লক্ষ্মীপুর-২: বিএনপিতে খায়ের-সাবু, আ.লীগে চার শক্তিশালী

আব্বাছ হোসেন, লক্ষ্মীপুর
 | প্রকাশিত : ১৭ নভেম্বর ২০১৭, ০৮:৩৬

বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এখান থেকে একবার নির্বাচন করেছিলেন বলে লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর) মর্যাদা পায় ভিআইপি আসন হিসেবে। ফলে এ আসন থেকে নির্বাচন করতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে একাধিক শক্তিশালী প্রার্থী প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে বিএনপিতে প্রার্থিতার বিষয়টি অনেকটা অনুমেয়। কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে একাধিক শক্তিশালী মনোনয়ন-প্রত্যাশী থাকায় দলটি ঘিরে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। দলের নেতাকর্মীরা ক্রমান্বয়ে দ্বিধা-বিভক্ত হচ্ছেন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে এখানকার রাজনীতির মাঠে দিন দিন নতুন মাত্রা যোগ হচ্ছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সংগঠিত করার চেষ্টার পাশাপাশি তাদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা।

রায়পুর আসনে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। পরে তিনি আসনটি ছেড়ে দিলে উপনির্বাচনে দলের প্রার্থী স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদকে হারিয়ে জয়ী হন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির যুব ও ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক হারুন অর রশিদ। এরপর এ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে একাধিকবার বিপুল ভোটের ব্যবধানে এমপি নির্বাচিত হন আবুল খায়ের ভূইয়া।

রায়পুর ও সদর উপজেলার (আংশিক) ১০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর) আসনের বর্তমান এমপি জাতীয় পার্টির জেলা সভাপতি মোহাম্মদ নোমান। তিনি ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টি (এরশাদ) থেকে। জাপার আর কোনো মনোনয়ন-প্রত্যাশী না থাকায় এবং জোটগত নির্বাচন হলেও এবারও হয়তো তিনি মনোনয়ন পাবেন।

আসছে নির্বাচনে বেশ কয়েকজন শক্তিশালীর প্রার্থী আওয়ামী লীগের মনোনয়ন-প্রত্যাশী। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক, সাবেক এমপি ও ক্রীড়াব্যক্তিত্ব হারুন অর রশিদ, লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুরউদ্দিন চৌধুরী নয়ন, বাংলাদেশ-কমিউনিটি কুয়েতের সভাপতি ও কুয়েতের বঙ্গবন্ধু স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শিল্পপতি কাজী শহীদ ইসলাম পাপুল, স্বাচিপ নেতা এহসানুল কবীর জগলুল মনোনয়ন পেতে সব ধরনের চেষ্টা-তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন। দলে চারজনেরই রয়েছে নিজ নিজ অনুসারী ও জনপ্রিয়তা।

তবে সাবেক এমপি হারুন অর রশিদের ব্যক্তি ইমেজ নৌকা প্রতীকের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন নেতাকর্মীরা। শিল্পপতি কাজী শহীদ ইসলাম পাপুলের সাধারণ মানুষসহ দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা। আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য নিজ খরচে প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে দলীয় কার্যালয় করে দেন তিনি। এ ছাড়া স্কুল-মাদ্রাসা, মসজিদসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে দিয়ে যাচ্ছেন বিভিন্ন দান-অনুদান। তাদের দাবি.  ধনাঢ্য ও তরুণ এ নেতা ইতিমধ্যে রাজনীতির মাঠে বেশ আলোচিত হয়ে উঠেছেন।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নুরউদ্দিন চৌধুরী নয়নেরও রয়েছে ব্যাপক পরিচিতি। দলের জন্য সার্বক্ষণিক কাজ করেন তিনি। তৃণমূলের কর্মীদের সময় দেন, খোঁজ-খবর নেন। জেলায় দলীয় কার্যালয় না থাকায় তার নিজের বাসভবনেই দলের সব কর্মকা- পরিচালিত হয়। স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) নেতা এহসানুল কবীর জগলুল একজন স্বজ্জন ব্যক্তি হিসেবেই এলাকায় পরিচিত। তিনিও দলীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে ইতোমধ্যে নেতাকর্মীদের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছেন।

এ আসনে ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে বিএনপির। কিন্তু সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে আসনটি নিজেদের হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করেছেন তৃণমূলের কর্মীরা। সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারলে আসনটি পুনরুদ্ধারের আশা করছেন তারা।

হামলা-মামলায় সংকটগ্রস্ত বিএনপি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও জেলা বিএনপিার সভাপতি এবং বিএনপি থেকে একাধিকবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভূইয়া। এ ছাড়া জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাহাবুদ্দিন সাবুর নাম উচ্চরিত হচ্ছে। সাহাবুদ্দিন সাবু বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে নির্যাতিত নেতা হিসেবে মাঠপর্যায়ে বেশ সুনাম রয়েছে। বিএনপির আরেক প্রার্থী খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা কর্নেল (অব.) আবদুল মজিদের নামও শোনা যাচ্ছে। পদবঞ্চিত ও দলের বাইরে থাকা কিছু নেতাকর্মী কর্নেল মজিদের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তবে এ আসনে আবুল খায়ের ভূঁঁইয়ার মনোনয়ন অনেকটাই নিশ্চিত বলে মনে করছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা।

জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক কর্মকা- তেমন না থাকলেও দশম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ভোট বর্জন করায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মোহাম্মদ নোমান। এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর নির্বাচনী এলাকায় যাতায়াত করেন তিনি। সভা-সেমিনারেও অংশ নেন এ নেতা। আগের চেয়ে বর্তমানে জাতীয় পার্টির জনসমর্থন বেড়েছে বলে মনে করেন তারা। তাই আগামী নির্বাচন জোটগতভাবে হলে মোহাম্মদ নোমান আবার জাতীয় পার্টি থেকে নমিনেশন পাওয়ার প্রত্যাশা করছেন।

এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর নিজস্ব একটি ভোট ব্যাংক রয়েছে। বিএনপির সঙ্গে জোটগতভাবে নির্বাচনে না গেলে তাদের প্রার্থী হিসেবে দলের জেলা আমির মাওলানা রুহুল আমিনের নাম আলোচিত হচ্ছে বেশি। এ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোট করার কথাও রয়েছে জামায়াত ইসলামীর এ নেতার।

বঙ্গবন্ধু স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শিল্পপতি কাজী শহীদ ইসলাম পাপুল বলেন, কুয়েতে এবং দেশে দলের জন্য অনেক কাজ করেছেন তিনি। ব্যক্তিগত জীবনে সফল এই ব্যবসায়ী আরো বলেন, ‘নিতে নয়, রাজনীতি করতে এসেছি দিতে। মনোনয়ন চাইব। মনোনয়ন দিলে এমপি হয়ে এলাকার উন্নয়ন কাজ করব।’

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুরউদ্দিন চৌধুরী নয়ন সাংবাদিকদের জানান, তিনি বিগত জেলা সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর  দলকে সুসংগঠিত করতে দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। বিগত ইউপি, পৌর ও সর্বশেষ জেলা পরিষদের নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের বিজয়ী করতে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। তাই আগামী সংসদ নির্বাচনে নেত্রী তাকে মনোনয়ন দেবেন বলে প্রত্যাশা তার।

১৯৯৬ সালে এ আসন থেকে নিজের বিজয়ী হওয়ার কথা উল্লেখ করে আরেক মনোনয়ন-প্রত্যাশী হারুন অর রশিদ বলেন, ‘সব সময় দল ও তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সুখে-দুঃখে পাশে ছিলাম। ভবিষ্যতে থাকব। আমি এলাকার সার্বিক উন্নয়নে কাজ করেছি।’ সবকিছু মূল্যায়ন করে দল আমাকে মনোনয়ন দেবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বিগত দিনে তণমূল নেতাকর্মীদের নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে অনেক মামলা-হামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাহাবুদ্দি সাবু। তিনি বলেন, ‘গুলি খেয়েছি। কারাবরণ করছি। তারপরও মাঠ থেকে কোথাও যাইনি। এখনো আছি। তাই লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) ও রায়পুর-২ আসন থেকে মনোনয়ন চাইব।’ বিগত দিনের আন্দোলন-সংগ্রামকে মূল্যায়ন করে দুটি আসনের একটি থেকে মনোনয়ন পাবেন বলে আশা করেন তিনি।

আন্দোলন-সংগ্রাম ও নেতাকর্মীদের সুখে-দুঃখে পাশে থাকার দাবি সাবেক এমপি আবুল খায়ের ভূঁইয়ারও।  তিনি বলেন, ‘এলাকার মাটি ও মানুষের সঙ্গে আমার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। এলাকার মানুষ তথা বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে রয়েছে যোগাযোগ। বর্তমানে এখানে নেতাকর্মীদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। এ আসন থেকে মনোনয়ন চাইব।’ মনোনয়ন পেলে আগের মতো বিপুল ভোটে নির্বাচিত হবেন বলে জানান তিনি।

সব মিলিয়ে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর) আসনে প্রার্থী মনোনয়নে বিএনপি ও আওয়ামী লী কে বেগ পেতে হবে বলে মনে করছেন নেতাকর্মীসহ এখানকার বাসিন্দরা।

(ঢাকাটাইমস/১৭নভেম্বর/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত