পুলিশ যখন সত্যিই জনতার বন্ধু!

কাওসার শাকিল
 | প্রকাশিত : ১১ নভেম্বর ২০১৭, ০৯:০২

ঘটনাটা গত বৃহস্পতিবারের। তখন সকাল সাড়ে নয়টা। ব্যস্ত ঢাকা শহর কর্মব্যস্ত লোকজনের কোলাহলে মুখরিত। গাড়ির হর্ণ, লেগুনার ধোঁয়া, রিকশার টুংটাং, পায়ে হাঁটা মানুষের ঘামে ভেজা শরীরজুড়ে গন্তব্যে পৌঁছার ব্যস্ততার ছাপ। কারো দিকে কারো তাকানোরও সুযোগ নেই।

শ্যামলী ওভার ব্রীজের পিলার ঘেঁষে দাড়িয়ে কাঁদছিল একটি শিশু। বাচ্চাটিকে এভাবে একা কাঁদতে দেখে মোহাম্মদপুর থানার ‘বাইক পেট্রোল’ এর দায়িত্বে থাকা এসআই প্লাবন আহমেদ রাজিব মোটরসাইকেল থামিয়ে বাচ্চাটির পাশে দাঁড়ায়। রাজিব না দাঁড়ালেও পারতেন। কিন্তু পুলিশকে নিয়ে যারা গতবাধা ধারনায় অভ্যস্ত তারা হয়তো রাজিবকে চেনেন না। সে অন্য ধাতুতে গড়া মানুষ।

‘বাবু, কাঁদছো কেন? নাম কি তোমার?’-জিজ্ঞেস করতেই বাচ্চাটি নিজের নাম ‘সজীব’ জানিয়ে আরো জোরে কাঁদতে কাঁদতে বলে-‘আমি বাড়ি যাবো। আব্বু-আম্মুর কাছে যাবো।’

‘তোমার বাড়ি কোথায়? নাম কি তোমার আব্বু-আম্মুর?’-জিজ্ঞেস করতেই বাচ্চাটি ভাঙা ভাঙা উচ্চারণে জানায় ‘তার আব্বুর নাম ‘মজনু’ আর  বাড়ি ‘দুববা’।

-তোমার আব্বু-আম্মু কোথায় থাকে?

-দুববা।

-দুববা কোথায়?

- জানি না।

-তুমি ঢাকায় কিভাবে এলে?

-আব্বুর সাথে।

-তোমার আব্বু এখন কোথায়?

-জানি না।

বলেই সজীব আরো জোরে কাঁদতে লাগলো। বাচ্চাটিকে আনুমানিক বয়স ৭/৮ হবে। কিন্তু বয়সের তুলনায় তার মানসিক বিকাশ হয়তো স্বাভাবিকভাবে হয়নি। কেননা ৭/৮ বছরের একটা ছেলে অতোটা অস্পষ্ট করে কথা বলে না। রাজিব তাৎক্ষণিকভাবে বুঝে নিলো বাচ্চা ছেলেটা খুব সম্ভবত বুদ্ধি প্রতিবন্ধী এবং যে কোনোভাবেই হোক সে হারিয়ে গেছে।

মানুষ সাধারণত যা করে, ঝামেলা দেখলে এড়িয়ে যায়। কিন্তু এ গল্পের নায়ক এসআই রাজিব মোটেই সেরকম না। পুলিশের দায়িত্ব কি সেটা শুধু কাগজে কলমে আটকে রাখেনি সে। তাই সেই প্রচণ্ড দায়িত্ববোধ থেকেই এসআই রাজিব তাৎক্ষণিকভাবে বাচ্চাটির কথা জানিয়ে দিল পুলিশ কন্ট্রোল রুমে। যাতে সজীব নামের বাচ্চাটির হারানো সংবাদ তার পরিচিত লোকজন জানতে পারে। রাস্তার পাশের একটা হোটেলে বাচ্চাটিকে নাস্তা করিয়ে মোটরসাইকেলের পেছনে বসিয়ে রাজিব বের হয়ে পড়লো। যদি ওর পরিচিত লোকজনের দেখা পাওয়া যায়।

শ্যামলী, রিং রোড, আসাদ গেট, তাজমহল রোড, টাউন হল, নূরজাহান রোড, কল্যাণপুর, গাবতলী, মিরপুর, আগারগাঁও, মানিক মিয়া এভিনিউ, ফার্মগেট এলাকা খোঁজা হলো তন্ন-তন্ন করে। কিন্তু খুঁজে পাওয়া গেল না তার পরিচিত কাউকে।

এবার ওর কাছে জানতে চাওয়া হলো চাচা, মামা, দাদা-দাদী, নানা-নানী, ভাই-বোনের নাম। কিন্তু কারো নামই বলতে পারলো না সে। বাড়ির কথা বারবার জিজ্ঞেস করাতে সে শুধু ভাঙা ভাঙা উচ্চারণে বলতে পারলো, ‘ইককুল’ ও ‘আদদান’ এই দুটো শব্দ। বারবার আব্বু-আম্মু ও বাড়ির কথা জিজ্ঞেস করার এক পর্যায়ে সে বলতে থাকলো, ‘আব্বু মমনচিং, মমনচিং।’

ওর কথাবার্তা খুব একটা স্পষ্ট না। ধারণা করা হলো, বাচ্চাটির বাড়ি ময়মনসিংহ হলেও হতে পারে। ময়মনসিংহের সব থানায় ফোন করা হলো। জানতে চাওয়া হলো ‘সজীব, বয়স: ৭-৮ বছর, পিতা: মজনু’ এই ব্যাপারে কোন নিখোঁজ জিডি বা অভিযোগ আছে কি না।

ময়মনসিংহের সব থানা থেকে ‘না-সূচক’ উত্তর পেয়ে এসআই রাজিব ময়মনসিংহের সব থানায় মোবাইল ফোনে জানতে চায় ওই থানায় ‘দুববা’ নামে কোন গ্রাম আছে কিনা। ওখানকার থানা পুলিশ এলাকার চেয়ারম্যান, মেম্বার, কমিউনিটি পুলিশ ও লোকজনের সাথে কথা বলে তাকে জানালো এরকম কোনো গ্রামের নাম তারা কেউই শোনেনি। দুই ঘণ্টার মধ্যে ময়মনসিংহের সব থানা থেকে না-সূচক উত্তর পেয়ে এসআই রাজিব দমলো না।

এরপর শেরপুর জেলা পুলিশের সাথে কথা বলে। সেখান থেকেও আসলো না কোনো খোঁজ।

সন্ধ্যা ছয়টার দিকে নেত্রকোনা জেলা পুলিশের সাথে কথা বললো এসআই রাজিব। কিন্তু নেত্রকোনার সব থানা থেকেও সেই না-সূচক উত্তরই এলো। মানে কোথাও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। এবার একটু দমে যান রাজিব। সামান্য হতাশাও এসে ভর করে। আর কোনো পথ পাচ্ছেন না যখন ঠিক তখনই একটা ফোন এলো নেত্রকোনার কলমাকান্দা থেকে। কলমাকান্দা থানার ডিউটি অফিসার জানালেন ‘দুববা’ নয়, তবে ‘দুর্গা’ নামে একটি গ্রাম আছে তার এলাকায়।

এসআই রাজিব তাকে অনুরোধ করে দুর্গা গ্রামের কারো ফোন নম্বার দেয়ার জন্য। বেশিক্ষণ লাগলো না, ১০ মিনিটের মাথায়ই দুর্গা গ্রামের সেলিম মিয়া এসআই রাজিবকে ফোন করলো। এসআই রাজিব তার কাছে জানতে চাইলেন দুর্গা গ্রামে মজনু মিয়া নামের কেউ আছে কি না।

-হ্যাঁ আছে। সোলেমানের পোলা মজনু। ইস্কুলের উত্তর দিকের দোচালা ঘরটা তার।

-কি করে মজনু?

-আগে এলাকায় দোকানদারি করতো। এখন ময়মনসিংহে কাঁচামালের ব্যবসা করে সে।

মুহুর্তের মধ্যে এসআই রাজিবের মাথায় খেলে যায় সজীবের মুখে বার বার উচ্চারিত হতে থাকা ‘ইককুল’ ‘মমনচিং’ শব্দ দুটো। এতক্ষণে শব্দগুলোর অর্থ স্পষ্ট হয় তার কাছে। রাজিব সেলিম মিয়াকে দুর্গা গ্রামের মজনুর সজীব নামে কোন ছেলে আছে কিনা জানতে চান। সেলিম তাকে জানায় যে, মজনুর ছেলের নাম সে জানে না । তবে মজনুর বড় ভাই সুজনের ছেলের নাম আদনান।

সজীবের মুখে উচ্চারিত আরকেটি শব্দ ‘আদদান’, এবার সেটা স্পষ্ট হয় এসআই রাজিবের কাছে। সেলিমের মাধ্যমে মজনুর মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে এসআই রাজিব তার কাছে জানতে চায় মজনুর সজীব নামে কোন ছেলে আছে কিনা।

মজনু জানায় তার বড় ছেলের নাম সজীব। বয়স সাত বছর। বয়সের তুলনায় তার বুদ্ধি কম। উচ্চারণে সমস্যা থাকায় তাকে ঢাকার মিরপুরে একটি আবাসিক মাদ্রাসায় দেওয়া হয়েছিল পড়ানোর জন্য।

এসআই রাজিব টেলিফোনে সজীবের সাথে তার আব্বু মজনু মিয়ার কথা বলিয়ে দেয়। পিতা-পুত্র পরষ্পরকে চিনতে পারে। মজনু চিৎকার করে কাঁদতে থাকলে সজীব বলতে থাকে, ‘আব্বু, কাইনডোনা। পুলিশ আংকেলের কাছে আছি আমি।’

অবশেষে মোহাম্মদপুর থানায় এসে হারানো মানিক সজীবকে নিয়ে যায় তার বাবা মা। জানা যায় মিরপুরের সেই মাদ্রাসা থেকে পথ ভুলে শ্যামলীতে চলে এসেছিল সজীব। রাজিবের মতন একজন মানবিক পুলিশ কর্মকর্তা যদি এগিয়ে না আসতেন হয়তো বাচ্চাটার সাথে ঘটে যেতো ভয়ংকর কিছু। কিন্তু এসআই রাজিব সেটা ঘটতে দেননি। তাকে ধন্যবাদ, কেননা পুলিশের যে প্রকৃত দায়িত্ব সেটাই তিনি করে দেখিয়েছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন পুলিশ জনতার বন্ধু। এটাই হওয়া উচিৎ আমাদের পুলিশের সত্যিকারের পরিচয়।

(ঢাকাটাইমস/১১ নভেম্বর/কেএস)

সংবাদটি শেয়ার করুন

প্রশাসন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত