিয়া হারিয়েছে পাহাড়ের ঐতিহ্য

অনলাইন ডেস্ক
| আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০১৭, ২১:২৫ | প্রকাশিত : ২৪ অক্টোবর ২০১৭, ১০:২৮

কক্সবাজারের উখিয়া, টেকনাফে ঠাঁই হয়েছে রোহিঙ্গাদের। পাহাড় কেটে ঘর তোলা হয়েছে। জ¦ালানির জন্য উজাড় হচ্ছে বন। ভারসাম্য হারাচ্ছে পরিবেশ। বাড়ছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে স্থানীয়রা। এ নিয়ে ঢাকাটাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকমের সরেজমিন, অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে নানা তথ্য।  

উখিয়া, টেকনাফ ও নাইক্ষ্যংছড়ি ঘুরে লিখেছেন হাবিবুল্লাহ ফাহাদ, সহযোগিতায় ছিলেন মোসলেহ উদ্দিন, সৈয়দ ঋয়াদ ও বলরাম দাশ অনুপম

উখিয়ার রাজাপালং ও পালংখালী ইউনিয়নে করা হয়েছে রোহিঙ্গা শিবির। রাজাপালংয়ের কুতুপালং শিবিরটি স্থায়ী। বহু আগে থেকে এখানে রোহিঙ্গাদের ঠাঁই দেয়া হয়েছে। হঠাৎ রোহিঙ্গা ঢল সামাল দিতে অস্থায়ী শিবির হয়েছে পালংখালী ইউনিয়নেই বেশি। বালুখালী, হাকিমপাড়া, জামতল, শফিউল্লার কাটা, গইয়ালমারা, বাঘঘোনা, ময়নাঘোনা, থ্যাংখালী, পালংখালী পান বাজারের আশপাশের এলাকা, তাজনিমারখোলা, মধুরছড়ায় এখন রোহিঙ্গা বসতি।  

পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলছিলেন, তার ইউনিয়নে লোকসংখ্যা ছিল ৫০ হাজারের কিছু বেশি। রোহিঙ্গাদের সিংহভাগ ঠাঁই পেয়েছে তার এলাকাতে। তিনি বলেন, ‘এরা আসার পর স্থানীয় লোকজনের কাজ কমে গেছে। তারা কাজ পাচ্ছে না।’
উখিয়ার বালুখালীতে গড়ে তোলা হয়েছে রোহিঙ্গাদের সবচেয়ে বড় অস্থায়ী আবাসস্থল। মূল পথ থেকে প্রায় দুই-আড়াই কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে রোহিঙ্গাদের ডেরা। কালো পলিথিন, বাঁশে তৈরি এসব ডেরা দেখতে সব একই রকম। বালুখালীতে পাহাড়ের সংখ্যা বেশি। তিন থেকে চারশ ফুট উঁচু পাহাড়ের দিকে তাকালেও চোখে পড়ে রোহিঙ্গা বসতি। পাহাড়ের গায়ে সিঁড়ির ধাপ কেটে কেটে রোহিঙ্গারা পৌঁছে গেছে চূড়াতে।

বালুখালী পাহাড়, সমতল সবই রোহিঙ্গাদের দখলে। এখানে বাড়ি কবিরের। বাজারে তার দোকান আছে। রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে নিজের উদ্বেগের কথা জানাতে গিয়ে বলেন, ‘আমাদের এলাকায় সব মিলে ২০-২৫ হাজার মানুষ ছিল। এখন চার লাখের মানুষ আছে বালুখালীতে। এদের নিয়ন্ত্রণের জন্য সব সময়ই সেনাবাহিনী রাখা দরকার।’

জানতে চাইলে রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবীর চৌধুরী এই সময়কে বলেন, ‘যে পরিমাণে পাহাড় ও বনভূমি রোহিঙ্গারা ধ্বংস করেছে তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। এখন বড় চিন্তা সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে। রোহিঙ্গারা এখন সংখ্যাগুরু। আর আমরা স্থানীয়রা সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছি। এটি আমাদের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি।’

বনে কমছে প্রাণী, হাতির হামলায় নিহত ৬

বালুখালী যাওয়ার পথটি দুটো জেলাকে আলাদা করেছে। হাতের বাঁ দিকে বান্দরবান জেলার ঘুমধুম। ডানে উখিয়ার কুতুপালং। দুই পথের বাঁকে সাদা বোর্ডে কালো হরফে লেখা-‘বন্যহাতি চলাচলের পথ।’ এই সাইনবোর্ড প্রমাণ দেয় আগে পথের দুপাশেই বন ছিল। এখন এসবের কিছুই নেই। বন্যপ্রাণীরা তাদের আবাস হারিয়েছে।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বালুখালীর পশ্চিমের দিকটায় ছিল বন্যহাতির ডেরা। এরা অবাধে এসব এলাকায় চরে বেড়াত। লোকালয় ছিল তাদের আবাস থেকে বেশ দূরে। যে কারণে এদের সচরাচর লোকালয়ে আসতে দেখা যেত না। তবে এখন মানুষই বন কেটে কেটে চলে গেছে হাতির ডেরায়। সেখান গিয়ে ঘর বেঁধেছে। এর জবাবও পেয়েছে। তাজনিমারখোলা পাহাড় থেকে পশ্চিমের দিকটায় বন্যহাতি হামলা করেছে রোহিঙ্গাদের ডেরায়। ত্রাণের চাল ছিল ঘরে। সেই চাল খাওয়ার পর সামনে পড়া দুজনকে শুঁড়ে তুলে আছড়ে মেরেছে আবাস হারানো প্রাণীগুলো। এ পর্যন্ত হাতির হামলায় ছয়জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।

থ্যাংখালী বাজার লাগোয়া কালভার্টের পাশ দিয়ে নেমে যাওয়া পথটি চলে গেছে তাজনিমারখোলা গ্রামে। এখানেও পাহাড়ি বনভূমির সিংহভাগ উজাড় হয়েছে রোহিঙ্গাদের ঘর করতে গিয়ে। এখানকার বাসিন্দা আবদুল্লাহ বলেন, ‘পাহাড়ি হাতি, বানর, ভাল্লুক, বন মোরগ, বিভিন্ন ধরনের সাপ, পাখি ছিল। মাঝেমধ্যে ছোট চিতা বাঘও লোকালয়ে চলে আসতো। এখন এসবের কিছুই নেই। সব নাফ খাল পার হয়ে আরও ভেতরে চলে গেছে।’

শেখ আলম নাফ নদী থেকে বালি তুলে বিক্রি করেন। তাজনিমারখোলায় দেখা গেল তার বিশাল বালির ঢিপি। এই ঢিপি থেকে তিনি তড়িঘড়ি করে বালি সরাচ্ছেন। কারণ জানতে চাইলে বলেন, এখানে রোহিঙ্গাদের জন্য বিদেশি হাসপাতাল হবে।’

তাজনিমারখোলা পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে খুব বেশ বেগ পেতে হলো। প্রচ- দুর্গন্ধ। চারপাশে নালা-নর্দমা হয়েছে পয়োবর্জ্য।ে এই পাহাড়ের চূড়াতেও শত শত নতুন ঘর। এই পাহাড়টি উখিয়ার অন্যান্য পাহাড়ের চেয়ে বেশ উঁচু। এখানে দাঁড়ালে পুবে বালুখালী, উত্তরে থ্যাংখালী, দখিনে কুতুপালংসহ সব শিবির দেখা যায়। একসময়ের ঘন অরণ্যে ঘেরা পাহাড়ে সবুজের নামগন্ধ নেই। নীল, কালো, হলুদ, লাল, সাদা ত্রিপলের ছাউনিতে গড়া ছোট ছোট ডেরা। পাহাড় ঢাকা পড়েছে এসব ডেরায় আড়ালে।

(ঢাকাটাইমস/ ২৪ অক্টোবর/ এইচএফ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত