ত্রিশালে ‘ব্রিগেড’ থামিয়ে দিচ্ছে বাল্যবিয়ে

মনোনেশ দাস, ময়মনসিংহ
| আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০১৭, ১৯:০৯ | প্রকাশিত : ১৮ নভেম্বর ২০১৭, ১৯:০৭

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিজড়িত ত্রিশাল উপজেলা। শিক্ষানগরী ময়মনসিংহ জেলার এই ত্রিশাল উপজেলায় এক অনুকরণীয় অনুসরণীয় হিসেবে যৌন হয়রানি ও বাল্যবিয়ে বন্ধে কাজ করে যাচ্ছেন একদল ছাত্রী। ত্রিশালের ইউএনও আবু জাফর রিপনের উদ্ভাবন।

১২ জনের সমন্বয়ে গঠিত ‘বাল্য বিবাহ ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ব্রিগেড (বাযৌপ্রবি) ব্রিগেড’ নামে  এই বাহিনীর দলনেতা ‘তৃপ্তি’ নামে দশম শ্রেণিতে পড়ুয়া একজন ছাত্রী। বিগ্রেডের ১২ জনই স্কুলের দশম থেকে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী বেশি দিন হয়নি বিগ্রেডটির যাত্রা। মাত্র দুই সপ্তাহ আগের কথা। এই দুই সপ্তাহে পাচটি বাল্যবিয়ে বন্ধ করে দিয়েছেন, ‘যৌন হয়রানি ও বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ ব্রিগেড’টি।

মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ত্রিশাল উপজেলার সর্বত্র এখন সকাল হলে দেখা যায় পরিপাটি হয়ে একই ধরনের পোশাকে দল বেঁধে মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছেন। বিকাল হলে তারা আবার দল বেঁধেই বাড়ি ফিরছেন। কিছুদিন আগেও এই দৃশ্য তেমন চোখে পড়ত না। আর এটা হয়েছে শুধু এই উপজেলায় ব্রিগেডের নেতৃত্বে ‘যৌন হয়রানি ও বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ ‘ব্রিগেড’ বাল্যবিয়ে বন্ধ হচ্ছে বলেই।

বাল্যবিয়ে যে সমস্যা এখনো বাংলাদেশে অন্যতম বড় সমস্যা। এই সমস্যাকে অনেকটা ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দিচ্ছে ত্রিশাল উপজেলা। এই অসম্ভবকে সম্ভব করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন- ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. খলিলুর রহমানের অদম্য চেষ্টা। ডিসির নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টা আর ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবু জাফর রিপনের প্রশাসনিক কঠোরতা এবং ‘যৌন হয়রানি ও বাল্য বিয়ে প্রতিরোধ ব্রিগেড’ উদ্ভাবনী বাল্যবিয়ে মুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে এই উপজেলায়।

ঘটনার শুরু মাত্র দুই সপ্তাহ আগে। জেলার সর্বত্র বাল্যবিয়ে ঠেকাতে এগিয়ে যান ডিসি খলিলুর রহমান। ডিসির নির্দেশনায় ইউএনওরা বিয়ে বন্ধ করতে গিয়ে ইতোপূর্বে বর ও কনে দুই পক্ষেও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার শিকারও হয়েছেন। বিয়ে উপলক্ষে খরচও হয়ে গেছে। বিয়ে বন্ধ করলেও ওই বিয়ের আয়োজন খরচ বিষয়টি ভাবিয়েছে।

এসব ভাবনা থেকেই জেলা প্রশাসক মো. খলিলুর রহমান দুই সপ্তাহ আগে ত্রিশালের ইউএনও আবু জাফর রিপনের মাধ্যমে ‘যৌন হয়রানি ও বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ ব্রিগেডকে’ তৈরি করেন। ব্রিগেডের ১২ জন মেয়ের হাতে তুলে দেন ১২টি সাইকেল। এই সাইকেল নিয়ে ‘যৌন হয়রানি ও বাল্য বিয়ে প্রতিরোধ ব্রিগেড’ ছুঁটে চলেছেন উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল থেকে সর্বত্র। কৌশলে বাল্যবিয়ের খবর পেলেই বিষয়টি ইউএনও অর্থাৎ প্রশাসনকে অবগত করেন। এতে, বাল্যবিয়ের আয়োজনের আগেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বাল্যবিয়ে। বিয়ের আয়োজকরা বিয়ে বাবদ আর খরচও করতে পারছেন না। এর আগেই বাল্যবিয়ে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ‘যৌন হয়রানি ও বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ ব্রিগেডের সফলতা মাত্র দুই সপ্তাহেই ত্রিশালে সর্বত্র।

জেলা প্রশাসক মো. খলিুলুর রহমান বলেন, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করে জানতে পারেন, ত্রিশাল উপজেলার অন্যতম একটি সমস্যা বাল্যবিয়ে। কিন্তু বাল্যবিয়ে যে একটি অপরাধ তা অনেক মানুষেই জানেন না। এ জন্য ইউএনও আবু জাফর রিপনের মাধ্যমে বাল্যবিয়ে-মুক্ত উপজেলা গঠনের লক্ষ্যে উপজেলার ইউনিয়নের নিকাহ নিবন্ধক, মসজিদের ইমাম এবং তাদের নাম-ঠিকানা ও মোবাইল ফোন নম্বরসহ একটি ডাটাবেজ তৈরি করেন। এরপর প্রত্যেকের নামে বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন, বাল্যবিয়ের কুফল এবং বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে তাদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। উপজেলার প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানদের সঙ্গে পৃথকভাবে মতবিনিময় সভা করে বাল্যবিয়ে-মুক্ত ত্রিশাল উপজেলা গঠনে যার যার অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখার জন্য অনুরোধ করেন।

অপরদিকে ডায়নামিক পরিকল্পনা করে গঠন করেন ‘যৌন হয়রানি ও বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ ব্রিগেড’। তাদের কাজকে গতিশীল করতে বিগ্রেডের প্রত্যেককে সরবরাহ করেন সাইকেল। ‘ব্রিগেড’ অক্লান্ত পরিশ্রমে সফলতা আসছে। বাল্যবিয়ের হার এখন ত্রিশাল উপজেলায় দিন দিন কমছে। এছাড়াও যৌন হয়রানি বন্ধে সাইকেল নিয়ে এই মেয়েরা সচেতনতা বাড়াতেও ভূমিকা রাখছেন।

ডিসি খলিলুর রহমান জানান, বাল্যবিয়ে ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ব্রিগেড (বাযৌপ্রব্রি), ত্রিশাল : প্রিভেনশন ইচ বেটার দেন কিওর। বিবাহের অনুষ্ঠানে ফোর্সসহ হাজির হয়ে বিয়ে বন্ধ করা, বর বা কনের গার্ডিয়ানকে দণ্ড প্রদান করে অনুষ্ঠানের মাঝ থেকে তুলে আনার চিত্র প্রায়শই পত্রিকায় বা টিভিতে দেখা যায়। এতে হয়তো বিয়েটা বন্ধ হয়, কিন্তু ওই পরিবারটা সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হয়। আবার এও শোনা যায়, পরবর্তীতে অন্যত্র গিয়ে বাল্যবিয়েটা সম্পন্ন করে নেয়। ফলে এতো কিছুর পরও বাল্যবিয়ের হার কিন্তু খুব তাৎপর্যপূর্ণভাবে কমছে না। আবার যৌন হয়রানির শিকার হওয়ায় এবং অনেক সময় বিষয়টি বাবা-মার সাথে শেয়ার করতে না পারায় অনেক মেয়ে বাল্যবিয়ের পথ বেছে নেয়। বিষয়টাকে গুরুত্ব দিয়ে এ উপজেলায় যাত্রা শুরু করল ইউনিয়ন ওয়ারী বাল্যবিয়ে ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ব্রিগেড। এ ব্রিগেডসমূহের এর আওতায় প্রাথমিকভাবে ত্রিশালের প্রত্যেকটি (মোট ১২টি) ইউনিয়নের ২টি করে স্কুলে ১২ জন করে মোট ২৮৮ জন মেয়েকে একই রকমের সাইকেল ও বাযৌপ্রব্রি লোগো খচিত ড্রেস দেয়া হবে।

ব্রিগেড এর কাজ: ১- এই ব্রিগেড তার ইউনিয়নে কোন মেয়ের বিয়ে হতে পারে, এ সংবাদ পাওয়ামাত্রই সেখানে মুভ করবে।

২- তাদের একত্রে কোথাও মুভ করানোর মাধ্যমেও জনসচেতনতা বাড়বে ও বাল্যবিয়ে ও যৌন হয়রানি কমবে।

৩- তাদের বাল্যবিবাহ আইন সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।

৪- উপজেলা প্রশাসন থেকে দেয়া একটি হটলাইন নম্বর তাদের কাছে সংরক্ষিত থাকবে, যা ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকবে। নাম্বারটি উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা মেইনটেইন করবেন।

৫- তাদের কাছে জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম্বার ও দেয়া থাকবে।

৬- তাদের নিরাপত্তা ও সার্বক্ষণিক খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য একজন শিক্ষককে দায়িত্ব দেয়া হবে।

৭- যৌন হয়রানির ঘটনা ভয়ংকর পরিণতি নেয়ার পূর্বেই নিজেদের মধ্যে তারা শেয়ার করতে পারবে ও যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে পারবে।

৮- সর্বোপরি সবগুলো মেয়ে প্রতি দুই মাসে একবার উপজেলায় বড় কোন মাঠে একত্রিত হবে, যা সমগ্র উপজেলাবাসীকে বাল্যবিয়ে ও যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে শক্ত মেসেজ দিতে পারবে।

ব্রিগেড দলনেতা তৃপ্তি জানান, আমিসহ আমার টিমের ১২ জন সামাজিক এই কাজ করে আনন্দ পাচ্ছি। মাত্র দুই সপ্তাহে পাঁচটি বাল্যবিয়ে বন্ধের বিষয়ে বলেন, ওই সব মেয়ের পরিবারের সদস্যরা তাদের বিয়ের আয়োজন করেন। ওই মেয়েরা প্রথমে রাজি না থাকলেও পরে পারিবারিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করেন। তবে তাদের স্বজনদের মাধ্যমে খবর পেয়ে যাই আমরা। বিষয়টি ইউএনও আবু জাফর রিপন স্যারকে জানাই। স্যার বাল্যবিয়ের নানা নেতিবাচক দিক সম্পর্কে তাদের বুঝিয়ে ওই সব বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে সক্ষম হন।

ইউএনও আবু জাফর রিপন বলেন, কন্যাশিশুর বিয়ে এ উপজেলায় একটি ব্যধিতে পরিণত হয়েছিল। বাল্যবিয়ের কারণে এক সময় অনেক প্রতিভাবান ছাত্রী অসময়ে ঝরে পড়েছে। আমরা এবং সমাজের অনেক সচেতন মানুষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এবং এই ব্রিগেডের নিষ্ঠা একাগ্রতায় সেই সমস্যা দূর করা সম্ভব হচ্ছে। ব্যধি সারাতে জেলা প্রশাসক দিকনির্দেশনা দিয়েছেন পরিশ্রম করেছেন এবং ব্রিগেড তৈরির ফলস্বরূপ আজ বাল্যবিয়ে-মুক্ত হচ্ছে এই উপজেলা।

(ঢাকাটাইমস/১৮নভেম্বর/ব্যুরো প্রধান/এলএ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত