লালমনিরহাট-১: ভোট চাইছে আ.লীগ, কৌশলী বিএনপি

রাহেবুল ইসলাম টিটুল, লালমনিরহাট, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ২৩ নভেম্বর ২০১৭, ০৮:৩৮

আগামী নির্বাচন সামনে রেখে লালমনিরহাট-১ আসনে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ইতিমধ্যে ভোট চাওয়া শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। ক্ষমতাসীনদের চাপে এ ক্ষেত্রে অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে বিএনপি। তবে তাতে থেমে নেই তাদের ‘কৌশলী’ ভোট আহ্বানের জনসংযোগ।

পাটগ্রাম ও হাতিবান্ধা (চার ইউনিয়ন বাদে) উপজেলা নিয়ে গঠিত লালমনিরহাট-১ আসনে ভোটের রাজনীতির হিসাবে বরাবর এগিয়ে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাদে গত পাঁচটি সংসদ নির্বাচনে এখান থেকে তিনবার আওয়ামী লীগ ও দুবার জাতীয় পাটির প্রার্থী বিজয়ী হন।

কিন্তু আগামী নির্বাচন ঘিরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে নানা ধরনের জনসংযোগে দেখা গেলেও খুব একটা চোখে পড়ছে না জাতীয় পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থীদের। বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে দু-একজনের ‘দোয়া প্রার্থনার’ ফেস্টুন দেখা যায় মাত্র।

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন-প্রত্যাশী: এই আসনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন মূলত দুজন। হাতীবান্ধা উপজেলার বাসিন্দা বর্তমান সংসদ সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী মোতাহার হোসেন, এবং পাটগ্রাম উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রুহুল আমিন বাবুল। এর বাইরে মকবুল হোসেন নামের একজন প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতার নাম শোনা যাচ্ছে মাঝেমধ্যে।

মোতাহার-বাবুল দুজনই নিজ নিজ উপজেলার দলীয় নেতাকর্মীদের নিজের দিকে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি অন্য উপজেলার ‘ক্ষুব্ধ’ নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখছেন বলে দলীয় সূত্র জানায়।

লালমনিরহাট-১ আসন থেকে পর পর তিনবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য মোতাহার হোসেন একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মোতাহার গত সরকারের আমলে একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। জেলা আওয়ামী লীগের এই সভাপতি এর আগে সংসদে বিরোধীদলীয় হুইপও ছিলেন।

দলীয় নেতাকর্মীরা জানান, আগামী সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নিজের উপজেলা হাতীবান্ধা সামলে পাটগ্রামেও বিভিন্নভাবে তার উপস্থিতি বজায় রাখছেন টান তিনবারের (২০০১, ২০০৮ ও ২০১৪) সংসদ সদস্য মোতাহার হোসেন।  এর আগে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে তিনি জাতীয় পাটির প্রার্থীর কাছে হেরেছিলেন।

আগামী নির্বাচনে নিজের মনোনয়ন নিয়ে জানতে চাইলে সংসদ সদস্য মোতাহার হোসেন ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আমি তাজউদ্দীন-বঙ্গবন্ধুর আমল থেকে রাজনীতি করছি। তাই আমার জনপ্রিয়তা বা মনোনয়ন নিয়ে নিজ থেকে বলার কিছুই নেই।’

মোতাহার হোসেনের চেয়ে অপেক্ষাকৃত তরুণ রুহুল আমিন বাবুল স্থানীয়ভাবে ‘কৌশলী’ নেতা হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে টানা দ্বিতীয়বারের মতো পাটগ্রাম উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান তিনি। ২০১৫ সালে তিনি রংপুর বিভাগের শ্রেষ্ঠ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পাটগ্রাম উপজেলা ছাত্রলীগের এই সাবেক সভাপতি পরে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হন এবং বর্তমানে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

পাটগ্রামের দলীয় তরুণ নেতাদের অনেকে বাবুলের সঙ্গে আছেন বলে জানায় দলীয় সূত্র। পাশের উপজেলা হাতীবান্ধার কিছু ‘ক্ষুব্ধ নেতার’ সঙ্গেও সুসম্পর্ক রয়েছে তার। আগামী সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের লক্ষ্য নিয়ে বাবুল কাজ করছেন বলে জানান দলের নেতাকর্মীরা।

নিজের পক্ষে দলের মনোনয়ন পাওয়ার প্রত্যাশার বিষয়ে বাবুল বলেন, ‘দেশের সার্বিক উন্নয়ন শুধু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কৃতিত্ব। এলাকায় সেই উন্নয়নের ছোঁয়া লাগানোর জন্য প্রয়োজন আধুনিক ও তরুণ নেতৃত্ব। এলাকার লোকজন আমাকেই এখন মনে করছে সেই নেতৃত্বদানকারী। আমি সে লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছি।’

তবে মোতাহার কিংবা বাবুল- কারও বিষয়ে মনোনয়নের চূড়ান্ত কথা বলার সময় আসেনি বলে জানান লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান। তার ভাষ্য, মনোনয়নের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা।

বিএনপির মনোনয়ন-প্রত্যাশীরা

এই আসনে বিএনপির দলীয় কোন্দলসহ নানা কারণে একাধিক প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে। বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকায় রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন সরকার, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার হাসান রাজীব প্রধান, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহসাংগঠনিক সম্পাদক শাহীন আকন্দ। এ ছাড়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোশারফ হোসেনের নামও শোনা যাচ্ছে মনোনয়ন-প্রত্যাশী হিসেবে। 

বয়স ও অসুস্থতার কারণে রাজনৈতিক কর্মকা-ে খুব একটা দেখা যায় না সাবেক সাংসদ জয়নুল আবেদীন সরকারকে। ১৯৮৬, ১৯৮৮, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। পরে বিএনপিতে যোগ দেন। অসুস্থতার কারণে তিনি শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন না চাইলে তার ছেলে সায়েদুজ্জামান কোয়েল মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে।

ব্যারিস্টার হাসান রাজীব প্রধান পৈতৃক সূত্রে পাটগ্রামের মানুষ হলেও তার বেড়ে ওঠা পাশের জেলা নীলফামারীতে। ২০১০ সালে জয়নুল আবেদীন সরকারের হাত ধরে বিএনপির স্থানীয় রাজনীতিতে তার প্রবেশ। এরপর তিনি আবার পাটগ্রামে ফিরে আসেন। স্থানীয় বিএনপিতে যোগদানের পর কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্যপদ লাভ করেন রাজীব। আইন পেশায় নিয়োজিত রাজীব ঢাকায় অবস্থান করলেও প্রায় প্রতি মাসেই এলাকায় এসে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় ও উঠান বৈঠক করছেন। বর্তমান সরকারের আমলে হাতীবান্ধা-পাটগ্রাম উপজেলায় বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ৫০টির বেশি মামলায় বিনা মূল্যে আইনি সহায়তা দিচ্ছেন তিনি।

মনোনয়নের বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যারিস্টার হাসান রাজীব প্রধান ঢাকাটাইমসকে  বলেন, ‘এ আসনে বিএনপির নতুন নেতৃত্ব হিসেবে অধিকাংশ মানুষ আমাকেই মনে করছে। আমি মনোনয়ন পেলে অবশ্যই শুধু মানুষের জন্যই কাজ করে যাব।’

এদিকে বেশ কয়েক বছর ধরেই গরিব শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়ানো বা দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা সহায়তার মতো কাজগুলো করে আসছেন আরেক মনোনয়ন-প্রত্যাশী এম এ শাহীন আকন্দ। কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহসাংগঠনিক সম্পাদক আকন্দ ঢাকায় বসবাস করলেও তিনি মাঝেমধ্যেই নিজের এলাকায় এসে নানাভাবে লোকজনের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন, ভোটারদের পাশে থাকার চেষ্টা করছেন। দলের দায়িত্বশীলদের সবুজ সংকেত পেয়েই নির্বাচনের মাঠ গোছাতে কাজ করছেন বলে দাবি শাহীনের।

এই তিন মনোনয়নপ্রত্যাশী ছাড়াও বিএনপির দলীয় মনোনয়ন চাইবেন বলে জানিয়েছেন হাতীবান্ধা উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান সামসুজ্জামান সেলিম। এ ছাড়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোশারফ হোসেনেরও নাম শোনা যাচ্ছে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে। 

জাতীয় পার্টির মনোনয়নপ্রত্যাশী: সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনে লালমনিরহাট-১ আসনে জাতীয় পাটির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন খোদ দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তবে ওই সময় রাজনৈতিক নানা টানাপোড়েনে শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে নামেননি তিনি। ওই নির্বাচনে এরশাদের পক্ষে ভোট পড়ে তিন হাজারের কিছু বেশি। আর প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের মোতাহার হোসেন।

নির্বাচনের কিছুদিন পর পাটগ্রামে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এরশাদ বলেছিলেন, ‘আমি এই আসনে যে ভোট পেয়েছি আমার বাড়ির কাজের মানুষও নির্বাচনে দাঁড়ালে তার চেয়ে অনেক বেশি ভোট পেত। আমি সত্যিকার অর্থে কত ভোটের যোগ্য তা আগামী নির্বাচনে দেখিয়ে দেব।’

ফলে এ আসনে এরশাদ নিজেই নির্বাচন করতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে।

তবে এখানে জাতীয় পাটির প্রার্থী হিসেবে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কোষাধ্যক্ষ মেজর (অব.) খালেদ আখতার, দলের হাতীবান্ধা উপজেলা শাখার সভাপতি এম জি মোস্তফা দলের মনোনয়ন চাইবেন বলেও শোনা যাচ্ছে।

লালমনিরহাট-১ আসনে এরশাদের নির্বাচন করা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জেলা জাতীয় পাটির সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম মিঠু ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘এ আসনে দলের চেয়ারম্যান নয়, নির্বাচন করবেন খালেদ আখতার। ’

(ঢাকাটাইমস/২৩নভেম্বর/মোআ)

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত